শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিন

শিক্ষার মান উন্নয়ন বা অবকাঠামোগত অন্যান্য দিকে গুরুত্ব না দিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রতি বছরই আসন সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছে। আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিয়ে এমন উদ্যোগের ফলে একদিকে শিক্ষার্থীদের যেমন অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে শিক্ষার গুণগত মান। যে শিক্ষার্থীরা পাস করে বের হচ্ছে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা থেকে তারা পিছিয়ে পড়ছে। চলমান সমস্যার জুতসই সমাধানে প্রয়োজন শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরিকল্পিতভাবে আসন বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে চিঠি পাঠিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। চিঠিতে শিক্ষার্থীদের আসন না বাড়ানোর বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এটা ঠিক, দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতি বছর শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও বাড়ছে। অতিরিক্ত চাহিদা মেটাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আসন সংখ্যা বৃদ্ধিতে বাধ্য হচ্ছে। তবে প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণাগার উন্নয়ন, শ্রেণীকক্ষের পরিসর বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় আবাসন ব্যবস্থা ইত্যাদি অবকাঠামোগত সংস্কার ব্যতিরেকে কেবল আসন সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি যৌক্তিক নয়। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করে প্রতি বছর প্রতিষ্ঠানগুলোর এ ধরনের উদ্যোগ শিক্ষার গুণগত মানকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত চাহিদা মেটাতে কেবল সরকারের তরফ থেকে নিষেধাজ্ঞা জারি করলে চলবে না, বিশ্ববিদ্যালয়বান্ধব নীতি গ্রহণ করতে হবে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি মনোযোগ দিতে হবে গবেষণাধর্মী কাজের দিকেও। পর্যাপ্ত অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়িয়েও লাভ নেই।
একসময় ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে এশিয়ার প্রথম ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় নেই। বিষয়টি ক্রমে আমাদের শিক্ষার দৈন্যকে প্রকাশ করে। একুশ শতকের উপযোগী শিক্ষা ও উন্নয়ন সহায়ক মানবসম্পদ তৈরিতে শিক্ষার গুণগত মানের দিকে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আসন সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ নয়, বরং প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের মান ও পরিধি বাড়াতে হবে। জাতীয় বাজেটে যেমন উচ্চশিক্ষায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে, তেমনি অতিরিক্ত শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দিকেও মনোযোগী হতে হবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে প্রতি বছর দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের হাজারো মেধাবী শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা অর্জনের স্বপ্নপূরণ হয়। তাদের চাহিদা পূরণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সচেষ্ট হতে হবে। একদিকে দেশের যেখানে সেখানে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিয়ে, অন্যদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন সংখ্যা সীমিত করে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান হবে না। ফলে সাধারণ পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। রাষ্ট্রের উন্নয়নে শিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা নিয়ে তর্কের কোনো সুযোগ নেই। অতীতে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ প্রয়োজন পূরণ করলেও বর্তমানে প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন সমস্যায় ডুবে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তার অতীতের উজ্জ্বল ইতিহাস প্রায় হারাতে বসেছে। তাই শিক্ষা ও গবেষণার বিকাশে এবং মানসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির দিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।