সময়মত পিআইসি গঠনে ব্যর্থতা, গণমুখী প্রশাসনের গণমুখী ব্যবস্থাপনা কাম্য

কোনো কাজ নির্ধারিত সময়ে শুরু ও শেষ না করার ফলে ওই কাজটি পরে তাড়াহুড়ো করে শেষ করার বাস্তবতা তৈরি হয়। এবং এই তাড়াহুড়ো করতে যেয়ে কাজের অবস্থা ভজকট হতে বাধ্য। একসময় আমরা দেখতাম জুন মাসে সরকারি কাজ শেষ করার হিড়িক পড়ে যেত। যেনতেন প্রকারে কাজ করে বা না করে অর্থবছর অতিক্রান্ত হওয়ার আগে বিল তুলে নেয়াই ছিল মুখ্য। সরকারকা মাল দরিয়ামে ঢাল প্রবচনটির উদ্ভব ঘটেছিল এরকম প্রেক্ষাপট থেকে। এখনও যে সরকারি কাজে স্বচ্ছতা ফিরে এসেছে তা বলা যাবে না। বরং ছোট-মাঝারি ও বড় আকারের দুর্নীতির খবর মাঝে মধ্যেই প্রকাশ হয়ে সকলের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে সরকারি অর্থ নিয়ে অনর্থ করতে কোন দোষ নেই। কিন্তু যে সরকারি কাজগুলো অধিক সংখ্যক মানুষের প্রয়োজনের সাথে সম্পর্কিত সেই কাজে যেকোনো ধরনের বিলম্ব কিংবা কালক্ষেপণ নিশ্চিতভাবেই অধিকতর দুশ্চিন্তার। হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে এরকম দুশ্চিন্তার কা- ঘটা শুরু হয়েছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, বোরো ফসল রক্ষার জন্য যে বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কার করা হবে সেগুলোর প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠনের সর্বশেষ তারিখ ছিল ৩০ নভেম্বর। কিন্তু ওই তারিখের মধ্যে কিংবা এর পর আরও চার দিন গত হলেও, ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত জেলার কোনো উপজেলায়ই পিআইসি গঠনের কাজ শুরু হয়নি। প্রণিধানযোগ্য বিষয় হল, ৩০ নভেম্বর ছিল পিআইসি গঠনের শেষ তারিখ। কিন্তু ওই তারিখের মধ্যে পিআইসি’র কাজই শুরু হয়নি। এরকম অবস্থাকে কী বলা যেতে পারে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে বলার চেষ্টা করা হচ্ছে, হাওরের পানি না নামার কারণে প্রাক-জরিপ, সম্ভাব্যতা যাচাই ও প্রাক্কলন তৈরি করার কাজ শেষ করা যাচ্ছে না। তাই পিআইসি গঠনে বিলম্ব হচ্ছে। প্রদর্শিত কারণের মধ্যে যুক্তি আছে। কিন্তু এমন বাস্তবতাও পিআইসি গঠনের কাজ শুরু না করার একমাত্র কারণ হতে পারে না। শতভাগ না হোক একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কাজ শেষ করা গেলেও বরং বিষয়টি অনেক মানানসই হত।
প্রকাশিত ওই সংবাদে এক কৃষক সখেদে বলেছেন, ‘এক রাতেই পিআইসি গঠন করতে পারবেন সংশ্লিষ্টরা। আগের পিআইসিতে যেসব কৃষকের নাম আছে তাদের দিয়েই তো পিআইসি হবে।’ এই কৃষকের খেদ তার অভিজ্ঞতাপ্রসূত। তিনি দেখেছেন আগের বছরে পিআইসিতে অন্তর্ভূক্ত হতে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, স্বজনপ্রীতি, প্রভাব-প্রতিপত্তির জোর, জনপ্রতিনিধিদের চাপ ইত্যাদি প্রভাবক ভূমিকা রেখেছে। পিআইসি ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর একেই অনেকে লুটপাটের আখড়া বানাতে তৎপর ছিলেন। কিন্তু প্রশাসন শক্ত থাকায় এই জায়গায় গণদুর্নীতির সুযোগ পাওয়া যায় নি। তবে অনেকটাই হয়েছে, অন্তত ওই সময়ের কিছু সংবাদ পাঠ করলে এরকমই মনে হয়। সবার কথা ছিল গণশুনানীর মাধ্যমে বাঁধ এলাকার প্রকৃত কৃষকদের নিয়ে পিআইসি গঠনের। এখানে পিআইসিগুলোর আর্থিক সক্ষতার একটি বিষয় রয়েছে। যে জায়গায় প্রকৃত কৃষকরা দুর্বল। এই দুর্বলতার সুযোগেই ঢুকে যায় মধ্যসত্বভোগী টাউট-বাটপাররা। সরকারকে চিন্তা করতে হবে, পিআইসিগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে। আর্থিকভাবে দুর্বল কৃষকরা যাতে প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থের জন্য অন্যের মুখাপেক্ষী না হয় সেই ব্যবস্থা করে দিতে হবে সরকারকেই। নতুবা একটি গণমুখী ব্যবস্থা শুধু এই আর্থিক সক্ষমতার কারণেই একসময় অকার্যকর হিসাবে সামনে উঠে আসবে।
এবার ৬৯০ টি পিআইসি’র মাধ্যমে ৪৮টি বড় হাওরের প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার বাঁধের কাজ হবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে গণমুখী প্রশাসনের গণমুখী ব্যবস্থাপনা আশা করেন হাওরপাড়ের কয়েক লক্ষ কৃষক। আমরা চাই প্রচলিত পিআইসি ব্যবস্থাটি একটি আদর্শ ব্যবস্থা হিসাবে দৃষ্টান্ত তৈরি করুক।