শিক্ষা ও উন্নয়ন

সুভাষ চন্দ্র দাস
জাতীয় উন্নয়ন একটি গতিশীল ও পূর্ণাঙ্গ ধারণা। উন্নয়ন পরিকল্পনা সার্থক করতে হলে এর মূল লক্ষ্য হতে হবে সাধারণ মানুষের জন্য পরিপূর্ণ, স্বাস্থ্যকর, সুন্দর ও উন্নত জীবন। বর্তমান বিশ্ব ক্রমশ প্রযুক্তি নির্ভর সমাজে পরিণত হতে চলেছে। জনসংখ্যা, মানব সম্পদের প্রয়োজনীয়তা, হ্রাসমান প্রাকৃতিক সম্পদ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অপরিকল্পিত প্রয়োগ প্রভৃতিসহ নানাবিধ সমস্যা সমাধানের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের চাহিদা রয়েছে। এ সকল সমস্যা সমাধানকল্পে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা প্রণয়নের যোগ্যতা অর্জন বাধ্যতামুলক হয়ে পড়ে। সময়ের চাহিদা মোকাবেলার জন্য যোগ্যতা অর্জনকারী মানবসম্পদ সৃষ্টিতে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে। পরিকল্পিত সময়ে জনসংখ্যার সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরী বিদ্যালয়, বৃত্তিমূলক বিদ্যালয়, চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়, কৃষি বিদ্যালয় ইত্যাদি প্রয়োজন অনুযায়ী স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে যাহা দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য কাজ না করলে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে। পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়েছে পৃথিবীতে উন্নতির স্বর্ণ শিখরে যারা আরোহন করেছে তারা শিক্ষায় পরিপূর্ণতা এনেছে সর্বাগ্রে। উল্টোদিকে শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া রাষ্ট্রগুলো উন্নয়নের মহাসড়কে ঊঠা দূরের কথা, সংযোগ সড়কেও উঠতে পারেনি। পরিকল্পিত শিক্ষার মাধ্যমে যেকোন দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সুনিপুণভাবে আনয়ন করা যায়। ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও জাপানের সূপরিকল্পিত শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের যোগসূত্র ইতোমধ্যে তথ্যসহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযোদ্ধোত্তর সময়ে শিক্ষা পরিকল্পনার পাইওনিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। পরিকল্পিত শিক্ষা অর্থনীতির ন্যায় দেশ ও সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রে ও ধনাত্বক পরিবর্তন আনে। শিক্ষার মাধ্যমে গ্রামীণ সমাজ ও অর্থনীতি উপকৃত হয়। পরিকল্পিত শিক্ষায় নারীরা উৎপাদন, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রায়নে যথার্থ ভুমিকা পালন করতে পারে। এভাবে শিক্ষা সমাজের দুর্বল জনগোষ্ঠী এবং পশ্চাদপদ স্থান ও অঞ্চলের উন্নয়নে অবদান রেখে জাতীয় উন্নয়নের বিচার্য বিষয় দ্রুততর করে।
বিভিন্ন দেশের বিগত দিনের অভিজ্ঞতা থেকে বর্তমানে এ সত্যটি প্রতীয়মান হয়েছে যে, সুপরিকল্পিত শিক্ষাই উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরাসরি সাহায্য করতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৯০৯ থেকে ১৯৫৭ সালের পরিসংখ্যানসমূহের বিশ্লেষণের মাধ্যমে ই,এফ ডেনিসন দেখিয়েছেন যে’ “এ সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটেছে তার শতকরা ২১ ভাগ শিক্ষার বদৌলতে সংঘটিত হয়েছে”। জাপানে ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৫৫ সালের মধ্যে শিক্ষাগত মূলধন বৃদ্ধির ফলে জাতীয় আয়ের শতকরা ২৫ ভাগ বৃদ্ধি ঘটেছে। জাপানের শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত “জাপানের বিকাশ ও শিক্ষা” নামক পুস্তকে বলা হয়েছে, “এ দেশে শিক্ষার একটি প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে সমগ্র জনসমাজের দক্ষতার বৃদ্ধি ঘটানো। অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা উপযুক্ত বা সামাজিক অগ্রগতি কোনটাই সমাজের শুধু সীমাবদ্ধ অংশের অগ্রগতি থেকে বা গুটিকয়েক দক্ষ ব্যক্তির প্রচেষ্টায় সফল হতে পারে না ”। এতে অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও তার পরিকল্পিত বিস্তারের প্রতিই ঈংগিত প্রদান করা হয়েছে। রুশ বিপ্লবের নেতা ভøাদিমির ইলিচ লেলিনের মতে, “শিক্ষা হবে সাম্যবাদের পথে সমাজকে এগিয়ে নেবার একটা হাতিয়ার”। পরবর্তীতে স্ট্যালিন এবং ক্রুশ্চেভও একই সুরে বলেছিলেন “সাম্যবাদ অর্জন করতে হলে- প্রধান কাজ হলো আগামী দিনের মানুষকে শিক্ষিত করে তোলা”। ভারতের এম, এম আনসারী ১৭ টি রাজ্যের ১৯৭৮ থেকে ১৯৮১ সালের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে তার “এডুক্যাশনাল এক্সপেন্ডিচার এন্ড ইকোনমিক গ্রোথ” নামক প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে, “নিরক্ষরতা ও দারিদ্রতা একই দিকে ধাবিত এবং একটি অপরটিকে শক্তিশালী করে। কারণ যেসব এলাকায় অধিক সংখ্যক নিরক্ষর রয়েছে, সেখানে দরিদ্রতার নিবিড়তা বেশি”।
একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশ সরকারও শিক্ষাক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর একটি শ্লোগান হচ্ছে “শিক্ষা নিয়ে গড়বো দেশ, শেখ হাসিনার বাংলাদেশ”। অর্থাৎ সার কথা হচ্ছে একটি দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। উন্নয়নশীল কিংবা নি¤œমধ্যম আয়ের দেশ যেই ভাবে ভাবুন না কেনো বাংলাদেশের অগ্রগতির পথে যেসকল অন্তরায় আছে সেগুলো ক্রমান্বয়ে দূরীভূত হবেই। তবে শিক্ষাক্ষেত্রের প্রতিবন্ধকতা সর্বাগ্রে দূর করলে আলোর পথ পেতে সহজ হবে। আর সেই আলোয় আলোকিত হয়ে বাংলাদেশের সামনে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ এর “এস ডি জি” এবং ২০৪১ এর স্বপ্নের “রূপকল্প” বাস্তবে কার্যকরী হবে, দেশ চলে যাবে উন্নত দেশের কাতারে।
জাতীয় উন্নয়ন একটি গতিশীল ও পূর্ণাঙ্গ ধারণা। উন্নয়ন পরিকল্পনা সার্থক করতে হলে এর মূল লক্ষ্য হতে হবে সাধারণ মানুষের জন্য পরিপুর্ণ, স্বাস্থ্যকর, সুন্দর ও উন্নত জীবন। এতে উন্নয়নের পরিধিতে মানবিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য উন্নয়ন আওতাক্তুক্ত হয়। সমাজে ব্যক্তির পরিপূর্ণ বিকাশ যতই কাম্য হোক, সমাজকে ক্ষুধা, দারিদ্র, রোগ বালাই এবং কুসংস্কারে ডুবিয়ে রেখে অর্জন করা সম্ভব হয়ে উঠে না। পরিকল্পনাবিদদের বুঝতে হবে সমাজের উন্নয়নে শিক্ষার ভুমিকা, সমাজবিজ্ঞানীদের বুঝতে হবে সমাজের অগ্রগতিতে শিক্ষার ভুমিকা, আবার শিক্ষা পরিকল্পনাকারীদের বুঝতে হবে শিক্ষার অগ্রগতি অনেকাংশে অর্থনৈতিক, সামাজিক, মানবিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের উপর নির্ভর করে। শিক্ষায় এ সকল বিষয়ের জন্য প্রস্তুুতির আয়োজন না থাকলে এবং পরিকল্পিতভাবে শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়ন অভিমুখী করতে না পারলে সে শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ফলে শিক্ষা জাতীয় উন্নয়নের যথাযোগ্য হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে না। তাই জাতীয় উন্নয়নও হবে স্থবির অথবা শম্ভূক গতি সম্পন্ন।
লেখক : সহকারি শিক্ষক, সরকারি এস,সি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সুনামগঞ্জ।