শিক্ষার্থীদের হাফ পাস ব্যবস্থা মেনে নিন

রাজনীতির বাইরে সবচাইতে বড়ো আলোচিত বিষয়ের নাম হলো এই মুহূর্তে সড়ক। সবসময়ই সড়ক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতেই থাকতে পছন্দ করে, থাকেও। সাম্প্রতিক সময়ে জ¦ালানী তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে উপলক্ষ করে ভাড়া বাড়ানোর জন্য পরিবহন ধর্মঘট থেকে সেই যে আলোচনার সূত্রপাত হলো তা যেনো থামছেই না। আলোচনায় নতুন নতুন পালক যুক্ত হচ্ছে। ভাড়া বাড়ানো তো হলোই কিন্তু সরকার যে পরিমাণ বাড়িয়েছেন রাস্তায় আদায় করে নেয়া হয় তার চাইতে বেশি। যাত্রীরা রাস্তায় এ নিয়ে প্রতিবাদ করেন, বাদানুবাদ হয়, পত্রিকায় খবর হয়। রাস্তায় কর্তৃপক্ষ নামেন অতিরিক্ত ভাড়া নেয়া হচ্ছে কিনা নজরদারির জন্য। এই হচ্ছে। হতে হতে পরিবহন ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত ভাড়া একসময়ে গা-সওয়া হয়ে যাবে। তখন এ নিয়ে আর কথা হবে না। মানুষ নতুন গলাকাটা ভাড়ায় অভ্যস্ত হয়ে যাবেন। ভাড়ার বাইরে এখন আরেকটি বিষয় নিয়ে সড়ক সরগরম করে রেখেছেন শিক্ষাথীরা। নটরডেম কলেজের ছাত্র নাঈম হাসানের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পর দুই বছর আগের শিক্ষার্থীদের ঐতিহাসিক সেই সড়ক আন্দোলনটি নতুন করে দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে সহপাঠী হত্যার বিচারের দাবির পাশাপাশি আগে তারা যে দাবিগুলো দিয়েছিলেন সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। একটি দাবি হলোÑ শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ পাস তথা অর্ধেক ভাড়া চালু রাখা। সরকার হাফ পাস চালু করার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না নিলেও পরিবহন খাতের কর্তা ব্যক্তিরা অগ্রিম নিজেদের অবস্থান সরকারকে জানিয়ে দিয়েছেন। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন এরকম সিদ্ধান্ত তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হলে পুনরায় বাস বন্ধ রাখা হবে। তারা আরও বলেছেন হাফ পাস চালু করতে হলে সরকারকে প্রণোদনা দিতে হবে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের ভাড়া কমানো থেকেও তারা কিভাবে নিজেদের লাভের পরিমাণ বাড়ানো যায় সেই চেষ্টা শুরু করে দিয়েছেন।
যানবাহনে শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়া নতুন কোনো বিষয় নয়। এটা চালু ছিলোই। একটু বয়স্ক শিক্ষার্থীরা স্মৃতি হাতড়ে এরকম ব্যবস্থার কথা সহজেই মনে করতে পারবেন। তখন শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা, ¯েœহ ও সম্মানের চোখে দেখা হতো। শিক্ষার্থীরা জাতির মেরুদ-, তাঁদের হাত ধরেই দেশ এগিয়ে যাবে; এই বিবেচনাবোধ ছিলো সকলের মনে। তাই আনন্দ সহকারেই তারা শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে হাফ ভাড়া নিতেন। কখনও কোনো ভাড়া নিতেন না, এমন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীও কম পাওয়া যাবে না। তখন এই অর্ধেক ভাড়ার জন্য শিক্ষার্থীদের কোনো আন্দোলন করতে হয়নি। সরকারকে জারি করতে হয়নি প্রজ্ঞাপন। সামাজিক মূল্যবোধ দিয়েই ওরকম ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছিলো। এখন সময় পাল্টেছে। বিদ্যার চাইতে অর্থের কদর বেড়েছে। ‘লেখাপড়া করে যে, গাড়ি চাপা পড়ে সে’ মূল্যবোধকে সমাজের অংশ করে নেয়ার প্রচেষ্টা জারি আছে। এরকম অবস্থায় শিক্ষার্থীদের একটু আদর একটু সহনাভূতির দৃষ্টিতে দেখবে এখন কে? দেখার কেউ নেই বলেই স্বয়ং শিক্ষার্থীরা এ দাবিতে আজ সোচ্চার হয়েছেন।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কেউই বহিরাগত নন। এরা আমাদেরই সন্তান। এরা এই পরিবহন খাতে কাজ করেন সেই ব্যবসায়ী-শ্রমিকদের সন্তান। সুতরাং কাকে আপনি দূরে ঠেলে দিচ্ছেন? লাভের মোহে অন্ধ হয়ে প্রকারান্তরে নিজের বিরুদ্ধেই তো অবস্থান গ্রহণ করা হয়ে যাচ্ছে। পরিবহন ব্যবস্থার কত শতাংশ মুনাফা কমে যাবে হাফ পাস চালু করা হলে? মূলত সবকিছুকে অর্থের তুল্যমূল্যে না দেখে কিছুটা হলেও সামাজিক দায়বদ্ধতা মিটানোর জায়গায় নিজেদের নিয়ে আসুন পরিবহন খাতের ব্যবসায়ীরা। মনে তৃপ্তি পাবেন জাতির জন্য কিছু করার সুযোগ পেয়েছেন বলে। দিনে এক শ’ টাকা লাভ থেকে যদি এক টাকা কমে যায় তাতে আপনাদের তেমন কিছু আসবে যাবে না। কিন্তু এ কারণে অসংখ্য শিক্ষার্থীর শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ কিছুটা হলেও সহজ হবে।
তাই শিক্ষার্থীদের হাফ পাস ব্যবস্থা মেনে নিন।