‘সংগ্রামতো শেষ হয়নি জালাল ভাই’

স্টাফ রিপোর্টার
দৈনিক সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি লিখেছেন, ‘ভাবতেই পারছি না জালাল ভাই আর নেই। সিলেটের অন্যতম রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মইনউদ্দিন আহমদ জালাল আজ মারা গেছেন ভারতের শিলংয়ের উডল্যান্ড হাসপাতালে। স্বপরিবারে বেড়াতে গিয়ে আকস্মিকভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হন তিনি।
তার সঙ্গে কতো স্মৃতি- সেই ২৬/২৭ বছর আগের সিলেট পর্বে। একাত্তরের ঘাতক দালাল বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন, বর্ষবরণ, বৈশাখিমেলা, খেলাঘর আসর থেকে উদীচী, ছাত্র ইউনিয়ন-যুবইউনিয়ন থেকে ডব্লিউএসএফ-এর বিশ্বমঞ্চ, কোথায় ছিলেন না জালাল ভাই!
আমরা তাকে জানতাম ক্রাইসিস ম্যানেজার হিসেবে। সবশেষে স্থায়ী হয়েছিলেন নিজের জন্ম শহর সুনামগঞ্জে। সেখানেও কয়েক বছর আগে দেখা হলো একবার।গিয়েছিলাম সমকালের একটি প্রোগ্রামে। আক্ষেপ করে বললেন, ‘জোৎস্নার শহর ডুবে গেছে অন্ধকারে।’ কিছুটা হতাশাও ব্যক্ত করলেন।
চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আপনার মতো উদ্যমী মানুষের মুখেতো হতাশা মানায় না জ্লাাল ভাই।’
‘সেই আগের দিন কি আছে রে ভাই’- বুকে কষ্ট চেপে সেদিন মুচকি হেসেছিলেন তিনি।
মনে পড়ছে ২০১১ সালে বাংলা একাডেমির অমর একুশে বই মেলা থেকে আমার ‘চে’ বইটির অনেকগুলো কপি কিনলেন তিনি। বললেন, ‘তুমি একটি কাজের কাজ করেছো। এবার শুধু এই বইটাই পরিচিতদের উপহার দেবো।’
দেখা না হলেও খবর পেতাম, তিনি আছেন আগের মতোই।হার মানেননি। অন্তর্গত হতাশা সামলে সাধ্যমতো নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে।
সংগ্রামতো শেষ হয়নি জালাল ভাই, এই অবেলায় কেন তবে চলে গেলেন আপনি?’
সত্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু কিছু সত্যকে যদি অস্বীকার করা যেতো!একটি স্ট্যাটাসে এরকম কমেন্ট করেছেন নিলুফার খানম। ফাতেমা চৌধুরী স্বপ্না লিখেছেন, ‘প্রিয় বন্ধু, প্রিয় স্বজন, প্রিয় শহরের প্রিয় মুখ আমাদের জালালের রুহের মাগফেরাত কামনা করছি। ওপারে অনেক ভালো থেকো বন্ধু।’ এভাবে শুধু একজন দুজন নন, দেশে বিদেশে ছড়িয়ে থাকা শত সহ¯্রজনের শোক কাতরতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েছে। রক্ত প্রবাহের মতো, বিলাপের মতো শোকের কাতরতা। চলছে নানা স্মৃতি রোমন্থন, অকাল শোকের কান্না। মানুষটি মইনুদ্দিন আহমদ জালাল। নিউইয়র্ক থেকে সাংবাদিক ইব্রাহিম চৌধুরী লিখেছেন, ‘বিদায় বন্ধু ! আর কোনদিন কোন সমস্যা নিয়ে নেপথ্যের কোন কাজ তোমাকে করতে হবে না। অনেক আসরের গল্প হয়ে থাকবে। নির্ঘুম রাতের উজ্জ্বল কোন তারকা হয়ে তুমি নির্ঘাত দেখা দেবে। স্মৃতি হাতড়ে অনেক কিছু মনে পড়ছে। মন তো আর মন নেই। বড্ড খারাপ হওয়া মন।’
প্রবাসী লেখক-গীতিকার ইসতিয়াক আহমদ রূপু লিখেছেন, ‘জালাল! প্রিয় জালাল। এই দুনিয়ায় অনেকেই জন্মায়, অনেকে সাহায্য করে আনন্দ লাভ করার জন্য। জালাল তাদেরই একজন। শান্তিতে থাকো ভাই জালাল। চেনা জানা সবাই স্মরণ করবে চিরকাল।’
গোলাম সালাদিন লিখেছেন, ‘ আমরা একজন বিনয়ী, ভাল ও বড় মনের মানুষ হারালাম। বিন¤্র শ্রদ্ধা জালাল ভাই, ভাল থাকুন।’
সিলেটের প্রথমআলো ব্যুরো প্রধান সাংবাদিক উজ্জ্বল মেহেদী লিখেছেন, ‘মাথার উপর বড় একটা ‘ছাতা’ ছিল। রোদ-বৃষ্টি-ঝড় এমনকি রাতের নিকষ কালোর পথচলায়ও ছাতাটা সাহস জোগাত, আলো দিত। হারিয়ে ফেললাম চিরতরে!… #অরূপের ‘ইলাস্ট্রেশন, টাইপোগ্রাফি ও অন্যান্য’।
শাহ মুজিবুর রহমান নামের একজন লিখেছেন, ‘একটি আলোকিত তারকার পরিসমাপ্তিঃ এই নগরীর সব প্রান্তে ছিলো যার জীবন্ত হাস্যেজ্বল উপস্থিতি।’
গোলাম সোবহান চৌধুরী লিখেছেন, ‘ মনে পড বে আপনাকে জালাল ভাই। স্মৃতিতেই থাকবেন । আপনার সঙ্গে পরিচয়টা চরম দু:সাহস ও দ্রোহের কালে। তাতো ভুলার নয়।’
মিফতা সিদ্দিক লিখেছেন, ‘ জনমানুষের ও সমাজের কল্যাণে কাজ করে যাওয়ার মহান ব্রত নিয়ে রাজনীতিতে আসলে ও সবাই তা ধরে রাখতে পারে না , বর্তমান সময়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হয়,এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিলেন জালাল ভাই , জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোন প্রাপ্তির আশা না করে নিজেকে হাসিমুখে বিলিয়ে দেয়ার মাঝেই তৃপ্তি খুঁজে পেয়েছিলেন। আমার প্রিয় এই মানুষটির আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি , আল্লাহ তাকে জান্নাত নসিব করুন, আমিন।’
বাংলাদেশ কৃষক লীগের মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক শামীমা শাহরিয়ার লিখেছেন, ‘ সিলেটের জীবনে আমার একজন অভিভাবক জালাল ভাইয়ের মৃত্যুতে আজকের সকল পোস্ট বাতিল করলাম। উনার আত্মার শান্তি কামনা করছি।’
মুহাম্মদ ইফতেখারুল হক লিখেছেন, ‘ প্রিয় মঈন উদ্দিন আহমেদ জালাল ভাই আর নেই। আমি কোনভাবেই সহ্য করতে পারছি না। আমাদের রাজনীতির অনেক বড় সাহসের জায়গাটা শেষ হয়ে গেল।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তবারক হোসাইন অল্প কথায় প্রকাশ করেছেন শোক কথা। লিখেছেন, ‘প্রিয় জালাল, হাজার সালাম।’
যুক্তরাজ্যে প্রবাসী মাহবুবুর রহমান লিখেছেন, ‘জালাল ভাই!!! তাতেই শোকে উতলা বইপত্র কর্ণধার সেলিমা সুলতানা। বলেছেন, ‘জালাল নেই, মানতে পারছি না।’
বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক পীর হাবিবুর রহমান লিখেছেন, ‘জালালের মতোন মানুষকে অকালে চলে যেতে হয়। ভাই হারানোর মতোন গভীর শোক ও বেদনার সাথে জানাচ্ছি যে, সুনামগঞ্জ শহরের প্রিয় মুখ, সন্তান, আমার স্বজন, ভাই, বন্ধু, মইনুদ্দিন আহমেদ জালাল আর নেই। শিলংয়ের উডল্যান্ড হসপিটালে তিনি আজ মারা যান অসুস্থ হয়ে। উনার মৃত্যু আমাদের জন্য গভীর ক্রন্দন ও হাহাকারের। সুনামগঞ্জের জালালাবাদের জালাল বললেই তাকে সবাই চিনতেন। আজীবন ছাত্র ইউনিয়ন থেকে যুব ইউনিয়নের নেতৃত্বে থেকে সকল প্রগ্রতিশীল আন্দোলন সংগ্রাম ও কর্মকা-েই নন, মানুষের সেবায় নিজেকে নিবেদিত করেছিলেন। সবার বিপদে আপদে ছুটে বেড়ানো ছিলো তার স্বভাবজাত। বন্ধুবৎসল, বিনয়ী, ভদ্র কিন্তু অমিত সাহসী আমাদের জালাল ভাই আর আমরা পায়ে পায়ে জল জোছনার শহরে বেড়ে উঠেছি। সিলেটে বাস করলেও তার সাথে সম্পর্ক ছিল অবিচ্ছেদ্য। এই শোক সইবার মতোন নয়। আল্লাহ তার গোনাহ মাফ করে জান্নাতবাসী করুন।’