সমৃদ্ধির পথে চ্যালেঞ্জ : বাংলাদেশ

হিরন্ময় রায়
২০০৮ সাল হতে বিশ্ব অর্থনীতি মন্দায় প্রবেশ করেছে। প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিশ্ব বাণিজ্যের জায়ান্ট কেন্দ্র চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ব্রাজিল, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রসমূহ, মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরবসহ অন্যান্য রাষ্ট্রসমূহে। এই সংকটকালেও সস্তাশ্রম ও আভ্যন্তরীণ উৎপাদনের সহায়তায় বাংলাদেশ নিজস্ব প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে একে ‘বাংলাদেশ প্যারাডক্স’ হিসেবে আখ্যা করা হয়ে থাকে। সম্প্রতি সারা বিশ্বে করোনা সংকট আঘাত হানায় স্থবির হয়ে পড়েছে বৈশ্বিক উৎপাদন, বিপণন ও সেবা খাত। প্রবৃদ্ধি সংকুচিত হচ্ছে জ্যামিতিক হারে। ফলশ্রুতিতে কর্ম হারিয়ে বেকার হয়ে পড়ছেন মিলিয়ন মিলিয়ন লোক। এরফলে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় উৎপাদনও হ্রাস পেয়েছে। ফলে উৎপাদনকেন্দ্র্রগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। স্থায়ী ভাবে কাজ হারাচ্ছেন আরো অনেক লোক। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে উন্নত রাষ্ট্রে শ্রমশক্তি ও ভোগ্যপণ্য রফতানি করা উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের অর্থনীতির উপর। সেখানকার উৎপাদন খাত ও রেমিটেন্স প্রবাহ সংকোচিত হয়েছে এবং এধারা অব্যাহত থাকবে। এখন দেখুন এদেশ যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়ায় শ্রমশক্তি ও ভোগ্যপণ্য বিশেষ করে গার্মেন্টস পণ্য, চামড়াজাত পণ্যসহ নানাবিধ পণ্য রফতানি করে আসছে দীর্ঘদিন থেকে। এই দুইটি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন।
২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী উল্লেখ করেছেন যে, প্রায় এক কোটি প্রবাসী রয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে। প্রথম আলো পত্রিকায় অর্থনীতি নিবন্ধ বিভাগে ১০/১২/২০১৯ খ্রি. তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রবাসী আয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান নবম। বাংলাদেশের সামনে রয়েছে ভারত, চীন, মেক্সিকো, ফিলিপাইন, মিশর, নাইজেরিয়া ও ভিয়েতনাম।
কিন্তু সংকোচিত বিশ্ব অর্থনীতির প্রভাব পড়তে শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া থেকে ফিরেছেন ও ফিরতে চলেছেন বাংলাদেশী শ্রমিক ভাইরা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে কাজ হারাচ্ছেন অনেকে। এর উপর আরেকটি সমস্যা হলো প্রবাসী আয়ে বাংলাদেশকে শ্রমশক্তি রফতানি করা অন্যান্য প্রতিদন্দ্বী রাষ্ট্রের সাথে পিছিয়ে পড়তে হয়েছে কর্মদক্ষতার কারণে। বিশ্বব্যাংকের একটি তথ্য দেখলে অবস্থাটা পরিষ্কার হবে। তথ্য অনুযায়ী ২০১৭ সালে ৯০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে পাঠিয়েছেন ১৪০০ কোটি মার্কিন ডলার। একই সময়ে ফিলিপাইনের ৬৫ লাখ প্রবাসী শ্রমিকরা দেশে পাঠিয়েছেন ৩৩০০ কোটি মার্কিন ডলার। ফিলিপাইনের দক্ষ শ্রমিকরা এই পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন। কর্ম হারিয়ে দেশে ফেরা শ্রমিকের বেকারত্ব ও অদক্ষ শ্রমিকের তুলনামূলক কম আয় আমাদের দেশের জন্য এখন একটি চ্যালেঞ্জ। অপরদিকে ভোক্তা সংকোচনে উৎপাদন ও সেবা খাতও সংকোচিত হচ্ছে। এই দ্বিমুখী নেতিবাচক চাপে অর্থনীতি বেকায়দায় পড়বে। এই চাপ থেকে বের হয়ে আসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কী প্রস্তুতি আছে? কী শক্তি আছে এ দুর্যোগ থেকে বাঁচার?
বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে কর্মমূখী ও উৎপাদনমূখী শিল্পের দিকে এগিয়ে চলেছে। তৈরী পোশাক, চামড়া, ঔষধ, পাটজাত পণ্যশিল্প ইত্যাদি খাত আলো দেখাচ্ছে। আভ্যন্তরীণ সেবা খাতও প্রসারিত হয়েছে। এই দুই খাতে বিপুল কর্মসংস্থান হয়েছে। যদিও কৃষি খাতেই সবচেয়ে বেশি নিয়োজিত আছে শ্রমশক্তি, প্রায় ৪০.৬ শতাংশ ।
বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তিই হলো শ্রমশক্তি। বাংলাদেশ ২০১২ সাল থেকে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট’ যুগে প্রবেশ করেছে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট কী? জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল এর সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে- ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট হলো, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির একটি সম্ভাবনা, যা জনসংখ্যাগত কাঠামোর পরিবর্তন। প্রধানত কর্মক্ষম জনসংখ্যা (১৫-৬৪ বছর) যখন নির্ভরশীল জনসংখ্যাকে ( ০-১৪ বছর ও ৬৫+ বছর) ছাড়িয়ে যায়। বাংলাদেশে স্বাধীনতা পরবর্তী দশকে ২২% জনসংখ্যা ছিল কর্মক্ষম এবং ৬৮% ছিলো নির্ভরশীল জনসংখ্যা। ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশে ৬৮ৈ জনসংখ্যার বয়স ১৮-৫৯ বছর। এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট চলবে ৩০-৩৫ বছরকাল। প্রায় ২০১২-২০৪৭ সাল পর্যন্ত। প্রত্যেক রাষ্ট্রের একবার এ সুযোগ আসে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে জাপান, সিঙ্গাপুর, চীন, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া আজ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। কিন্তু জঙ্গীবাদ, দুর্নীতি, অস্থিতিশীলতার কারণে এ সুযোগ কাজে লাগাতে না পাড়ায় সম্পদশালী হয়েও নাইজেরিয়া উন্নতি করতে পারেনি।
বাংলাদেশের এই বিপুল কর্মক্ষম জনশক্তিই এখন সংকট উত্তোরণের মূল শক্তি। এ শক্তির উপর ভর করে এগিয়ে চলেছে দেশ। বিশ্বব্যাংকের লেবার ফোর্স সংক্রান্ত ২০১৯ সালের তথ্য মতে বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তি ৭ কোটি ৯ হাজার ৩ শত তিপ্পান্ন জন। এই বিপুল শ্রমশক্তির একটা অংশ আভ্যন্তরীণ উৎপাদন, সেবাখাতে নিয়োজিত করে ও প্রবাসে রফতানি করে আমাদের দেশ ধারাবাহিক ভাবে দেশীয় প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে চলেছে। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিক্স এর তথ্য মতে ২০১৭-১৮ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিলো ৮%, ২০১৮-১৯ সালে ছিলো ৮.১৩% ও ২০১৯-২০ সালে প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন হয় ৮.২৫%।
করোনা সংকটে এ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কাংখিত মাত্রায় অর্জন সম্ভব হবে না। কিন্তু থমকে থাকলে চলবে না। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের রাষ্ট্র ও ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রে উন্নীত হওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছেন। স্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থা ও দূরদর্শী নেতৃত্বে ২০১৫-২০১৯ সাল মেয়াদে ৭ম পঞ্চবার্ষিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ দরিদ্র দেশের তকমা গা থেকে ঝেড়ে ফেলে এখন নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ। এখন বিপুল কর্মক্ষম জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে। প্রয়োজন দক্ষ শ্রমশক্তি ও এদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। সরকার বসে নেই। কাজ চলছে।
এজন্য ৮ম পঞ্চবার্ষিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। ২০২০ সালের জুলাই থেকে শুরু হতে যাচ্ছে এই কর্মপরিকল্পনা। ৮ম পঞ্চবার্ষিক কর্মপরিকল্পনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জন ও রূপকল্প ২০৪১ অনুযায়ী ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রে উন্নীত হওয়ার এবং ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ হলো এই ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। দক্ষতার উন্নয়ন ঘটিয়ে টেকসই উন্নয়ন অর্জনই হলো এর মূল লক্ষ্য। আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচনী ইশতেহার মোতাবেক আগামী ২০২৩ সালের মধ্যে ১কোটি ৫০ লক্ষ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে এই ৮ম পঞ্চবার্ষিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চলেছে। বিপুল শ্রমশক্তিকে দক্ষ শ্রমশক্তিতে রূপান্তর করতে দেশে কর্মমূখী শিক্ষার প্রসার ঘটাতে প্রতিটি জেলায় জেলায় কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। এখন প্রতিটি উপজেলায় এ ধরণের প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণের কাজ চলছে। এর মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরী করা হবে।
আমাদের এখন প্রয়োজন শ্রমশক্তি আমদানীকারক রাষ্ট্রের চাহিদা মোতাবেক দক্ষ শ্রমশক্তি গড়ে তোলা। এজন্য বিশ্বের চাহিদা স্টাডি করে কারিগরি শিক্ষা কারিকুলামের পরিবর্তন করে বৈশ্বিক মানের কারিকুলাম প্রণয়ন করতে হবে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল মেশিনারী ড্রাইভার, নার্সিং, কৃষি, নির্মাণ, ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল, আইটি খাতে দক্ষ জনবল তৈরী করতে হবে। সাথে রাখতে হবে ইংরেজি, আরবি, জাপানিজ, কোরিয়ান, মালয়েশিয়ান ও ফ্রেঞ্চ ভাষা শিক্ষা কোর্স। সর্টটাইম কোর্স নয়, ৬ মাস থেকে ২ বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা কোর্স। সরকারের পাশাপাশি জনশক্তি রফতানিকারকরাও এ ধরণের বিশ্ব মানসম্পন্ন ট্রেনিং প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় এগিয়ে আসতে হবে। এই দক্ষ জনশক্তি উন্নত রাষ্ট্রে রফতানি করে বৈদেশিক রেমিটেন্স আয় দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ করা সম্ভব। কারণ জনশক্তি রফতানির বড় বাজার মধ্যপ্রাচ্যের সাথে এখন কূটনৈতিক সুসম্পর্ক বজায় আছে।
নার্সিং ও আইটি এবং কৃষি খাতে আলাদা নজর রাখতে হবে। কারণ আগামী বিশ্ব স্বাস্থ্য, আইটি ও কৃষি খাতে বিনিয়োগ করবে বেশি। এজন্য এ খাতে তাদের প্রয়োজন পড়বে দক্ষ জনবল।
এছাড়াও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশের অভ্যন্তরে সরকার ১০০টি ইপিজেড গড়ার পরিকল্পনা করছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ড বলছে এগুলোতে এক কোটি লোকের কর্মসংস্থান হতে যাচ্ছে। দেশে বেপজা নিয়ন্ত্রিত সরকারি ৮টি ও বেসরকারি পর্যায়ে আরো ২টি ইপিজেড চালু আছে। চলতি বছরে আরো ৪টি ইপিজেড- চট্টগ্রাম বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরী, মৌলভীবাজারের শ্রীহট্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল ও খুলনা ইপিজেড প্রস্তুত করা হয়েছে বা হচ্ছে। এগুলোতে প্রয়োজন পড়বে আরো দক্ষ জনবল। সরকার উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন মেগা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। ঢাকা এলিভেটেড রিং রোড, মেট্টো রেল, পদ্মা সেতু রেললাইন সংযোগ, মহেষখালি- মাতারবাড়ি অবকাঠামো ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট, গভীর সমুদ্র বন্দর, রূপপুর পারমাণবিক প্রজেক্টসহ অসংখ্য প্রজেক্ট। এই প্রজেক্টগুলোতে সরকারি ব্যয় সৃষ্টি করবে কর্মসংস্থানের। কৃষি জমিকে উন্নীত করে বছরে একাধিক ফসল উৎপাদনের উপযোগী জমির বিষয়টি নিশ্চিত করতে ও করতে সক্ষম হলে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনে প্রয়োজন পড়বে আরো জনশক্তির। আভ্যন্তরীণ সেবা খাত ক্রমবর্ধমান। এখানেও প্রয়োজন পড়বে জনশক্তির। দক্ষতার কারণে বাংলাদেশে কর্মসংস্থান হচ্ছে বিদেশী শ্রমিকদের। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে ৮৫,৪৮৬ জন বিদেশী কাজ করেন দেশে। গার্মেন্টস খাতে ওয়াশ, স্যাম্পলিং, ওয়ার্কস্টাডি, ডিজাইন খাতে, বিভিন্ন মেগা প্রজেক্টে ও আইটি খাতে পরামর্শক হিসেবে উচ্চ বেতনে কাজ করছেন বিদেশীরা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টার এর ২০১৮ সালের গবেষণায় দেখা যায় দক্ষ জনশক্তি না থাকায়, এই বাংলাদেশ থেকেই বিদেশী দক্ষ শ্রমিকরা নিয়ে যাচ্ছেন ২০০কোটি মার্কিন ডলার। অভিযোগ আছে অনিবন্ধিত অবস্থায় এরচেয়ে বহুগুণ অর্থ বিদেশী শ্রমিকরা নিয়ে যান।
ভবিষ্যত মন্দাগ্রস্ত বিশ্বে দক্ষ জনশক্তি নিয়ে সুযোগ গ্রহণ করতে হবে বাংলাদেশকে। বিদেশে জনশক্তি রফতানি, আভ্যন্তরীণ শিল্প উৎপাদন, সেবা খাত ও কৃষি খাতে বাংলাদেশের ৬৮% কর্মক্ষম জনশক্তিকে দক্ষ করে নিয়োজিত করতে সক্ষম হলে, সংকোচিত বিশ্ব অর্থনীতির মধ্যেও বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে কাংখিত লক্ষ্যে, নির্ধারিত সময়ে না হলেও, কয়েক বছর ব্যবধানে ঠিকই পৌছাতে পারবে।
শিল্প উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি করোনা সংকট ও সংকুচিত চাহিদার কারণ হ্রাস পেলেও, বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে কর্মক্ষম দক্ষ জনশক্তি চাহিদার কমতি হবে না। বাংলাদেশের বিপুল শ্রমশক্তিকে দক্ষ করে কাজে লাগিয়ে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ও এগিয়ে যেতে সকল কৌশল কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে পরিকল্পনা মাফিক পদক্ষেপ নিতে যেন ভুল না হয়। ইতিমধ্যেই ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট’ এর আট বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। উন্নয়নের অন্যতম শর্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। এ সরকার তা অক্ষুন্ন রাখতে সমর্থ হয়েছিল। কাজেই এখন প্রয়োজন উদ্যমী প্রশাসন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে গতিশীলতা এবং উদ্ভাবনী কর্মকৌশল। এ বিষয়ে আস্থা রাখতে হবে সরকারের দেশপ্রেমের উপর। কারণ এ ধারাবাহিক সরকারের হাত ধরে অনেক অর্জন হয়েছে বাংলাদেশের।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম ব্লগপোস্টে পূর্বাভাস করেছিল যে, সবকিছু ঠিকঠাক চললে, ২০২০ সালে এশিয়ায় শীর্ষ প্রবৃদ্ধির দেশ হবে বাংলাদেশ, ভারত হবে দ্বিতীয়। ইউসিবিআর এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লীগ সূচক (ডব্লিউ ইএলটি) অনুযায়ী আকারের দিক থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০১৯ সালে বিশ্বে ছিল ৪১ তম, ২০২৩ সালে হবে ৩৬ তম, ২০৩৩ সালে হবে ২৪ তম। তখন বাংলাদেশের পেছনে থাকবে মালয়েশিয়া, সুইডেন, দক্ষিণ কোরিয়া, সুইজারল্যান্ডের মতো দেশ। বাংলাদেশ এখন ৪৪তম অর্থনীতির দেশ এবং ৩৩ তম ক্রয়ক্ষমতা সম্পন্ন দেশ। সম্ভাবনার কথাগুলো কিন্তু বিভিন্ন ওয়ার্ল্ড ফোরাম ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদগণ করছেন। এতোসব অর্জনের পরও করোনা সংকট ভেস্তে দিতে পারে সবকিছু। আমাদের অর্থনীতির আভ্যন্তরীন দুটি বড় ইভেন্ট পহেলা বৈশাখে কোন উৎপাদন ও বিক্রয় হয়নি, ঈদ মৌসুমও একই ভাবে কোন উৎপাদন ও বিক্রয় না হওয়ার মুখোমুখি। পোল্ট্রি, ফিশারী, ডেইরী, মৌসুমী ফল খাতে উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থাও ভেঙ্গে পড়েছে। রফতানিমূখী শিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশ্বব্যাংক এসকল আশংকা করে বলেছে এ বছর প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশ থেকে ২ থেকে ৩ শতাংশে নেমে আসবে। ২০২১ সালেও প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক ধারা আরো প্রবল হবে।
কাজেই ঘুরে দাড়াতে হলে শ্রমশক্তির বৈশ্বিক বাজার সক্রিয়করণ, শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন, দেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও খাদ্য পণ্য রফতানি, দেশীয় বাজার চাঙ্গা রাখতে সরকারি ক্রয় ও ব্যয় বাড়াতে হবে, বিপণন ও সেবা খাতকে চাঙ্গা রাখতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। তার সাথে বিলাসী পণ্য যেমন ব্যাক্তি পর্যায়ে বিলাসী গাড়ি, বিলাসী পণ্য, অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার্য পণ্য আমদানী নিষিদ্ধ করতে হবে। সরকারি ব্যয়ে সচ্ছতা বজায় রাখতে নজরদারি বৃদ্ধি করতে পারলে সুফল আসবে। আয়কর দিতে সক্ষম ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান যারা এখনো কর বেষ্টনীতে আসেননি, তাদের খুঁজে বের করে আয়কর বেষ্টনি সম্প্রসারণ করতে পারলে রাজস্ব আয় বাড়বে। সর্বোপরি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে আগামী দুই তিন বছর কৃচ্ছতা ও সচ্ছতার ভিতর দিয়ে ব্যয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বেগবান করতে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে পরিবর্তিত স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে থেকেই।