সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বিদেশি কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দের কাছে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা চেয়েছেন। এর আগে ওইদিন দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের বিষয়টি স্বীকার করে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনুপ্রবেশকারীদের সহায়তা দানের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে সেদেশের সেনাবাহিনী চরমভাবে নির্যাতন করায়  রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ সম্প্রতি বেড়ে গিয়ে একটি কঠিন সমস্যা তৈরি করেছে। মিয়ানমারের এই জাতিগত নীপিড়নের ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার আশংকা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গা দলনের বিষয়টিতে সাম্প্রতিক সময়ে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর, ওআইসি ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে এবং তারা অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দানের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করেছে। অন্যদিকে দেশের ভিতরেও মিয়ানমারের এই জাতিগত নিপীড়নের বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ফলত এই ইস্যুতে বাংলাদেশের নিরব থাকার আর কোন সুযোগ নেই। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সঠিকভাবেই বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক ফোরামে উপস্থাপন করে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। কারণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ই এখন কেবল মিয়ানমারের উপর চাপ তৈরি করে রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধান দিতে পারে। বাংলাদেশ সরকারকে রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে আন্তর্জাতিকিকরণে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে।     
মিয়ানমার এই বিশ্বের বাইরের কোন রাষ্ট্র নয়। আন্তর্জাতিক আইন-কানুন ও মানবাধিকার সংরক্ষণে মিয়ানমারও বাধ্য। তাই সেদেশে যখন সরকারি প্রশ্রয়ে একটি জাতিগোষ্ঠীর উপর আক্রমণ ও নির্যাতন পরিচালিত হয় তখন বিশ্বের দায়িত্ব হয়ে পড়ে ওই বিষয়টিতে নাক গলানো। কোন রাষ্ট্রের জাতিবিদ্বেষী নীতির কারণে একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী ্ক্রমাগত দলন-পীড়নের শিকার হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এটি কখনও কেউ সমর্থন করবেন না। আমরা অপেক্ষায় রয়েছি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের উপর কী ধরনের চাপ তৈরি করতে সক্ষম হন সেটি দেখার জন্য।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে একটি মহল সচেতনভাবে রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে সংখ্যালঘু দলনের পরিবর্তে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী কর্তৃক মুসলিম নির্যাতন হিসেবে প্রচার করে একধরনের সাম্প্রদাািয়ক উন্মাদনা তৈরিতে নিয়োজিত হয়েছেন। ওই মহলের আরও দায়িত্বশীল প্রতিবাদের দিকে অগ্রসর হতে হবে। কারণ এই ধরনের প্রচারণায় আসলে রোহিঙ্গাদের কোন উপকার হবে না। বরং এ নিয়ে সারা বিশ্বে একধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হবে। রোহিঙ্গ্ াজাতিসত্বা মিয়ানমারের অন্তর্গত রাখাইন রাজ্যের ঐতিহাসিত একটি জাতিসত্বা হওয়া সত্বেও কেন্দ্রীয় সরকার তাদেরকে নিজ দেশের নাগরিক হিসেবে কেন স্বীকৃতি দিচ্ছেন না সেই বিষয়ে মিয়ানমারের উপর চাপ তৈরি করতে হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে। যেনতেনভাবে সমস্যার সাময়িক সমাধানের পরিবর্তে এর স্থায়ী সমাধানের দিকে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের অভ্যন্ত্ররে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দেওয়া এর মূল সমাধান নয়। মূল সমাধান হলো রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের বৈধ নাগরিক হিসাবে স্বীকৃতি অর্জন করা।
জাতিগত বা ধর্মীয় কিংবা সম্প্রদায়গত সংখ্যালঘু নির্যাতন বর্তমান বিশ্বের একটি কঠিনতম সমস্যা। বিভিন্ন দেশে এটি হচ্ছে বিভিন্ন আঙ্গিকে। বিশ্ববাসীকে আজ এই সংখ্যালঘু দলনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে মানবিক পরিচয়ের পতাকাতে উর্দ্ধে তুলে ধরে। সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই। এই সারকথার ভিতরে ঢুকতে হবে পুরো বিশ্ববাসীকে। নতুবা বিশ্ব শান্তি সুদূর পরাহত হয়েই থাকবে। রোহিঙ্গা দলনের উদাহরণকে সামনে রেখে আসুন আমরা সকলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হৃদয়ে আর্তি বুঝার চেষ্টা করি।