শ্রদ্ধা ভালোবাসায় সিক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মজিদ

হোসেন তওফিক চৌধুরী
১৯৭৩-৭৪ সালে দেশের রাজনৈতিক পরিমন্ডলে এক অস্থির অবস্থা বিরাজিত ছিল। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিকে ছাপিয়ে আন্ডার গ্রাউন্ড রাজনীতির উদ্রেক হয়। বিশেষভাবে তরুণরাই এ রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ে। অ্যাডভোকেট আব্দুল মজিদও এই রাজনীতিতে জড়িয়ে যান। পুলিশের তাড়া খেয়ে নিজ এলাকা নরসিংদি ছেড়ে ছাতকের দোয়ারায় চলে আসেন। মজিদ নামের পরিবর্তে তিনি নিজেকে ‘আজাদ’ নামেই পরিচিত করান। দোয়ারার গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে তিনি দোয়ারার মানুষ এবং দোয়ারাকে ভালোবেসে ফেলেন এবং দোয়ারাতে থাকারই মনস্থির করেন। এই সময়েই তাঁর সাথে আমার পরিচয়। তিনি তখন এক টগবগে এবং সুদর্শন তরুণ। পরবর্তীকালে এই ‘আজাদ’-ই আব্দুল মজিদ নামে প্রখ্যাত হন। ১৯৭৫ সালে রাজনীতির পটপরিবর্তন হলেও তিনি আর নরসিংদি ফিরে যাননি। দোয়ারায় স্কুল প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করেন। দীর্ঘ এক যুগব্যাপী সময় স্কুলে তিনি মেধা, নিষ্ঠা ও শ্রম দিয়ে স্কুলটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। তিনি ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তিনি একজন প্রখ্যাত বীর মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। রাজনীতির নেশা তাঁর মজ্জাগত, রক্তের সাথে মিশে ছিল। তিনি কি আর নিশ্চুপ থাকতে পারেন। দোয়ারা উপজেলা নির্বাচন করলেন। জাতীয় পার্টির সাথে তিনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ১৯৯০ সাথে তিনি জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে ছাতক-দোয়ারা আসন থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে তিনি সুনামগঞ্জের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ব্যাপারে অত্যন্ত সোচ্চার ভূমিকা রাখেন এবং বিভিন্ন সংসদীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। এরআগে ১৯৮৯ সাথে বার কাউন্সিলের সনদ নিয়ে তিনি সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতিতে যোগদান করেন। আইনপেশায় তিনি দক্ষতার পরিচয় দেন। তিনি দীর্ঘদিন জেলা জজ ও দায়রা আদালতে পাবলিক প্রসিকিউটর (পি.পি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হয়ে সুচারুভাবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৫২ সালের ২৫ শে ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মোশাররফ হোসেন এবং মাতার নাম নূরজাহান বেগম। তিনি ২০১৯ সালের ২০ শে এপ্রিল শনিবার দীর্ঘ রোগভোগের পর ইন্তেকাল করেন। তিনি স্ত্রী, দুই পুত্র ও দুই কন্যাসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর স্ত্রী ছালেহা বেগম সুনামগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকা ছিলেন। তিনি সম্প্রতি চাকরী থেকে অবসর নিয়েছেন। আমার স্ত্রী গুলনূর চৌধুরীও তাঁর সাথে একই স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর জৈষ্ঠ পুত্র নাজমুল হুদা হিমেল সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির একজন সদস্য। মজিদ এবং ছালেহা বেগম উভয়ে পবিত্র হজ্বব্রত পালন করেছেন। মানুষ হিসেবে আব্দুল মজিদ ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক, ভদ্র, শালিন ও সামাজিক। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বন্ধুবৎসল। তাঁর মৃত্যুতে আইনজীবী সমিতি হারালো একজন কৃতি আইনজীবীকে, সমাজ ও এলাকা হারালো একজন নিবেদিত প্রাণ সমাজসেবক ও রাজনৈতিক নেতা এবং আমি হারালাম আমার একজন আন্তরিক সুহৃদ কে। তিনি সুনামগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। তাঁর স্মৃতি ও অবদান দীর্ঘদিন জনমনে জেগে থাকবে। আল্লাহ তাঁকে বেহেস্ত নসিব করুন এ দোয়া করি।
লেখক : আইনজীবী ও কলামিষ্ট।