সদ্যস্বাধীন রাজ্যে সম্রাটের প্রত্যাবর্তন

বিশ্বজিত রায়
চারপাশে অপেক্ষার অহং অভিব্যক্তি। কি মানুষ, কি প্রকৃতি। সকলই আনন্দমুখর। যেন কোনো মহামনীষী নামবেন এই প্রতিক্ষিত পরগনায়। তাই মানুষ ও প্রকৃতির মাঝে এক বিরল ব্যস্ততা বিরাজ করছিল। শুচিশুদ্ধ এ মুহূর্তে শীত আকাশে ছিল আলসে সূর্যের লুকোচুরি খেলা। তখন মৃত্তিকা মুড়ানো বঙ্গবক্ষে বিহঙ্গবেশে চষে বেড়ানো কুয়াশা সূর্যের খেলার সঙ্গী। সূর্য কুয়াশার নিঃশব্দ হৈহুল্লোরে কত্ত যে খুশির বাদ্য বাজনা। সেই সাথে পাখিকণ্ঠে গান, তরুলতায় গাঢ় রঙের হরিৎ স্ফুরণ, বিস্তীর্ণ মাঠে সবুজের লাস্যময়ী আবেদন, হিম হাওয়ায় শীতের সুরসুরি ভাব, পথপারে গজিয়ে ওঠা অচেনা ফুলের নর্তন, মাথার ওপরে ডানা মেলা পরিযায়ী পালের চলন্ত আওয়াজ ও দূরদিকে ছুটে চলা পথরেখায় ছিল শেষ গন্তব্যে মিশে যাওয়ার পূর্ণ প্রস্তুতি। শীতার্ত প্রকৃতির এমন মনোরম রেশ গিয়ে যুক্ত হয়েছিল মনুষ্য বহরে। প্রকৃতি ও মানুষের এই মিলনমেলায় ছিল সুমহান এক যুদ্ধজয়ী স¤্রাটের স্পর্শিত ভাব।
পৌষের প্রকৃতি পবনে জবথবু মানুষ ছুটে চলেছে কোনো এক জগৎশ্রেষ্ঠ প্রাণের দৈহিক দেখা পেতে। মুক্তির মহানন্দে মাতোয়ারা বঙ্গজননীও তার বক্ষে লালিত প্রাণপ্রিয় সেই সাহসী সন্তানকে একনজর দেখতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। সন্তানের আগমনী স্পর্শ কখন এসে বাংলা মায়ের মৃত্তিকাদেহে দোলা দিয়ে যাবে সেই প্রতীক্ষায় প্রহর গুণছেন অহংকারী জননী বঙ্গীয় মাতা। এই তাক লাগানো মানুষটিকে দেখতে গর্বিত বিজয়ী বাংলার রূপসী আচলে হেঁটে চলেছে তার উদ্বেলিত কোটি বাঙালি সন্তান। কৃষিযন্ত্র দূরে ঠেলে কর্দমাক্ত কৃষক, জাল উড়ানো জেলে, দিনদুপুরে কর্ম সপে দিনমজুর, তেজস্বীতপ্ত লোহা পেঠানো লৌহ কামার, মাটিমাখা হাতে কুমোর, কাঠ কাটানি কাঠুরে, নৌকা চড়ানো মাঝি, প্রেয়সী প্রীতি ভুলে প্রেমিক, সঙ্গমসঙ্গী ছেড়ে পতিতা, কবিত্ব ভাবের কবি ও গান গাওয়া গীতিওয়ালা ছাড়াও নানা গোত্রের মানুষ গিয়ে জড়ো হতে থাকে ওই মহামানবের আগত মঞ্চ ময়দানে।
কখন আসবেন আকাশে উড়া সাদা মেঘের তুলতুলে আভা সরিয়ে শান্তির শ্বেত কপোত ও মানবতার মহান মনুষ্য মূর্তি। গগনপানে কোটি প্রাণের সেই প্রতীক্ষা দৃষ্টি। বলছিলাম হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন বাংলার স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা। সেদিন তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের খবরে বাংলার মাটি, মানুষ ও প্রকৃতি তটে ফুটে উঠেছিল পুনরোজ্জীবিত ভাব।
তিনি আসবেন বিজয়ীবেশে, সদ্য স্বাধীন রাজ্যের মুকুটহীন স¤্রাট সেজে, এক সাগর রক্তে কেনা স্বাধীনতার লাল সবুজ পাগড়ি মাথায় মুড়িয়ে, দীর্ঘ যাতনার বঞ্চিত ক্ষত ধুয়েমুছে পরিশুদ্ধ পরিচয়ের শুচি বস্ত্র গায়ে জড়িয়ে, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের ব্যথিত ব্যাকুলতা বিচূর্ণ মনে, আকাশে বাতাসে উড়ন্ত মেঘমালার শুভ্র কুন্ডলীতে সওয়ার হয়ে, বিশ্বের ক্ষমতাধর শক্তিগুলোকে বীরত্বপূর্ণ বার্তায় ঠাসা সাবধানী সুর শুনিয়ে, পাপিষ্ট পাকিদের অন্যায় অবিচারী আচরণকে পদপিষ্ট করে ‘তোরা মানুষ হয়ে যা’ সাহসী বুলি ছেড়ে, নয় মাস কারা প্রকোষ্টের অন্ধকারে হার না মানা বিপ্লবী সৈনিকের অপরাজিত অহংকারী বোধে পরিশ্রান্ত দেহখানি দাঁড়াবে এই বঙ্গজননীর ¯েœহময় বাহুডোরে। মুক্তির সংগ্রামে জীবন বাজি রাখা যুদ্ধ খেলায় সাড়ে সাত কোটি বাঙালি দলের দুঃসাহসী দলনেতা ইতিহাসের মহানায়ক স্বাধীন দেশে প্রত্যাবর্তন করবেন। তাই পল্লীপাড়ার মেঠোপথ থেকে শহরের রাজপথ ছিল লোকে লোকারণ্য। স্বাধীন ভূখন্ডে ছিল কোটি প্রাণের প্রতীক্ষিত ব্যাকুলতা। অপেক্ষা শুধু অপেক্ষা।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার বাঁধ ভেঙ্গে আকাশযানে উড়ে আসলেন বাঙালির প্রাণভোমরা, স্বাধীন বাংলার স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা পেলেও প্রকৃত স্বাধীনতার সাধ ছোঁয়া হয়ে উঠেনি। কারণ স্বাধীনতার পথপ্রদর্শক বঙ্গস্থপতি তখনও পশ্চিম পাকিস্তানের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দী। কিন্তু নয় মাসের যুদ্ধরত মানুষ কিংবা সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ জানত না তাদের হৃদস্পন্দন কোথায় আছেন। অবশেষে সকল ব্যাকুলতা কাটিয়ে মুক্তির মহামুনিব, মানবতার মহান দূত, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বীরবেশী সিংহ প্রতাপে এসে নামলেন স্বাধীন স্বদেশের পবিত্র মাটিতে। তাঁর প্রত্যাবর্তনে চারপাশে বেজে উঠলো বিজয়ী মাদল। আকাশে উড়লো হর্ষধ্বনি। বাঙালি বাংলাদেশ পেল প্রকৃত বিজয়ের সাধ।
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ স্বাধীনতা সোনালী সূর্যের আভায় শীত নিবারণের সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি। এই দিনটি ছিল বাঙালি জাতির জন্য একটি ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় মাহেন্দ্রক্ষণ। স্বাধীন দেশে বীরেরবেশে মহান নেতা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগমন ঘটে নিজ মাতৃভূমি প্রিয়   



আরো খবর