সময়ে হাওয়া বদল

রাজিব বাসিত
সময়ের সাথে যুগের সাথে অনেক কিছুতেই পরিবর্তন এসেছে এই হাওরের শহরে, জোছনার শহরে, কবিতা-সংস্কৃতিক শহরে ।
মনে হয় এইতো সেদিন স্কুল, বাসা, প্রাইভেট টিউটর, হুজুরের কাছে আরবী পড়া রুটিন ছিল আমার। পড়াশুনোয় মনযোগী না হলে স্কুল থেকে স্যারদের বিচার আসতো বাসায়। স্কুল প্রাইভেট স্যারের পড়া মুখস্থ, হুজুরের বেতের কষাঘাত মনে পড়ে খুব। স্কুলে যখন যেতাম রাস্তার দুইপাশে কি হচ্ছে না হচ্ছে দেখে দেখে স্কুলে পৌঁছাতাম। আবার একি ভাবে বাসায় ফিরতাম। কোথাও মুরগীর লড়াই দেখলে থেমে যেতাম। কেউ পাশের ডুবা থেকে মাছ ধরছে তা দেখতাম। তারপর তো আছে রাস্তায় একপাশে ভিড়ের মধ্যে সাপ গরুর হাড্ডি-গুড্ডি দিয়ে যাদু দেখানো, সাপের খেলা, দাতের পোকা বের করা ইত্যাদি। বিভিন্ন বাসার কাঁচা আম, লিচু, পেয়ারা ইত্যাদি পেড়ে খাওয়া। তখন প্রধান বাহন হিসাবে রিক্সা, সাইকেলই ছিল। মোটর সাইকেল, গাড়ি হাতে গোণা কয়েক জনের ছিল। সরকারি গাড়ি মাঝে মাঝে দেখা যেত। এখন বাচ্চারা ননীর পুতুলের মত স্কুলে যায় আর আসে। তার চারপাশে কি হচ্ছে না হচ্ছে কোন খেয়াল নেই। আমাদের মতো ডানপিটে জীবন দেখার সুযোগ তাদের নেই। পারলে সন্তানের লেখা পড়া পিতা মাতাই মুখস্থ করে পরীক্ষা দেয়ার অবস্থা। বাচ্চাদের উপর অতিরিক্ত পড়াশুনার চাপ তাদের বাস্তবিক জীবনের মানসিক বিকাশ হতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাসা থেকে বের হলে সবাই সবাইকে চিনতেন।কুশলাদি বিনিময় করতেন। কে কি করছেন। কার কয়জন ছেলে মেয়ে। মোট কথা সবাই সবার হাড়ির খবর জানতেন। শহরের সবাই ছিলেন এক পরিবারের মতো। হিন্দু-মুসলিম কোন ভেদাভেদ ছিল না। সবার ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সৌহার্দ্যপূর্ণ স¤প্রীতি ছিল। একজন আরেকজনের বিপদে পাশে এসে দাঁড়াতেন। এখন পাশের বাড়ির মানুষই কেউ কাউকে চিনে না। প্রতোকটি বাড়ির সামনে খালি জায়গা ছিল। এখন ভরাট হয়ে সারি সারি মার্কেট, অট্টালিকা তৈরি হয়েছে। কার বাড়ি কোনটা চেনাই মুশকিল।
সংস্কৃতি চর্চা ছিল ঘরে ঘরে। সবার বাড়িতেই প্রায় তবলা হারমোনিয়াম ইত্যাদি কিছু না কিছু থাকতো। বিডি হল বর্তমানে আবুল হোসেন মিলনায়তন, আর্ট কাউন্সিল, পাড়ায় পাড়ায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত। উঠতি তরুণ তরুণীরা কবিতা চর্চা, নাটক মঞ্চায়ন ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। শুধু যে লোকাল শিল্পীরাই করতেন তা না। ঢাকার বেইলি রোডের নাট্যমঞ্চ থেকে শুরু করে টিভি রেডিওর শিল্পীরাও এসে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন।
ছাত্র রাজনীতি যারা করতেন তারা শুধু রাজনীতিই করতেন না। তাদের মাঝে ছিল সংস্কৃতি চর্চা। কেউ না কেউ কবিতা, নাটক, গান ইত্যাদির সাথে জড়িত থাকতেন। রাজনীতিতে বিভিন্ন মতাবলম্বী হয়েও সবার মাঝে ছিল আন্তরিকতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক। লেনিন, স্টালিন, কার্ল মার্ক্স, চে গুয়েভারা, ফিদেল ক্যস্ট্রো, দস্তয়ভস্কি, ম্যাক্সিম গোর্কি তাদের নিয়ে রাজনীতি,দর্শন, শিল্প সাহিত্যর আলাপ আলোচনা ও তর্ক বিতর্ক চলত। সিনিয়র জুনিয়রদের মধ্যে সব সময় সম্মান-স্নেহের সম্পর্ক বিরাজ করতো । পদ, কমিটি নিয়ে কেউ মাথা ঘামাতো না । টেন্ডার, জমি-বিল দখল, চাঁদাবাজি, মোটর বাইকের মহড়া এসব কখনো ছাত্র রাজনীতিতে ছিল না তারা এসব জানতো না বা চিনতো না।
জন প্রতিনিধিদের দেখেছি সাধারণ জীবন যাপন করতে। তারা হেঁটে, রিক্সায়, পাবলিক বাসে চলাচল করতেন। অনেকের হয়তো ব্যাংক একাউন্টই ছিল না। গ্রামের বাড়ি থেকে নিজের চাষাবাদের ধান চাল বিক্রি করে সংসার চালাতেন। নিরঅহংকারী হয়ে সততার সাথে পরিবার পরিজন নিয়ে জীবন যাপন করে গেছেন।
খেলাধুলায় কোনভাবেই পিছিয়ে ছিল না। বিশেষ করে ফুটবল ক্রিকেটে। প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় ফুটবল ক্রিকেট টিম ছিল। প্রতি বছর সময় মত বিভিন্ন লীগ বা অন্য জেলার সাথে প্রতিযোগিতা হত। অনেকেই ঢাকার বিভিন্ন বড় বড় দলে খেলতেন। যা ছিল আমাদের জন্যে গর্ব এবং সুনামের। অনেক জাতীয় দলের খেলোয়াড়রাও এই শহরে খেলে গেছেন। এখন তো লীগ টুর্নামেন্ট এসব প্রায় বিলুপ্তির পথে।
শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে গেলেও ইতিবাচক নেতিবাচক দুই ভাবেই প্রভাব বিস্তার করেছে। ইতিবাচক দিক অনেকেই উচ্চ শিক্ষিত হচ্ছেন। ভালো কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছেন। কেউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আমলা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রফেশনে জড়িত হচ্ছেন। নেতিবাচক দিক হলো তারা কাজের সুবিধার্থে বা পড়াশুনার জন্য সিলেট, ঢাকা বা বিদেশে চলে যাচ্ছেন। ফলে শহর খালি হয়ে যাচ্ছে। লোকজন না থাকায় প্রায় বাসা বাড়ি দেখতে ভুতুড়ে মনে হয়। মনে হয় অনেকেই শহর ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন। পুরানো মুখগুলি আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে। মনে মনে ভাবি ঃ

রাস্তার দুপাশে নেই পরিচিত মুখ,
চৌরাস্তার গলিতে দাঁড়ানো থাকে অনেক লোক।
মানুষের ভিড় বাড়ছে,
যানজট লম্বা হচ্ছে।
আগের মত কাছে এসে,
কেউ জিজ্জেস করে না,
কেমন আছো?
কবে আসছো?
পরিচিত শহরে যেন আমি অচেনা।
এখন দেশে গেলে যে দিকে তাকাই দেখি সব অপরিচিত। তারা হয়তো আমাকে দেখেও ভাবে এই অপরিচিত কোথায় থেকে আসল। নিজের জন্ম শহরে নিজেকেই নিজের মুসাফির মনে হয়।
এই শহরে এক সময় পূর্নিমার আলোতে জনগণ রাতে রাস্তা খুঁজে পেতো। তখন শহরের রাস্তার সব বাতিগুলো নিভিয়ে দেয়া হতো। ভরা জোছনায় কবি, লেখকরা কলম চালিয়ে যেতেন অনায়াসে। বিশ্বাস হচ্ছে না এখন এই শহরেই চলছে নৈরাজ্য, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অস্ত্রের ঝন-ঝনানি। আজ কিছু সংখ্যক মানুষের জন্য সুনামগঞ্জের সুনাম বিলীন হওয়ার পথে।
লেখক: প্রবাসী।