শিক্ষার্থীরাও নেমে পড়েছে মাঠে

বিশেষ প্রতিনিধি
হবিগঞ্জের বৃন্দাবন কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী টিটন দাস। বাড়ী দিরাই উপজেলার কালিয়াকোটা হাওরপাড়ের রনারচর গ্রামে। কয়েকদিন পরই তার দ্বিতীয় সেমিস্টার পরীক্ষা। কিন্তু বাড়ী থেকে খবর গেছে জমিতে পাকা ধান রয়েছে, কিন্তু ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। খবর পেয়ে চৈত্র মাসের ২৫ তারিখেই বাড়ী এসেছে সে। ২৬ চৈত্রতেই নিজেদের এক একর পাকা ধানের জমি বাবা ও আরেক ভাইকে নিয়ে কেটেছে। টিটনদের অন্য জমি না পাকায় গত ৬-৭ দিন তারা প্রতিবেশিদের জমি কাটতে বদলি শ্রম দিয়েছে। রোববার থেকে প্রতিবেশিরা আবার টিটনদের জমি বদলি হিসাবে কেটে দিচ্ছে। এভাবে পুরো হাওর এলাকায়ই শিক্ষার্থীরা নিজেদের ধান কাটছে এবং বদলি শ্রমে অন্যদের ধানও কেটে দিচ্ছে।
একই গ্রামের সিলেট মদন মোহন কলেজের অর্থনীতি বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী লিপ্টু দাস, দিরাই ডিগ্রি
কলেজের ¯œাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সুব্রত দাস, খালিয়াজুরির কৃষ্ণপুর কলেজের ইংরেজি অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী শান্ত কুমার দাস রোববার কালিয়াকোটা হাওরে ধান কাটছিল।
লিপ্টু বললো,‘আমাদের ৮ জনের সংসার গত বছর একগুটা ধানও ঘরে তুলতে পারিনি। সারা বছর অভাব অনটনে কেটেছে। সরকারের দেওয়া ৩০ কেজি চাল ও ৫০০ টাকা না পেলে জীবন বাঁচানোই কষ্ট ছিল। এবার চাষাবাদের টাকার ব্যবস্থা না হওয়ায় ৬ একর জমির মধ্যে ৫ একর রংজমা দিয়েছি (জমি দিয়ে একবছরের জন্য অগ্রিম টাকা নেওয়া)। এক একর নিজেরা করেছি। চাষাবাদ করেছি ২ ভাই মিলে। এখন ধান কাটানোর জন্য ৬০০ টাকা রোজেও শ্রমিক না পাওয়ায় বড় ভাই খবর দিয়েছেন, বাড়ী আসতে। বাড়ী এসে আমি একাই এক একর জমির ধান কাটছি এবং বড় ভাই ট্রলি দিয়ে অন্যের জমির ধান খলা (ধান মাড়ানোর স্থান) থেকে বাড়ী পৌঁছে দেবার কাজ করছেন।’ লিপ্টু বললো,‘হাওর ঘুরে সকল গ্রামেই একই চিত্র দেখতে পাবেন। অন্যান্য বছর আমাদের মতো শিক্ষার্থীরা শখের বসে বা বড়দের পরিশ্রম দেখে এক দুই ঘণ্টা ধান কাটার কাজ করতো বা মাড়াইয়ে সহযোগিতা বা হাওরে খাবার এনে দিতো। এবার শখে নয়, শ্রমিক না পাওয়ায় বা শ্রমিকের মজুরি বেশি হওয়ায় শিক্ষার্থীরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ধান কাটা মাড়াইয়ে যুক্ত রয়েছে।’
খালিয়াজুরির কৃষ্ণপুর কলেজের ইংরেজি অনার্সের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী শান্ত দাস বললো,‘আমাদের ৭ একর জমির ধান পেকেছে। শ্রমিক খুঁজে না পাওয়ায় আমরা নিজেরাই কাটতে লেগেছি। আমার কাকা, বোনের জামাই এবং প্রতিবেশি আরেক ভাই বদলা দিচ্ছে।’
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হালুয়ারগাঁওয়ের বাসিন্দা সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রকিব উদ্দিন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জুবায়ের আহমদ বললো,‘তাদের গ্রাম ও আশপাশের গ্রামের নবম – দশম থেকে কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অন্য যেকোন বছরের চেয়ে এবার বেশি কাজ করছে হাওরে। তারা বললো, ‘এবার ফসল ভাল হয়েছে, কিন্তু শ্রমিক না পাওয়ায় শিক্ষার্থীরাই কাজ করছে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত।’
শহরতলির আব্দুল আহাদ শাহিদা চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইসা সুলতানা পপি ও তার বোন ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী শিউলি আক্তার রোববার স্কুলের পোশাক পরেই মাঠে ধান শুকানোর কাজ করছিল। পপি বললো,‘স্কুলের টিফিন পিরিয়ড এক ঘণ্টা ক্লাস হবে না, এজন্য স্কুল থেকে সরাসরি খলায় এসেছি। আমার আম্মা ও চাচী এখানে কাজ করছেন। তাঁদের সহায়তা করতে এসেছি।’
বিশ্বম্ভরপুর দিগেন্দ্র বর্মণ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ বিমলাংশু রায় বললেন,‘কলেজে এইচএসসি পরীক্ষা থাকায় ক্লাস হচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের সুবিধা হয়েছে হাওরে অভিভাবকদের সঙ্গে গিয়ে কাজ করার। এবার হাওরে ফলন ভাল হয়েছে কিন্তু ধান কাটা শ্রমিকের সংকট রয়েছে সর্বত্র। শিক্ষার্থীরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে অভিভাবকদের সহায়তা করার চেষ্টা করছে।’ একই মন্তব্য করলেন দিরাই বিবিয়ানা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ নৃপেন্দ্র দাস তালুকদার।
কৃষক সংগ্রাম সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল বাশার ঠাকুর খান বললেন,‘এবার ধানের ফলন প্রকৃতপক্ষেই বাম্পার হয়েছে কিন্তু ধান কাটার শ্রমিক সংকট রয়েছে। ধান কাটার যে অল্প পরিমাণ যন্ত্র হাওরে এসেছে এগুলো চাহিদা মেটানোর মত নয়। ৮-১০ বছর আগেও যেভাবে ফরিদপুর – পাবনা থেকে শ্রমিক আসতো, তারাও এখন আসে না। স্থানীয় শ্রমিকদের অনেকে মনে করে আবহাওয়া যেহেতু একটু খারাপ আছে, সেহেতু মজুরি বেশি চাইলেও কৃষকরা ধান কাটাবে। তারা ইচ্ছে করে মজুরি বাড়িয়ে দিয়েছে। এই অবস্থায় যাদের পরিবারে পুরুষ মানুষের সংখ্যা বেশি। সেটা স্কুল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীই হোক, তারা নিজেরাই নেমেছে ধান কাটতে।’