সংযম শিক্ষাই অতিকথন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে

প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজসম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী শনিবার এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, প্রয়োজনে দিনের বেলায় বিদ্যুতের ব্যবহার বন্ধ রাখার পরামর্শ দেয়া হবে। পরদিন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ খন্দকার এ বক্তব্য নাকচ করে দিয়ে জানিয়েছেন, সরকার এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর বক্তব্যকে একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত মত ও এর ব্যাখ্যা কেবল তিনিই দিতে পারেন বলে তথ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন। বিদ্যুতের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয় নিয়ে সরকারের দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির পরষ্পর বিরোধী বক্তব্য জনগণকে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দেয়। বিশ্বব্যাপী জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের কারণে দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। ফলে সারাদেশে এমনিতেই প্রচ- লোডশেডিং চলছে যা জনগণের দুর্ভোগ যথেষ্ট পরিমাণে বাড়িয়ে দিয়েছে। এরকম অবস্থায় তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর দিনের বেলা বিদ্যুৎ ব্যবহার বন্ধের কথাটি জনমনে আতঙ্ক তৈরি করার মতো বিস্ফোরক একটি মন্তব্য ছিলো। তথ্যমন্ত্রীর কথা থেকে জানা গেলো, সরকার এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। তাহলে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, উপদেষ্টার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসে তৌফিক এ ধরনের ভিত্তিহীন কথা বলেন কী করে? সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলে কথা-বার্তায় সাবধানী থাকতে হয়। যখন যা ইচ্ছা বলা যায় না। কারণ রাম শ্যাম যদু মধুর কথা আর উপদেষ্টা-মন্ত্রীর কথার মধ্যে গুরুত্বগত ব্যবধান থাকে। আম-পাবলিক যা বলতে পারে তাঁরা সেটি পারেন না। কারণ তাঁদের কথায় অনেক কিছু আসে যায়। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ও সুদূরপ্রসারী অভিঘাত তৈরি হয় এতে। জ্বালানী উপদেষ্টার অতিকথনদুষ্ট ভুল ইঙ্গিতের কারণে যেমন জনমনে আতঙ্ক তৈরির একটি পথ তৈরি হয়েছিলো। রক্ষা যে তথ্যমন্ত্রী পরদিনই এই বক্তব্য নাকচ করে সরকারের অবস্থান খোলাসা করেছেন।
জ্বালানী উপদেষ্টার ভূমিকা নিয়ে এই খাতের বিশেষজ্ঞ ও দেশের জ্বালানী খাতের জাতীয় স্বার্থ নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের মূল্যায়ন ইতিবাচক নয়। এই খাতের জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বিদেশি কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থ সংরক্ষণে এই উপদেষ্টার ভূমিকার প্রচুর সমালোচনা রয়েছে। এমন একজন ব্যক্তি জনমনে আতঙ্ক তৈরি করার মতো ভুল তথ্য যখন জাতির সামনে উপস্থাপন করেন তখন তাঁর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা সঙ্গত বৈকি। শুধু জ্বালানী নয় সার্বিকভাবেই সামনের দিনগুলোতে অর্থনীতি প্রচ- চাপে পড়তে পারে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে এই আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। এ কারণে দেশে দেশে সরকার আসন্ন দুর্যোগ মোকাবেলায় করণীয় ঠিক করেও রেখেছেন। জনগণকে সাশ্রয়ী ও মিতব্যয়ী হতে হবে সবক্ষেত্রে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও এমন পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন কিছুদিন ধরে। তবে সেই অভিঘাত এখনও আসেনি। আসলেও বাংলাদেশ এর প্রভাব কেমন হবে তা নিয়েও কোনো পরিষ্কার ধারণা নেই। বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা ও জনগণের অল্পতুষ্টিজনিত অভ্যাসের কারণে আমরা হয়তো সেই বিপর্যয় সামাল দিতে পারব। সেজন্য মানুষকে পূর্বাভাস দিয়ে সাবধানী করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু এই অজুহাতে মানুষকে আতঙ্কিত করা সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কাজ হতে পারে না।
আমরা কথায় কথায় অন্যদের সংযমের শিক্ষা দেই। এই সংযম শুধু বস্তুগত উপাদান ব্যবহারের ক্ষেত্রেই নয় বরং কথাবার্তা, চালচলন; প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্যই প্রযোজ্য। অতিকথন, ভুল বক্তব্য দেয়া প্রভৃতি অসংযমী অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মানায় না। আর জেনে যদি এমন কেউ করেন তাহলে তাঁর অভিসন্ধি নিয়ে তত্ত্বতল্লাশ করা জরুরি। জ্বালানী উপদেষ্টার কথা নিছক অতিকথন নাকি ইচ্ছাকৃত বিভ্রান্তি তৈরির অপপ্রয়াস সেটি সরকারকেই পরিষ্কার করতে হবে। তবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় নিয়োজিত সকলকে যে আরও সংযমী হতে হবে এ কথা উপদেষ্টার বক্তব্য থেকে আবারও বুঝা গেলো।