শেষ যুদ্ধের দিনগুলো

মাহবুবুর রহমান
গত ৩০ অক্টোবর বিশিষ্ট সাংবাদিক পঙ্কজ দাদা এসে বললেন, ‘মাহবুব, তোমার আব্বাকে গতকাল রাতে আমি স্বপ্ন দেখেছি।’ শুনেই আমি অবাক, কারণ ১ বছর আগের সেই দিনটি ছিল আমার আব্বা বীর মুক্তিযাদ্ধো মতিউর রহমানের সুনামগঞ্জে শেষ দিন।
জন্ম থেকে বেড়ে উঠা এই শহরেই, এখোনেই তিনি তার জীবনের প্রায় পুরো সময় ব্যয় করেন। তাই শহরের প্রতি, এলাকার মানুষের প্রতি ছিল তার আত্মার সম্পর্ক। মহামারী করোনাকালীন সময়ে সতর্কতার জন্য দেড় বছরে মাত্র কদিন বাসা থেকে বের হন সভায় অংশগ্রহণের জন্য। তাও বাইরে থেকে অন্য মাধ্যমের দ্বারা করোনা আক্রান্ত হন। ঢাকা সিএমএইচে ডাক্তার তথা সবার আন্তরিকতায় দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে সুস্থভাবে সুনামগঞ্জে নিয়ে আসি।
এরপর থেকে সুস্থ সুন্দর স্বাভাবিক জীবন—যাপন শুরু করি। আমার স্ত্রী ডাক্তার হওয়ায় আব্বার সব মেডিক্যাল হিস্ট্রী পর্যালোচনা করে সিলেটে ডাক্তার দেখাই। তারপর থেকে পুরো সুস্থ।
০৯ জুন ২০২১ উনার জন্মদিন। আমরা কখনোই পরিবারের কারো জন্মদিন তেমন আয়োজন করে উদযাপন করি না। তারপরেও কেন জানি সেই বছর আব্বা বারবার উনার জন্মদিন যাতে আয়োজন না করি তার জন্য মানা করছিলেন। অন্যদিকে, আব্বা মঙ্গলকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি থাকায় স্কুলের নতুন ক্যাম্পাস বানানোর একটা কাজে ব্যাস্ত ছিলেন। কাজটি তাড়াতাড়ি সম্পন্ন করার জন্যে দিনরাত সংশ্লিষ্ট সবাইকে ফোন দিয়ে আগস্টের দিকে এর সমাধান করেন।
এই সময়ে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের ইতিহাস শুনাতেন। একদিন আব্বা আমাদের ডেকে বললেন, তোমরা আমার সব বই একসাথে করে ছাপানোর জন্য সিলেটে খোঁজ নাও। এর মধ্যে জানা যায় আমার সন্তান হবে। আব্বাকে বাসায় রেখে আমার স্ত্রীকে নিয়ে আমরা সবাই ডাক্তার দেখানোর জন্য সিলেট চলে যাই। উনি কখনো তেমন একা বের হতেন না। কিন্তু এইসময়ে নিজ শহর, উনার প্রাণের শহর সুনামগঞ্জ দেখতে কাউকে না বলে বিকেলে একা একা বের হয়ে ঘুরে আসতেন।
অন্যদিকে সেই দিন থেকে আব্বা কিছুটা অসুস্থ অনুভব করেন। কিন্তু চিন্তা করবো ভেবে উনি এই কথাগুলো আমাদের বলেননি। নিজেই কল করে বাসায় ডাক্তার এনে দেখিয়ে নেন, সমস্যা না কমায় আবার সেই ডাক্তার দেখায়। অন্যদিকে, পারিবারিক ডাক্তারের সাথে অন্যসব বিষয়ে আলাচেনা চলতে থাকে। কিন্তু উনি যে এতো অসুস্থ কেউই বুঝেও না, আমাদেরও বলেনা।
২৯ অক্টোবর ২০২১, সকালে আম্মা এসে বলেন এই ঔষধে তোমার আব্বার আরোও সমস্যা হচ্ছে। সাথে সাথে সিদ্ধান্ত নিলাম, এভাবে আর না। সিলেট নিয়ে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা করে নিয়ে আসবো।
আব্বা সিলেট যাবেন না, আরোও কয়দিন দেখতে চান। আম্মাকে নিয়ে আব্বাকে বোঝালাম, দুইদিন সাপ্তাহিক ছুটি আছে, তোমার কিছুই হবে না। বেশি হলে ৩ দিন পরে আমরা ফিরে আসবো। আব্বা সিলেট যেতে রাজি হলেন। আম্মাকে দিয়ে আব্বাকে হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে পাঠিয়ে আমি হাসপাতালে আব্বার ভর্তির ব্যবস্থা করিছিলাম। অন্যদিকে আমার স্ত্রী আব্বাকে দেখেই আমার কাছে এসে চিৎকার শুরু করল, আব্বার তো খুব বেশি জন্ডিস, তোমরা আমাকে কিছু বলেনি কেন? আব্বার পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু হয়। ভাইয়া দেশ—বিদেশ ডাক্তারদের সাথে যোগাযাগে করতে থাকেন। দুইদিন পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা নেই। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে অবস্থিত ভাই—বোন খবর পেয়েই ছুটে আসেন। উনারা এসে পোঁছানারে দিন রাতেই সিসিইউতে নেওয়া হয়। অনেকের অনেক আবদার, আনুরাগ, অনুরোধ ছিল এই অসুস্থ অবস্থায় তাদের তা বুঝিয়ে দিয়ে যান। ৫ নভেম্বর সিসিইউতে ডাক্তার—নার্সদের সাথে প্রাণখুলে কথা বলেন। সেই ফ্লোরের তাদের সবাইকে ঝালমুড়ি খাওয়ান। এর পরদিন থেকে আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে যান। ৭ নভেম্বর সবাইকে কাঁদিয়ে তিনি আমাদের কাছ থেকে চলে যান।
আব্বার মৃত্যুর পর যেভাবে এ শহরবাসী দলমত, ধর্ম—বর্ণ নির্বিশেষে আমাদের পাশে ছিলেন ও আছেন এর জন্য আমরা সবার কাছে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। আব্বার অন্যতম শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, বীর মুক্তিযাদ্ধো মতিউর রহমান ফাউন্ডেশন এর উদ্যেগে চৈতন্য প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে বই ‘যুদ্ধ ওঁ শান্তির শব্দমালা”। যার সার্বিক সহযোগিতা করছেন ড. মোহাম্মদ সাদিক।