শিক্ষা দানে নৈশপ্রহরীর বদান্যতা ও বেত্রাঘাতের মন্দ সংস্কৃতি

ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইর রাজাপুর ইউনিয়নের গোলকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নৈশপ্রহরী আব্দুর রহমানকে একটা স্যালুট জানাতেই হয়। কারণ তিনি ওই বিদ্যালয়ের চলমান শিক্ষক সংকটের সময়ে কিছুটা হলেও পাঠ কার্যক্রম পরিচালনায় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছেন। নিজ পদের দায়িত্ব-কর্তব্যের পাশাপাশি তিনি শ্রেণিকক্ষে পাঠ দান করে ওই বিদ্যালয়ের শ্রেণি কার্যক্রমকে সচল রাখতে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। আমরা জানি না নৈশপ্রহরী আব্দুর রহমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা কী। তবে আমরা এও জানি বহু বিদ্যালয়ের নৈশপ্রহরীরা এইচএসসি ও ¯œাতক পাস করা। জেলা প্রশাসনের অফিস সহায়ক পদে যেখানে মাস্টার্স করা প্রার্থীরা আবেদন করেন এবং চাকুরি লাভ করেন সেখানে নৈশপ্রহরী পদে এইচএসসি বা বিএ পাস করা প্রার্থীরা চাকুরি পাবেন তাতে আশ্চর্য হওয়ার কোনো কারণ নেই। বর্ণিত বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটের কারণে অন্তত একজন আব্দুর রহমান নিজের অর্জিত শিক্ষাগত যোগ্যতার কিছুটা ব্যবহার করতে পারছেন। এই কাজ আইনত বৈধ নাকি তিনি সেটা করতে পারেন না, এই কূটতর্কে না গিয়ে বরং তিনি যে বর্ণিত বিদ্যালয়ের সংকটকালে কিছুটা সহায়তা করতে পারছেন সেটিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে পারি আমরা।
বর্ণিত বিদ্যালয়ে অনুমোদিত শিক্ষক পদ সংখ্যা ৬ জন। প্রধান শিক্ষক অবসরে গেছেন। ৩ জন শিক্ষক আছেন প্রশিক্ষণে। তাই বর্তমানে ওই বিদ্যালয়ে কার্যত ২ জন শিক্ষক পাঠদানে নিয়োজিত রয়েছেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩০৫ জন। ৫টি শ্রেণির (শিশু শ্রেণি ধরলে ৬টি) ৩০৫ শিক্ষার্থীকে মাত্র ২ জন শিক্ষক দ্বারা পাঠদান করা সম্ভব? এই ২ শিক্ষক যদি লাগাতার ক্লাস নেন তারপরেও একসাথে দুইটি ক্লাস চলবে, তখন বাকি ক্লাসগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হবে। এই শূন্যতার কিছু অংশ পূরণ হচ্ছে নৈশপ্রহরীর বদান্যতার কারণে। স্থানীয় শিক্ষা প্রশাসনের নিকট আমরা জানতে চাই, কোন্ বিবেচনা বলে এক বিদ্যালয়ের ৩ শিক্ষককে একসাথে প্রশিক্ষণে পাঠানো হলো? শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ নিবেন নিজেদের পাঠদানের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য, এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য খুব উপযোগী। তাই বলে পাঠদানের ন্যূনতম ব্যবস্থা না রেখে একসাথে একাধিক শিক্ষককে প্রশিক্ষণে পাঠানো নিশ্চয়ই কোনো সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা হতে পারে না।
গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত এই সংবাদ থেকে নৈশপ্রহরীর পাঠদানের সাথে আরেকটি ভয়াবহ তথ্য পাওয়া যায়। সেটি হলো, শিক্ষার্থীদের বেত্রাঘাত করা। প্রকাশ্যেই শ্রেণিকক্ষে তারা বেত রাখছেন। বিদ্যালয়সমূহে বেত্রাঘাত করা সরকারিভাবে বহু আগে বন্ধ করা হয়েছে। শাসনের জন্য এই মধ্যযুগীয় পদ্ধতিটি আধুনিক যুগে বর্জিত ধারণা। বেত্রাঘাত শিশু মনে বিরূপ প্রভাব ফেলে যা তার মানসিক বৃদ্ধির জন্য ভীষণ রকমের প্রতিবন্ধক। মূলত ভয়ের পরিবেশ শিশুদের মুক্ত বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়। বেত বা প্রহার ছাড়াও শাসনের রয়েছে আরও বহু পথ। শিক্ষকের ব্যক্তিত্বই একটি প্রধান উপকরণ বলা যেতে পারে। আদর্শ শিক্ষক নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যা শিক্ষার্থীদের সার্বিকভাবে প্রভাবিত করে। শিক্ষকের মুখের কথাই তখন শিক্ষার্থীর জন্য যথেষ্ট বলে বিবেচিত হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের দেশে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বেতের ভাষায় কথা বলা ভিন্ন আর কিছু ভাবতে পারেন না কিছু শিক্ষক। এই মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো একান্ত আবশ্যক। আমরা জানি শিক্ষকদের এখন যে বহুমুখী প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয় সেখানে বেত্রাঘাত ছাড়া কীভাবে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ পাঠমুখী করানো যায় সে নিয়ে বিস্তুর আধুনিক কলা-কৌশল শিখানো হয়। তো আমাদের শিক্ষকরা কেন আধুনিক পাঠদান কৌশল প্রয়োগ না করে মান্ধাতা আমলের বেত্রাঘাতের নির্মমতার মধ্যে নিজেদের আটকে রেখেছেন?
ধর্মপাশার গোলকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক পদায়নের মাধ্যমে শ্রেণি কার্যক্রমের বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনের জন্য আমরা ওই উপজেলার শিক্ষা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।