সমবায় দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

এস ডি সুব্রত
সমবায় শুধু একটি আন্দোলন নয়, পরিবর্তন তথা সমাজ উন্নয়নের এক মোক্ষম হাতিয়ার। দারিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যমে স্বনির্ভর জাতি গড়তে দেশে দেশে সমবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সমবায়ের চেতনায় নিপীড়িতদের জাগানোর প্রয়াস পেয়েছিলেন। সমবায়ের গুরুত্বের কথা অনুধাবন করে তিনি রচনা করেছিলেন সমবায় সঙ্গীত।
ওরে নিপীড়িত ওরে ভয়ে ভীত
শিখে যা আয়রে আয়
দুঃখ জয়ের নবীণ মন্ত্র
সমবায় সমবায়। (সমবায় সঙ্গীত- কাজী নজরুল ইসলাম)
প্রতি বছর নভেম্বর মাসের প্রথম শনিবার বাংলাদেশে পালিত হয় জাতীয় সমবায় দিবস। এ বছর ৫১তম জাতীয় সমবায় দিবস আজ ৫ নভেম্বর শনিবার। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমবায়ের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেবার স্বপ্ন দেখতেন। তিনি সংবিধানের ১৩নং অনুচ্ছেদে মালিকানার ২য় খাত হিসেবে সমবায়কে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা তার সত্যিকারের অর্থ খুঁজে পাবে অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের মাধ্যমে। ১৯৭২ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় ইউনিয়ন আয়োজিত সমবায় সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমার দেশের প্রতিটি মানুষ খাদ্য পাবে, আশ্রয় পাবে, শিক্ষা পাবে, উন্নত জীবনের অধিকারী হবে-এই হচ্ছে আমার স্বপ্ন।’ এই লক্ষ্য অর্জনে গণমুখী সমবায় আন্দোলনকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। কেননা সমবায়ের পথ, সমাজতন্ত্রের পথ, গণতন্ত্রের পথ। সমবায়ের মাধ্যমে গরিব কৃষকরা যৌথভাবে উৎপাদন-যন্ত্রের মালিকানা লাভ করবে। অধিকতর উৎপাদন বৃদ্ধি ও সম্পদের সুষম বণ্টন ব্যবস্থায় প্রতিটি ক্ষুদ্র চাষি গণতান্ত্রিক অংশ ও অধিকার পাবে। কৃষক, শ্রমিক, তাঁতি, জেলে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যদি একজোট হয়ে পুঁজি এবং অন্যান্য উৎপাদনের মাধ্যমে একত্রিত হতে পারেন তবে আর মধ্যবর্তী ধনিক ব্যবসায়ী শিল্পপতির গোষ্ঠী তাদের শ্রমের ফসলকে লুট করে খেতে পারবে না। স্বাধীনতার পরে জাতির পিতার নির্দেশ অনুযায়ী সারা দেশে সমবায়ভিত্তিক নানা কার্যক্রম চালু হয়। গ্রামভিত্তিক কৃষি সমবায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কৃষকদের উচ্চফলনশীল বীজ, কৃষি উপকরণ ও যন্ত্রপাতি এবং গভীর নলকূপ সরবরাহের ব্যবস্থা তিনি করেছিলেন। পাশাপাশি তাঁর উৎসাহে জেলে, তাঁতি প্রভৃতি পেশাভিত্তিক সমবায় সমিতি গঠনের মাধ্যমে সমবায়ের নতুন যাত্রাপথ তৈরি হয়। সমবায় পদ্ধতিতে গ্রামে গ্রামে, থানায়, বন্দরে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয় মেহনতি মানুষের যৌথ মালিকানা। এর ফলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের বিনিময়ে পাবে ন্যায্যমূল্য, শ্রমিকরা পাবে শ্রমের ফল, ভোগের ন্যায্য অধিকার। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে সমবায় আন্দোলন ছিল সাধারণ মানুষের যৌথ আন্দোলন। সমবায়ের বিকাশ ও সুষ্ঠু পরিচালনার স্বার্থে দুর্নীতির জগদ্দল পাথরকে সরাতে চেয়েছিলেন তিনি।
হাওরপাড়ের চার মহাজনের অন্যতম মহাজন বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম তাঁর গানে কথায় নিপীড়িত মানুষের দুঃখের কথা, হাসি কান্না বেদনা তুলে ধরেছেন। বাউল সাধক আবদুল করিম তাঁর গানে সমবায়ের গুরুত্বের কথা তুলে ধরেছেন-
“দেশ ও দশের যদি চাও উন্নতি
গ্রামে গ্রামে গড় সমবায় সমিতি
বিভেদ ভুলে যাও হয়ে একে অন্যের সাথী
এক হয়ে দাঁড়াও দেশের সম্পদ বাড়াও
সমবেত কন্ঠেতে গাও সমবায় গীতি।”
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চেয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে বাধ্যতামূলক সমবায় প্রতিষ্ঠিত হবে। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক ভাষণে প্রস্তাব রেখেছিলেন, ‘গ্রামের প্রত্যেকটি কর্মঠ মানুষ বহুমুখী সমবায়ের সদস্য হবে। যার যার জমি সেই চাষ করবে, কিন্তু ফসল ভাগ হবে তিন ভাগে- কৃষক, সমবায় ও সরকার।’ এই গ্রামীণ সমবায়কে তিনি নতুন গ্রাম সরকার হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। বলেছিলেন, তাদের হাতেই উন্নয়ন বাজেটের অংশবিশেষ তুলে দেওয়া হবে, ওয়ার্কস প্রোগ্রামও থাকবে তাদের হাতে।
গবেষকদের মতে, বঙ্গবন্ধু যে সমবায়ের কথা বলেছেন, চীন বা সোভিয়েত ইউনিয়নের কালেকটিভ ফার্মিংয়ের থেকে কিছুটা ভিন্ন হলেও তা সমাজতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা দ্বারা অনুপ্রাণিত।
তিনি কৃষকদের মালিকানাধীন জমি ছিনিয়ে নেওয়ার কথা বলেননি। সমাজের কাঙ্খিত পরিবর্তনের জন্য বঙ্গবন্ধু সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিলেন ‘বহুমুখী সমবায়’-এর ওপর। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের ভাষণটির একটি অংশ আবারও স্মরণীয়- ‘পাঁচ বছরের প্ল্যান এ বলেন, বাংলাদেশের ৬৫ হাজার গ্রাম কো-অপারেটিভ হবে। প্রত্যেকটি গ্রামে এই কো-অপারেটিভে জমির মালিকের জমি থাকবে। কিন্তু যে বেকার, প্রত্যেকটি মানুষ, যে মানুষ কাজ করতে পারে, তাকে কো-অপারেটিভের সদস্য হতে হবে। এগুলো বহুমুখী কো-অপারেটিভ হবে। পয়সা যাবে তাদের কাছে, ফার্টিলাইজার যাবে তাদের কাছে, ওয়ার্কস প্রোগ্রাম যাবে তাদের কাছে। আস্তে আস্তে ইউনিয়ন কাউন্সিলের টাউটদেরকে বিদায় দেওয়া হবে। তা না হলে দেশকে বাঁচানো যাবে না। এ জন্যই ভিলেজ কো-অপারেটিভ হবে।’ উৎপাদন ও বণ্টনব্যবস্থা তথা সমাজের কাঠামোর আমূল রূপান্তরই ছিল বঙ্গবন্ধুর সমবায় ভাবনার মূল লক্ষ্য। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভূমি সংস্কারের বদলে সমবায়ভিত্তিক যৌথ চাষের যে প্রস্তাব তিনি করেছিলেন, তা ছিল অধিক বাস্তবসম্মত। বঙ্গবন্ধু শুধু যে যৌথ চাষাবাদের প্রস্তাব রাখেন তা-ই নয়, তিনি পুরো গ্রামকে একটি সমবায়ী ব্যবস্থাপনার অধীনে আনার কথা ভেবেছিলেন। এ কথার অর্থ, গ্রামের যাবতীয় সম্পদ-তার জমি, ফসল ও পানির ব্যবস্থাপনায় থাকবে গ্রামের মানুষের যৌথ ভূমিকা। গ্রাম সমবায়ের মাধ্যমে যে বাড়তি আয় হবে, তার সুষম ব্যবহার ও বণ্টনের জন্য বঙ্গবন্ধু একটি ‘গ্রাম তহবিলের’ কথা ভেবেছিলেন। এই তহবিলের আয় আসবে উৎপাদিত ফসলের একাংশ থেকে, বাকিটা আসবে কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ থেকে। বঙ্গবন্ধুর এই সমবায়ী গ্রামের প্রস্তাবটি এখনও প্রাসঙ্গিক। কারণ গ্রামের ক্ষমতায়নের একটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে গ্রামকে একটি সমবায়ী ইউনিটে পরিবর্তিত করে তাকে গণপ্রশাসনের প্রথম স্তর হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। গ্রামের মানুষ একত্র হলে দুষ্টলোকদের ঠেকানো কঠিন নয়। বঙ্গবন্ধুর মতাদর্শ ধারণ করেই শেখ হাসিনা সরকার গ্রামকে উন্নয়নের ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। ‘একটি খামার, একটি বাড়ি’র মতো প্রকল্প সার্বিক গ্রাম উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কারণ গ্রামের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন সম্পৃক্ত হয়েছে ‘সমবায়’।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এদেশের দরিদ্র জেলেদের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে জাতীয় জলমহাল নীতিমালা ২০০৯ প্রণয়ন করেছেন। ফলে দরিদ্র মৎস্যজীবীদের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে। পূর্বে যেখানে প্রভাবশালী ওয়াটার লর্ডদের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকত জলমহালে, জলমহাল নীতিমালা হওয়ার পর সে অবস্থা অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। মৎস্যজীবী সম্প্রদায় পুরোপুরি সুবিধা না পেলেও তাদের অধিকার অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কারণ এ নীতিমালা হওয়ার কারণে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের সংগঠন মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি ছাড়া অন্য কেউ জলমহাল বন্দোবস্ত নিতে পারে না।
বঙ্গবন্ধুর মডেল ভিলেজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু মডেল গ্রাম সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন। সারাদেশে দশটি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসাবে নেয়া হয়েছে বঙ্গবন্ধু মডেল গ্রাম সমবায় সমিতি যেখানে শহরের যাবতীয় সুযোগ সুবিধা থাকবে। এ সমিতির উদ্যোগে যৌথ চাষাবাদ পদ্ধতি, সমন্বিত মৎস্য চাষ আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে চাষাবাদে সমিতির সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। পর্যায়ক্রমে সারা দেশে প্রত্যেক উপজেলায় প্রতিষ্ঠা করা হবে বঙ্গবন্ধু মডেল গ্রাম সমবায় সমিতি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে যে উন্নয়নের কার্যধারা এগিয়ে চলেছে সেখানে জাতীয় সমবায় দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম। নিপীড়িত মানুষের উন্নয়নের মোক্ষম হাতিয়ার সমবায়। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সমবায় দিবস বারবারই আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করছে। সততা, নিষ্ঠা আর আন্তরিকতার সাথে কার্য সম্পাদন এবং সমবায়ভিত্তিক কার্যক্রম, প্রশিক্ষণ ও সমবায় সম্পর্কিত গবেষণার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে সমবায় দিবসের তাৎপর্য ও গুরুত্ব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে। দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে কার্যকর ও পরিক্ষিত পদ্ধতি সমবায়। বাংলাদেশের এক চতুর্থাংশ মানুষ সমবায়ের সাথে জড়িত। সমবায়ের নীতি ও আদর্শ সত্যিকার অর্থে কাজে লাগাতে পারলে সমবায়ের মত সুশৃঙ্খল ও গণতান্ত্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা আর দ্বিতীয়টি নেই বিশ্বে। বিশ্বকবি রবি ঠাকুর বলেছিলেন সমবায় প্রণালীতে অনেকে মিলে আপন শক্তিকে যখন ধনে পরিণত করতে শিখবে তখনি সর্ব মানবের ভিত্তি স্থাপিত হবে। কবি গুরু বলেছিলেন–
“মানুষে মানুষে সম্মিলনে
সভ্যতা গড়ে উঠবে বিশ্ব জুড়ে।”
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ