সম্পর্কের বন্ধনগুলো কেন আলগা হয়ে পড়ছে?

ঘাতক রহমত আলীকে কি আমরা ¯্রফে একজন ঘাতক বলব? নাকি সে মানসিক বিকারগ্রস্ত অথবা সংসার জীবনে পরাজিত হতাশাগ্রস্ত একজন মানুষ? এর উত্তর এক এক দৃষ্টিভঙ্গি বা বিশ্লেষণে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। তবে শেষ কথা হলো রহমত আলী পরিকল্পিতভাবে অন্য একজনকে খুন করেছে। খুন করেছে সে জাবেদ আলী নামের এক যুবককে। এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া যায় সে অনুসারে জাবেদ আলীকে নিজ স্ত্রীর প্রেমিক মনে করত রহমত আলী। অন্য পুরুষের সাথে পরকীয়া মেনে নিতে পারে নি সে। ভিতরে ভিতরে প্রচ- প্রতিশোধপরায়ণতা জন্ম নেয় তার মাঝে। এরই ফলস্বরূপ সোমবার বিকালে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বাঘবেড় বাজারের কাছে একা পেয়ে যায় জাবেদ আলীকে। এই সুযোগ গ্রহণ করে সে পৈশাচিক উন্মাদনায়। রড দিয়ে আঘাত করে প্রথমে। এরপর জবাই করে হত্যা করে। হত্যার পর সে আত্মসমর্পন করেছে। পুলিশ তাকে আটক করেছে এবং সে পুলিশের কাছে হত্যাকা-ের ঘটনা কারণসহ স্বীকার করে নিয়েছে। এই স্বীকারোক্তি বিচারিক পর্যায় পর্যন্ত বজায় থাকলে রহমত আলীর বড় ধরনের সাজা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। রহমত আলী স্ত্রীর প্রেমিকাকে হত্যা করে নিজে পালিয়ে বাঁচতে চায় নি। বরং বড় ধরনের সাজা, এমন কি মৃত্যুদ-ও হতে পারে; এরকম আশঙ্কা মাথায় রেখেই সে খুনের স্বীকারোক্তি দিয়েছে। সুতরাং রহমত আলী কর্তৃক জাবেদ আলীকে হত্যা করার ঘটনাটিকে কেবল নিছক একটি সাধারণ খুন বিবেচনা করার অবকাশ নেই। বরং এর ভিতর দিয়ে সামাজিক অবক্ষয় ও অস্থিরতার এক ভয়ংকর চিত্র সকলের সামনে উন্মোচিত হয়ে পড়ে যা আমাদের কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়।
আজ কেন জানি সম্পর্কের বন্ধনগুলো আলগা হয়ে পড়ছে। বাবা-সন্তান, মা-সন্তান, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-ভাই, ভাই-বোন এমন অচ্ছেদ্য সম্পর্কগুলোও আজ আর শক্ত সুতোয় বাঁধা নেই। সন্তান কর্তৃক বাবা কিংবা মাকে হত্যা, স্বামী কর্তৃক স্ত্রী কিংবা স্ত্রী কর্তৃক স্বামী হত্যার খবর এখন প্রায়শই শোনা যায়। এসব হত্যাকা-ের পিছনে ক্রিয়াশীল থাকতে দেখি নানাবিধ সামাজিক-অর্থনৈতিক-জৈবিক ঘাত-প্রতিঘাত। অথচ পবিত্র এই সম্পর্কগুলো অনেক বেশি পবিত্রতার বন্ধনে বাঁধা থাকার কথা। কোন রকমের অনৈতিক সংশ্রব এসব সম্পর্কে চিন্তাতীত বিষয়। অথচ কী আশ্চর্য! স্বামী থাকতেও এক নারী পরকীয়ায় মত্ত হচ্ছে। কোন মা সন্তানের বন্ধন ছিন্ন করে পরিবার ছেড়ে ঢুকে যাচ্ছে আরেক পরিবারে। কেন আলগা হয়ে যাচ্ছে আমাদের এই সম্পর্কগুলো? সমাজবিজ্ঞানী বা মনোবিজ্ঞানীরা ভাল বলতে পারবেন এর কারণ। তবে মোটা দাগে আমরা বলতে পারি, মানুষ পরিবার বা সমাজ গঠন করেছিলই সর্বোচ্চ শান্তিপূর্ণ জীবন ধারণের আশা থেকে। সে আশা গুড়েবালি হয়ে সমাজের সর্বত্র আজ যে অস্থিরতা সেখানে কেউই পরিবারে বা সমাজে অথবা রাষ্ট্রে একান্তভাবে থিতু হতে পারছেন না। নানা সংকট তার পিছু ছুটছে। এইসব সংকট কখনও কখনও মানুষকে করে তুলছে জঘন্য ধরনের অপরাধীতে কখনও বা জিঘাংসাপ্রবণ খুনীতে।
ঘাতক রহমত আলীর প্রচলিত আইনে আমরা কঠোর শাস্তি দাবি করি। একই সাথে সমাজ নিয়ন্ত্রকদের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে, এই যে সামাজিক অস্থিরতা সেখান থেকে আমাদের মুক্তি দিন। মানুষ বাঁচতে চায় সম্পর্কগুলোকে আঁকড়ে ধরেই। সম্পর্কগুলো যখন বিশ্বাসভঙ্গের কারণ হয়, স্বার্থতাড়িত হয়ে হিং¯্র স্বভাব ধারণ করে; তখনও যদি সকলে নিশ্চুপ থাকেন তাহলে হনুমানের লেজের আগুন পুরো লঙ্কাই পুড়িয়ে মারবে।