শেষ দিনে ৯ দফা বাস্তবায়নের দাবি

আসাদ মনি
ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-সহ ৯ দফা দাবিতে টানা ৫ দিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করেছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীবৃন্দ। প্রতিদিন বিকাল ৪ টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ধর্ষণ বিরোধী প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করা হয়। শহরের হোসেন বখত চত্ত্বর সরব ছিল এই ৫ দিন। অবস্থান কর্মসূচিতে গান, কবিতা, নৃত্য, স্লোগান ও বক্তব্য চলে বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত। শুক্রবার সমাপনী কর্মসূচিতে মশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
এসময় ধর্ষণ বিরোধী স্লোগান, ‘প্রীতিলতার বাংলায় ধর্ষকদের ঠাঁই নাই, রোকেয়ার বাংলার ধর্ষকদের ঠাঁই নাই, ইলামিত্রের বাংলায় ধর্ষকদের ঠাঁই নাই’ সহ আরো অনেক স্লোগানে স্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত করে প্রতিবাদী তরুণ তরুণিরা। ৫ দিনব্যাপী এই ধর্ষণ বিরোধী সমাবেশে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন জেলা উদীচীর সভাপতি শীলা রায়, শহিদ জগৎজ্যোতি পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. সালেহ আহমেদ, শিক্ষাবিদ পরিমল কান্তি, জেলা পরিষদের সদস্য ফৌজিআরা শাম্মী, সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি পঙ্কজ কান্তি দে, প্রথমআলোর স্টাফ রিপোর্টার খলিল রহমান, জেলা উদীচীর সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম, সুনামগঞ্জ থিয়েটারের সভাপতি দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী, চ্যানেল ২৪’র জেলা প্রতিনিধি এ আর জুয়েল, লোকদল শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বিধান চন্দ বনিক বাঁধন, রঙ্গালয়ের সভাপতি মুহিম তালুকদার, জাগরণী মুক্ত স্কাউটস গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক এ আহসান রাজিব প্রমুখ।
প্রথম দিনের কর্মসূচিতে ছিল প্রতিবাদ সমাবেশ, দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচি দাবি উত্থাপন ও গণস্বাক্ষর গ্রহণ, তৃতীয় দিনের কর্মসূচিতে পূর্বলিখিত পোস্টারের নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে কথা বলা ও বিষয়গুলো সম্পর্কে দর্শকের মতামত নেওয়া, চতুর্থ দিনের কর্মসূচি সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড (কবিতা, গান, নাচ, নাটক) ও পঞ্চম দিনের কর্মসূচি প্লেনচ্যাট বিতর্ক ও সন্ধ্যায় সম্মিলিত মশাল মিছিল দিয়ে শেষ হয় টানা ৫ দিনের এই প্রতিবাদ কর্মসূচি।
সমাপনী অনুষ্ঠানে কর্মসূচির উদ্যোক্তারা বলেন, প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই ধর্ষণের খবর চোখে পড়ে। এজন্য দায়ি পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব। মানুষ হিসেবে নিজের শরীরের ওপর যে অধিকার রয়েছে, সে অধিকার নিয়ে তামাশা করছে ভয়াবহ হারে বাড়তে থাকা এই ধর্ষণের খবরগুলো। ঘরের কোণে বসে থাকা সাধারণ মানুষ যারা কোনমতে নিজের গা বাঁচাতে পারলেই খুশি, তারাও নড়েচড়ে বসেছেন। কারণ অবস্থা দিনদিন সহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। সারা দেশে ধর্ষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। আমরাও শামিল হয়েছি এই আন্দোলনে। আমাদের নৈতিকতাবোধের গোড়ায় পঁচন ধরেছে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় লৈঙ্গিক সমতা কেবল মুখের বুলি, ক্ষমতার অপপ্রয়োগে জনজীবন বিপর্যস্ত আজ। নারী যেনো মানুষ নয় ভোগের পণ্য মাত্র। চারদিকে বিজ্ঞাপন মানেই নারীর শরীর। নারীকে বিজ্ঞাপনে পণ্য হিসেবে হাজির করা বন্ধ করতে হবে।
বক্তারা আরও বলেন, একদিকে আন্দোলনে উত্তাল দেশ, অপরদিকে ধর্ষণ কমছে না। পরিবর্তনের জন্য দরকার পুরো সিস্টেমের বদল। এ কাজ নিঃসন্দেহে কঠিন, কিন্তু শুরুটা হওয়া জরুরি। এই ধর্ষণ বন্ধে আমাদের ভাবনা, দাবি, চিন্তা গত ৫ দিরব্যাপী প্রকাশ করেছি ভিন্নরকমের আয়োজনের মাধ্যমে। শুধু মৃত্যুদ- দিয়ে এই ধর্ষণ রোধ করা সম্ভব নয়। আমাদের মগজে লালন করা পুরুষতান্ত্রিক মোড়লকে শেষ করতে হবে। আমরা চাই আমাদের ৯ দফা দাবি দ্রুত বাস্তবায়িত হোক। তাহলেই সমাজ থেকে ধর্ষণের মতো নিন্দনিয় কাজ বিদায় নেবে। ৯ দফা দাবিগুলো হলো-
জাতি-ধর্ম-বর্ণ-বয়স-লৈঙ্গিক পরিচয় নির্বিশেষে যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে যে কোনো ভাবেই ‘ভিক্টিম ব্লেমিং’ (দোষারোপ করা/নিন্দা জানানো) বন্ধ করতে হবে। গ্রামীণ সালিশ/পঞ্চায়েতের মাধ্যমে ধর্ষণের অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে।
প্রাথমিক পর্যায় থেকেই পাঠ্যপুস্তকে যৌন শিক্ষা (ভালো স্পর্শ, খারাপ স্পর্শের শিক্ষা, সম্মতি বা কন্সেন্ট এর গুরুত্ব, শরীরের গোপন অংশ সম্পর্কে অবহিত করা) যোগ করতে হবে। সেই সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীদের ছবিতে বা পোস্টের কমেন্ট বক্সে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করলে শাস্তির ব্যবস্থা করা।
ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে বিচারকার্যের সকল পর্যায়ে বাদিনীর চরিত্র বা পেশাককে আমলে না নিয়ে তার উপর অনধিকার চর্চা প্রমাণের ভিত্তিতে শাস্তি নিরূপণ করা হোক এবং মামলার ডিএনএ আইনকে সাক্ষ্য প্রমাণের ক্ষেত্রে কার্যকর করতে হবে।
হাইকোর্টের নির্দেশানুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি, বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানে নারী নির্যাতন বিরোধী সেল কার্যকর ও পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে।
মাদ্রাসার শিশুসহ সকল শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কোন শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হলে ৯০ দিনের মাঝে দ্রুততম ট্রাইব্যুনালে অভিযোগের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা।
যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে প্রান্তিক অঞ্চলের নারীদের সুবিধার্থে হটলাইনের ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির বিনামূল্যে চিকিৎসা সংক্রান্ত সকল ধরণের দায়ভার রাষ্ট্রের নিতে হবে।
সুনামগঞ্জের নির্জন রাস্তায় কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে এবং ইভটিজিংয়ের যে কোনো অভিযোগে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করতে হবে।
সরকার কর্তৃক বিনামূল্যে /স্বল্পমূল্যে সুনামগঞ্জের প্রত্যেক উপজেলায় মেয়েদের সেল্ফ ডিফেন্স শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে।