শিক্ষাকে পণ্যায়নের হাত থেকে রক্ষা করা জরুরি জাতীয় কর্তব্য

এবার এসএসসি উত্তীর্ণ ২ লাখ ৬৮ হাজার ২২২ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার জন্য আবেদন করেননি। জাতীয় গণমাধ্যমে গতকাল প্রকাশিত একটি সংবাদসূত্রে আরও জানা যায়, এবার এসএসসি বা সমমান পরীক্ষায় মোট ১৫ লাখ ৭৬ হাজার ১০৪ শিক্ষার্থী পাস করেছে। পাসকৃতদের মধ্যে উপর্যুক্ত পরিমাণ শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তির আবেদনই করেননি শতকরা হিসাবে যা প্রায় ১৫ ভাগের মত। এত বিশাল পরিমাণ শিক্ষার্থীর মাধ্যমিক স্তর থেকে ঝরে পড়া একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অতিশয় দুশ্চিন্তার বিষয় বটে। যারা কলেজে ভর্তির আবেদন করে নি ধারণা করা যায় তাদের একটি ক্ষুদ্র অংশ হয়তো বিদেশে গিয়ে বা বেসরকারি কলেজগুলোতে ভর্তি হবে। কিন্তু আবেদন না করাদের বড় অংশই নিজেদের শিক্ষা জীবনকে এসএসসি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ করে দিতে বাধ্য হবে। কেন এত বিরাট সংখ্যক শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তির আবেদন করল না? এর কোন গবেষণালব্ধ উত্তর আপাতত আমাদের কাছে নেই। কিন্তু এর পিছনে যে পরিবারের আর্থিক অস্বচ্ছলতা একটি বড় কারণ তা বলার আর দরকার পড়ে না। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় কলেজে ভর্তি হওয়া থেকে শুরু করে বই, নোট-গাইড ক্রয়, প্রাইভেট পড়ার খরচ, বিভিন্ন সেশন ও পরীক্ষা ফিস, গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কলেজ সুবিধাসম্পন্ন এলাকায় বসবাস করা; ইত্যাদি খাতে প্রচুর টাকা প্রয়োজন পড়ে। আমাদের দেশটির মাথাপিছু গড় আয় বাড়লেও সম্পদ ও আয়ের তীব্রতর অসমতার কারণে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মাথাপিছু আয় তেমন আহামরি রকমের বাড়েনি। এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর বহু মেধাবীর পরবর্তী শিক্ষা জীবনের অনিশ্চয়তা নিয়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত অসংখ্য মানবিক প্রতিবেদনগুলো এর প্রমাণ। দেশে সরকারি সামাজিক সুরক্ষা নেটওয়ার্কের আওতায় বিশাল সুবিধাভোগীর সংখ্যা জানলে রীতিমত আঁতকে উঠার অবস্থা হয়। এবার যারা এসএসসি পর্যায়েই শিক্ষা জীবন থেকে ঝরে পড়ল তার মধ্যে কত মেধাবী রয়েছে যারা সুযোগ পেলে নিজেদের প্রমাণ করতে পারত, তার হিসাব মিলানো দুস্কর।
উন্নত দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিবেচনা করা হয়ে থাকে। আমাদের দেশেও শিক্ষার এই শ্রেণিকরণটি নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। ভবিষ্যতে হয়তো এর বাস্তবায়নও শুরু হবে। শিক্ষার এই শ্রেণিকরণ অনুসারে উপরে যে সংখ্যা উল্লেখ করা হলো সেই পরিমাণ শিক্ষার্থী তাদের মাধ্যমিক শিক্ষা জীবনই শেষ করতে পারল না। অথচ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ যেকোন শিক্ষার্থীর মৌলিক অধিকার। সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে এখনও নানা ধরনের প্রণোদনা ও সহযোগিতা জুগিয়ে যাচ্ছে। তদসত্বেও মাধ্যমিক স্তর থেকে প্রায় ১৫ ভাগ শিক্ষার্থীর বিদায় নেয়ার বাস্তবতা আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাটিকেই সমালোচনার মুখে ঠেলে দেয়।
শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দানের পরও আজ শিক্ষাকে পণ্য হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। সম্ভব হয়নি শিক্ষাকে কোচিং প্রতিষ্ঠান বা প্রাইভেট টিউশন সেন্টারের পরিবর্তে শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে নেয়া। এর ঢেউ এসে লেগেছে আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের জীবনে। বলা বাহুল্য যারা কলেজে ভর্তি হবে তাদের একটি বিরাট অংশও এইচএসসির আগে ঝরে পড়বে শিক্ষার এই পণ্য হয়ে উঠার কারণে। তাই আজ সমাজ মানসে শিক্ষার প্রতি বিশেষ আকর্ষণ জন্মালেও অকালে শিক্ষা জীবন শেষ হওয়ার করুণ অধ্যায়কে রুখা সম্ভব হচ্ছে না।
তাই শিক্ষাকে পণ্যায়নের পরিবর্তে একে নিজ মহান আদর্শে ফিরিয়ে আনাটাই একান্ত জরুরি জাতীয় কর্তব্য হওয়া উচিৎ।