সময়মত সঠিক পদক্ষেপ নিলে ফসল রক্ষা সম্ভব

রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু
“সময় গেলে সাধন হবে না, দিন থাকিতে দিনের সাধন কেন করলে না” সাধক ফকির লালন সাঁই এর গানের লাইনটি উদ্ধৃত করে বলতে চাই সময়মত সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়া গেলে হাওর অঞ্চলের বোরো ফসল রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলে ৭ টি জেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী মোট ৪১৪ টি হাওর হলেও হাওর উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী দেশে মোট ৩৭৩ টি হাওর আছে। এতে জমির পরিমান ৮ লক্ষ ৫৮ হাজার ৪৬০ হেক্টর।
হাওরাঞ্চলের কৃষকরা সেপ্টেম্বর মাসের শেষ থেকেই বোরো চাষের জন্য কাজ শুরু করে দেন। আগাছা দূর করা চারা বপন চাষের কাজ তখন থেকেই শুরু হয়ে যায়। চারা রূপন শেষ হয়ে যায় পৌষ মাস বা তার আরও কিছু পরে। অর্থাৎ তখন ইংরেজি মাসের ডিসেম্বর বা জানুয়ারীর প্রথম দিক। এরপর থেকে কৃষকদের নিড়ানী, সেচ ও সার প্রয়োগ করে যতœ নেওয়ার কাজ। ঘরে ফসল তোলা পর্যন্ত অপেক্ষা করে থাকতে হয় এপ্রিল মাস বা মে মাস পর্যন্ত। কৃষকরা ফসল ফলিয়েও নিশ্চিন্ত হয়ে ঘরে বসে থাকতে পারেন না। মেঘালয়ের পাহাড়ী ঢল ও বরাক অঞ্চলের অধিক বৃষ্টির ফলে নেমে আসা ঢলের কারণে লক্ষ লক্ষ হেক্টর ভাটি এলাকার বোরো জমির ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুকি নিয়েই ফসল ফলান কৃষকরা। দেখা গেছে ৩-৪ বছর পর পর পাহাড়ী ঢল এসে অকাল বন্যায় বোরো ফসল নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু প্রকৃতির এ নিয়মের কোন নিশ্চয়তা দেখা যায় না। কাজেই ফসল রক্ষা বাঁধ ছাড়া রক্ষা নাই। বৃষ্টি শুরু হয় মার্চ মাসের শেষে বা এপ্রিল মাসের প্রথম দিক থেকে। এবছর প্রথম ঢল এসে আঘাত হানে ২ রা এপ্রিল তারিপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরে। তলিয়ে যায় প্রায় ১২০০ হেক্টর কাঁচা ধান। এরপর ৪ এপ্রিল ছাতক ও শাল্লায় ছোট ছোট হাওর তলিয়ে যায়। ৫ এপ্রিল আরও ছোট ছোট হাওর সহ ধর্মপাশার চন্দ্র সোনার থালার হাওরে প্রায় ২০০০ হেক্টর জমির ফসল ও সোনামড়ল হাওরের ফসল তলিয়ে যায়। ০৬ এপ্রিল শাল্লার নদীর পানি উপচে গোব্বরহরি ও দিরাই উপজেলার চাপতির হাওরের ৫ হাজার হেক্টর জমি তলিয়ে যায়। এরপর ৮ এপ্রিল তারিপুরে ফল্লিয়ার হাওর ও মধ্যনগরের মুক্তারখলা তলিয়ে যায়। ১৭ এপ্রিল গুরমার হাওরের ২০০০ হেক্টর ও দিরাইয়ের হুরমন্দিরার বাঁধ ভেঙ্গে ১২০০ হেক্টর, শান্তিগঞ্জ উপজেলার ছোটছোট হাওরের জমির ধান, জগন্নাথপুরে গলাকাটা হাওর, শেওরারবন হাওরের ধান তলিয়ে যায়। ২০ এপ্রিল থেকে মধ্যনগর, জগন্নাথপুর, ছাতক, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, জামালগঞ্জের প্রায় ৩০০০ হেক্টর জমির অধিক ধান তলিয়ে যায়। হাওর বাচাঁও আন্দোলন রিপোর্ট করেছে এবছর ছোটবড় ৩১টি হাওরের। প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে।
হাওর এলাকার বোরো ফসল রক্ষার জন্য সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে বাঁধ নির্মাণের জন্য ব্যয় করেন। বাঁধ নির্মাণের জন্য মূলত দায়ীত্বে থাকেন পাউবো কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় সরকারী প্রশাসনও তদারকি করেন। ২০১৭ সালের পর থেকে পিআইসি এর মাধ্যমে বাঁধের প্রকল্পগুলি কাজ করে আসছে। বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার কথা ২৮ শে ফেব্রুয়ারী। কিন্তু মেয়াদ বাড়িয়ে মার্চ মাসেও কাজ শেষ হয় নি। এবছর সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে ৭২৭ টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এসব প্রকল্পের জন্য ১২১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। নিয়ম হলো গণ শুনানীর মাধ্যমে স্থানীয় হাওরবাসীর স্থায়ী বাসিন্দা ও জমির মালিক বা স্বার্থভোগীদের মাধ্যমে পিআইসি গঠন করা। কিন্তু দেখা গেল, সে নিয়ম রক্ষা না করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রকল্পগুলোর কাজ করানো হয়েছে। এবছর সময়মত প্রকল্প তৈরি, পিআইসি গঠন করা হয় নি। ১৫ ডিসেম্বর ১৮টি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ঐদিন পর্যন্ত ২৪৭ টি প্রকল্পের অনুমোদন ছিলো। এর একমাস পর ১৫ ই জানুয়ারী প্রকল্পের অনুমোদনের সংখ্যা দাড়ায় ৭০১ টি। তখন কাজ শুরু হয়েছিল ১৮৩ টি প্রকল্পের। বাকী ৫০১ টি প্রকল্পের কাজ শুরুই হয় নি। তখনো ৩৩টি পিআইসি গঠনই করা হয় নি। এরপর সংখ্যা বেড়ে দাড়ায় ৭২৭ টি। কাজেই যেখানে পিআইসি গঠনের উদ্যোগই নেওয়া হয়নি বা অনুমোদিতই হয় নি এবং কাজ শুরু করতেই গাফিলতি স্পষ্ঠ। সেখানে কাজ শেষ হওয়ার প্রশ্নই উঠে না। পরে তারাহুরো করে দূর্বল কাজ শুরু হলে তা ঢলের পানির প্রথম ধাক্কা সামলাতে পারে নাই। সময়মতো কাজ না করা, দূর্বল কাজ করা, তদারকী কম হওয়ায় বাঁধ টেকসই হয় নি। এই কাজের অনিয়ম, গাফিলতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দফায় দফায় হাওর বাচাঁও আন্দোলনের কর্মীরা স্থানীয় প্রশাসনকে জানিয়েও কোন কাজ হয় নি। হাওর পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় কৃষি বিভাগ ও উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা গায়েবি তথ্য দিচ্ছেন। ছায়ার হাওরের ৫০ ভাগ কাটা হলেও কৃষি বিভাগ বলছে ৯৫ ভাগ। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলছেন ৯৮ ভাগ ফসল কাটা হয়ে গেছে।
৫ এপ্রিল সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার ড. মোঃ মোশারফ হোসেন তাহিরপুর শান্তিগঞ্জ ও জগন্নাথপুরের বিভিন্ন হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ পরিদর্শন করেন। ২০ এপ্রিল পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক ক্ষতিগ্রস্থ বাঁধ ও তলিয়ে যাওয়া ফসল দেখতে সফর করেন। এবং বাঁধের দুর্নীতির বিচারের প্রতিশ্রুতি দেন। ২১ এপ্রিল ফসল রক্ষা বাঁধ পরিদর্শন শেষে ২ টি নতুন প্রকল্পের ঘোষনা দেন। ১৪ টি নদী খনন করা হবে ও ৯০ টি কজওয়ে নির্মান করা হবে। তিনি বলেন সাংবাদিকেরা যদি ফুলিয়ে ফাপিয়ে রিপোর্টিং না করেন তাহলে ধান-চালের দাম বাড়বে না। খাদ্য সচীব ড. নাজমানারা খানম বলেন হাওরে ধান ক্ষতির জন্য চালের দামে কোন প্রভাব পড়বে না। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে প্রণোদনাসহ অন্যান্য সহায়তা দেয়া হবে ভয়ের কিছু নাই। বাংলাদেশের কৃষি হচ্ছে প্রকৃতির জোয়া খেলা। কৃষি সচিব সাইদুল ইসলাম বলেন খাদ্যের চাহিদা ও যোগানের সাথে তেমন কোন নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।
মন্ত্রী মহোদয় ও সচিব মহোদয়দের এসব আশ্বাসবানী যাদের ফসল নষ্ট হয়েছে তাদের তো পেট ভরবে না। তারা হারে হারে টের পাবে তাদের কষ্ট কি জিনিস। যারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেছে তাদের পৌষ মাস হলেও যেসব কৃষক মোটামুটি চলতে পারত সে জমি হারাবে, ঋণ করবে, নিস্ব হবে। তার সর্বনাশ ছাড়া তো আর কিছু নয়। দুর্নীতিবাজদের কারণে বছর বছর অনেক কষ্টে রোপন করা হাওরবাসীর সোনালী ফসল তলিয়ে যায় বানের জলে। ধীরে ধীরে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো নি¤œবিত্ত থেকে বিত্তহীন হয়ে পড়ে। সমাজে তার বাঁচার লড়াই এর সংগ্রামে টিকে থাকার চেষ্টা করবে। বাঁধ ভেঙ্গে ফসল নষ্ট হওয়া মানে কৃষকের শিশু সন্তানদের ভবিষ্যৎ লেখাপড়া শেষ, মেয়েদের বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি, ঋণের বোঝা মাথায় নেয়া, জমি হারানো। মন্ত্রী মহোদয় ও সচিবরা যদি শুরু থেকেই খোঁজ-খবর নিতেন, সামান্য দৃষ্টি দিতেন তাহলে বাঁধ ভাঙ্গার পর দেখতে আসার প্রয়োজন পরত না। মন্ত্রীমহোদয় যে আশ্বার দিয়েছেন চলতি বছরের শেষ দিকে প্রকল্প দুটির কাজ শুরু হতে পারে, এটা অত্যন্ত আশার কথা। কিন্তু বাস্তবে কতটুকু সম্ভব তাও একটি বিষয়। কারণ সমীক্ষা রিপোর্ট ও এক নেকে পাশ হলে তবে কাজ শুরু হতে পারে। তাছাড়া ইতিপূর্বে নদী খননের তৈলচুরি ও দুর্নীতির ফলে কতটুকু নদী খননের কাজ সফল হয়েছে তাও জানা বিষয় আছে।
লিখার শুরুতেই উল্লেখ করেছি সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিলে ফসল রক্ষা করা সম্ভব। কারণ তার জন্য চাই উপর থেকে নিচ পর্যন্ত আন্তরিকভাবে কাজের তদারকি করা। হাওরগুলোতে পানি না কমলেও সৎ মানুষজনকে নিয়ে পিআইসি গঠন করা। এর জন্য স্থানীয় শিক্ষক ও অন্যান্য ব্যক্তিবর্গদেরে সম্পৃক্ত করা। প্রকল্প ও পিআইসির কাজটি অবশ্যই শেষ করতে হবে অক্টোবর-নভেম্বর মাসের মধ্যে। এ ব্যাপারে পিআইসির তালিকা প্রস্তুত করে প্রতিটি ইউনিয়ন ও উপজেলা অফিসের দৃশ্যমান স্থানে টাঙ্গিয়ে দিতে হবে। এতে কারো কোন অভিযোগ আছে কি না তাও যাচাই করা যাবে। ডিসেম্বর মাস থেকে যেকোন প্রকারেই হোক কাজ শুরু করে ফেব্রুয়ারী মাসের ২৮ তারিখের মধ্যে বাধের কাজ শেষ করতে হবে। মার্চ মাস থেকে মাটি বসানোর ও ঘাস লাগাতে হবে। যেসব স্থানে বাঁধ ভাঙ্গার আশঙ্কা থাকে সেসব স্থানে কাজ শুরু করার সময় থেকে বাঁশের আঁড় দিয়েই মাটি ফেলতে হবে। কোন অবস্থায়ই পুরনো বাঁধ মেরামত দেখিয়ে বাঁধের কাজ সম্পন্ন দেখানো যাবে না। সবচেয়ে বড় কাজ হলো নদী খনন করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা, চাষের আগেই হাওর থেকে পানি নেমে গেলে ধান রোপন করাও যাবে। আর নদী খনন করা গেলে ঢলের পানিও দ্রুত নেমে যায়। এর জন্য জরুরী ভিত্তিতে যেসব স্থানে নদীর পানি নিষ্কাশনে বাঁধা তা দূর করতে হবে। সুরমা, কুশিয়ারাসহ মেঘনা নদীর যেসব স্থানে পলি পড়েছে তা দূর করতে হবে। কোন অবস্থায়ই ডোবা সড়ক নির্মাণ করা যাবে না। নদীর নাব্যতা না বাড়ালে শুধু বাঁধ দিয়ে ফসলরক্ষা করা যাবে না। যেসব স্থানে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে সেগুলি পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে।
সরকার বছর বছর কোটি কোটি টাকা ফসলরক্ষা বাঁধের জন্য ব্যয় করেও যদি ফসল রক্ষাই হলো না তাহলে এই টাকার অপচয় করে লাভ কি? এই টাকা জনগণের টাকা। ঘুরে ফিরে জনগণের করের টাকারই অপচয়। ফসল তলিয়ে গেলে দেশের উৎপাদন কমবে, চালের দাম বাড়বে, এর কষ্ট ভোগ করতে হবে জনগণকেই। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চাই দেশ প্রেম নিয়ে ব্যবস্থাপকদের স্ব স্ব দায়িত্ব সঠিক সময়ে ও সততা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া। চাই সঠিক সময়ে সঠিক উদ্যোগের মানুষিকতা। সবশেষে বলতে চাই মন্ত্রী মহোদয়ের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এবছর যারা ফসলের ক্ষতির জন্য দায়ী তাদের অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে।
লেখক: রাজনীতিক