‘সময় গেলে সাধন হবে না’

ইকবাল কাগজী
‘সময় গেলে সাধন হবে না’ বিখ্যাত একটা গানের কলি। লিখেছিলেন জাতপাতধর্মবর্ণগোত্র না মানা মতবাদী বাউলগুরু লালন ফকির। জাতপাতে পাত্তা দিতেন না তাই ছিলেন মানবতাবাদী। জন্ম ১৭৭২ সালে, মৃত্যু ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর। ১১৬ বছরের দীর্ঘ জীবনকালের বিবেচনায় ‘সময় গেলে সাধন হবে না’ এই তত্ত্বকথাটির প্রাচীনত্ব একশত ত্রিশ বছরের কম তো নয়ই, বরং বেশি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ‘সাধন’ শব্দটির অর্থদ্যোতনা পরস্পর দুই বিপ্রতীপ পার্থিব ও অপার্থিবতার দিকে বিস্তৃত। পার্থিবতাকে উপজীব্য করা ‘সাধন’ শব্দের অর্থ : সম্পাদন, সিদ্ধি ও সাফল্য ইত্যাদি। জীবনব্যাপী মানুষের সাধনা আসলে কাজের সাধনা। কাজ মানে মানুষের হাতের কেরদারিসমা (কেরদানি+ক্যারিসমা)। হাতের কেরদারিসমার বদৌলতেই মানুষ কাজের কাজী হয়ে পশুত্বের নিগড়মুক্তি অর্জন করে মানবত্ব লাভ করেছে এবং এমনকি মধ্য বিশশতকের মধ্যকালের আগেপরে অ্যাটম ও হাইড্রোজেন বোমা বানিয়ে দানবিকতার চূড়ান্তে আরোহণ করেছে। ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই নিউ মেক্সিকোর আলামোগার্ডোর মরুভূমিতে ভোর ৫টা বেজে ২৯ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে প্রথম অ্যাটম বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ প্রত্যক্ষ করে পদার্থবিজ্ঞানী কেনেথ বেইনব্রিজ ছোট্ট মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমরা সবাই এখন কুত্তার বাচ্চা।’ আমেরিকা অ্যাটমের জোরে পৃথিবীর প্রভু হওয়ার বাসনা পূর্ণ করেছিল হিরোশিমা আর নাগাসাকি ধ্বংস করে দিয়ে । প্রভুত্ব ঐতিহাসিক নিয়মেই অমানবিতকার জনক। সে-বিত্তান্ত জাহির করার এখানে কোনও অবকাশ নেই। এখানে মানুষের রাজনীতিক, আর্থনীতিক ও সামাজিক সাধনের (সাফল্যের) বিত্তান্তকে প্রাধান্য দিয়ে বাংলাদেশর বাঙালিদের পশ্চাৎপদতাকে পছন্দের প্রসঙ্গটি উপস্থিত করাই আপাতত এই অধম প্রাবন্ধিকের মুখ্য সাধনা। পশ্চাৎপদতাও এক ধরণের অনুশীলন, এও এক ধরনের সাধনা, এই সাধনাটিও মানুষই করে থাকে, যে-আনুশীলন ও যে-সাধনা প্রকৃতপ্রস্তাবে মানুষকে অনিবার্যভাবে মানবত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিরন্তর। মানব সভ্যতার পশ্চাদপদতার সবচেয়ে বড় সাধনা করা হয়েছে আমেরিকার ম্যানহাট প্রজেক্টে বসে অ্যাটম বোমা বানানোর কার্যক্রমকে সফল করে। এই সাধনাটিও মানুষই করেছে, বিজ্ঞানী ও রাজনীতিবিদ মিলে। আর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ৩০ লক্ষ বাঙালির প্রাণসংহারের সাধনাটিও করেছে পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিক ও সেনানায়কেরা এবং এ দেশে তাদের দালাল স্বল্পসংখ্যাক রাজাকার মিলে, তারাও সকলে মানুষই ছিল। এই দালালরা ছিল বাঙালি নৃগোষ্ঠীরই একাংশ, ৩০ লক্ষ মানুষের গণহত্যাযজ্ঞটি তাদেরই করা সাধনকর্মের একটি, যা বাঙালি নৃগোষ্ঠীর অনেক সাধনকর্মের অঙ্গীভূত একটি ঐতিহাসিক কূটপ্রপঞ্চ, মোটা দাগে যাকে চিহ্নিত করা যায়, বাঙালির পশ্চাৎপদতা হিসেবে। বাঙালির প্রগতিবিরোধী এই যাত্রা বাঙালিকে বার বার পিছিয়ে দিয়েছে এবং প্রকারান্তরে বাঙালি নৃগোষ্ঠী জাতিসত্তার আত্মপরিচয়ের অন্ধকারে নিমজ্জিত থেকেছে যুগের পর যুগ। তারা বাঙালি থেকে মুসলমান হয়ে মুসলমান বাঙালি হয়েছে, মুসলমান বাঙালি থেকে পাকিস্তানি হয়েছে, পাকিস্তানি থেকে বাংলাদেশী হয়েছে, এখন বালাদেশী থেকে মুসলমান হতে চাইছে। পশ্চাৎপদতার এই ঐতিহাসিক গোলকধাঁধায় কপাট খোলার একটিই চাবিকাঠি, তার নাম পুঁজিবাদ। দুই দুইটি বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিরোসিমা-নাগাসাকির নির্মম ধ্বংসযজ্ঞ, উপসাগরীয় যুদ্ধ, সাত দশকাধিক সময়ব্যাপী চলমান ফিলিস্তিন দখলধর্ষণ কিংবা বাংলাদেশের ৭১-য়ের হত্যাযজ্ঞ সব কীছুর উৎসমূল একটাই পুঁজিবাদ। এই পুঁজিবাদের দুষ্টচিন্তা বাঙালিকে ছাড়ে না, বাঙালি বার বার লাভের লোভের ফাঁদে পড়ে নিজের চিত্তকে কলুষিত করে এবং প্রকারান্তরে সুনামগঞ্জের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নামফলক মুছে দেওয়ার অপচেষ্টায় প্রবৃত্ত হয়ে নিজের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে বেজন্মা হয়ে উঠে। প্রকৃতপক্ষে কোনও মানুষই বেজন্মা হয়ে জন্ম নেয় না, কারও পিতৃপরিচয় না থাকতে পারে, তাই বলে সে জারজ হয় না। মানুষ তখনই জারজ হয় যখন জাত্যাভিমানকে পরিহার করে। জাত্যাভিমান পরিহার করার অর্থই হলো নিজেকে নিজে অপমান করা। বাঙালির স্বাধীনতাযুদ্ধ থেকে যেজন সরে থাকে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে যেজন অস্বীকার করে, যেজন স্বাধীনতার বিরোধিতা করে, এমনকি একাত্তরোত্তর প্রজন্মের যেজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী সে-ই কেবল নিজেকে নিজে জারজ করে তোলে, অন্য কেউ নয়। প্রকৃতপ্রস্তাবে এর বাইরে জারজ শব্দের অন্য কোনও অর্থদ্যোতনা নেই।
মুনাফামুখি পুঁজিবাদের পাকেচক্রে পড়ে বাঙালির জাতের নামে বজ্জাতির সাধনপ্রকরণটি হয়ে উঠেছে একটি ঐতিহাসিক ঘটনাচক্র, যা বাঙালি জাতিগত নৃগোষ্ঠীর একাংশের পশ্চাৎপদতার প্রতি নিজেকে নিবেদিত করার বৈগুণ্যের স্মারক, পৃথিবীর অন্য কোথাও এই প্রবণতাটি বড়বেশি পরিলক্ষিত হয় না। একদা সতীর্থ মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান যখন ইরান ভ্রমণ করছেন, তখন এক ইরানী গাড়িচালক তাঁকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেন, যখন জানতে পারেন সুফিয়ান একজন বাংলাদেশী। গাড়ি চালকের একটাই কথা : যে-জাতির লোক তার জাতির পিতাকে হত্যা করে সে জাতির লোকেকে তিনি তাঁর গাড়িতে বহন করবেন না। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ইরানী গাড়িচালকটি দেশ ও জাতির প্রতি অপ্রতিহত আনুগত্য ও বিশ্বস্ততার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে, যা বাঙালি নৃগোষ্ঠীর একাংশের মধ্যে একেবারেই অনুপস্থিত। এখানেই ইরানীরা বাঙালির চেয়ে প্রগতিশীল। তাঁরা একদা ধর্ম হিসেবে ইসলামকে ধারণ করেছেন ঠিকই, কিন্তু মাতৃাষা ফারসিকে তাঁরা ধর্মের অজুহাতে বিসর্জন দেননি। তাঁরা প্রমাণ করেছেন আরবীয় সংস্কৃতির চেয়ে ইরানী সংস্কৃতি অধিকতর উন্নত। অথচ বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমানদের একাংশ ধর্মের নামে মাতৃভাষা বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিলেন। বাঙালিদের একাংশ এভাবেই নিজেদের পশ্চাৎপদতার দোষ সমগ্র জাতির উপর চাপিয়ে যে-অঘটন সংঘটিত করেন তার সুবাদে বিশ্বের অন্যান্য জাতির দরবারে বাঙালির সম্মান বলে কীছু থাকে না। এই পশ্চাৎপদতার সমাজমানসতাটি বাংলাদেশের বাঙালিদের মধ্যে সত্যি বিচিত্র একটি সামাজমানসতা। এই প্রবণতাটি সময়ের তাপেচাপে যতই বহুরূপী হয়ে উঠুক না কেন, তার অন্তর্নিহিত প্রগতিবিরোধী রূপপ্রপঞ্চটির কোনও পরিবর্তন হতে দেখা যায় নি, সর্বাবস্থায় তার সে-রূপটি ছিল অপরিবর্তিত এবং এখনও আছে। বাঙালিদের মধ্যে নিহিত বিরল এই সাধনাটির দেদার নজির উপস্থিত করা যাবে ইতিহাসের পাতা থেকে। কাল ব্যবধানের দিক থেকে সবচেয়ে সন্নিকট প্রগতিবিরোধী সাধনাটি বোধ করি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে সংঘটিত হত্যাকা-। বাঙালি জাতির জীবনের প্রেক্ষিতে এই ঘটনাটিকে সাদামাটা একটি হত্যাকা- হিসেবে দেখার কোনও অবকাশ নেই। এই হত্যাকা- জাতিগত আত্মপরিচয় বিনির্মাণের সংগ্রামে বাঙালির পশ্চাদপসারণের অন্যতম একটি ঐতিহাসিক ঘটনা, যা ১৯৭১-য়ের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে মূর্তায়িত বাঙালির প্রগতিশীল চিৎপ্রকর্ষের ঘটনার সম্পূর্ণ বিপ্রতীপ। ১৯৭১-এর ৭ মার্চ বাঙালি পশ্চাৎপদতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, প্রগতির পথে আলোকায়িত অভিযাত্রী হয়ে উঠেছিল। ১৮ মিনিটের একটি ভাষণ বাঙালির জড়ভরতত্বকে এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছিল, এই ভাষণের ঐতিহাসিক অনিবার্যতা যুদ্ধকে সাহসের সঙ্গে আত্মস্থ করেতে বাঙালি কসুর করে নি, এইখানে বাঙালির বীরত্বের স্বরূপ প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ব এবং সে-বীরত্বের তাপচাপ পুড়িয়ে গুঁড়িয়ে ভস্মস্তূপে পরিণত করেছে পাকিস্তানিদের যুদ্ধদক্ষতার গর্ব । এমকি ৩০ লক্ষ প্রাণ বিসর্জন দিতে দ্বিধা করে নি।
লালন তাঁর গানে বলেন, ‘অমাবস্যায় পূর্ণিমা হয়, মহাযোগ সে-দিনের উদয়।/ লালন বলে তাহার সময় দ্বন্দ্ব তো রয় না, দ্বন্দ্ব তো রয় না/ সময় গেলে সাধন হবে না’ (এই গানের ‘দ্বন্দ্ব তো’র পাঠান্তর ‘দনডোমো’ প্রচলিত আছে)।’ এই মরমিবাণীর মরমিয়া অর্থ আছে, মরমিয়া সাধকরা তার অর্থ ভালো জানেন। সে-অপার্থিবতার দিকে না গিয়ে পার্থিবতার দিক থেকে বিবেচনা করলে শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণসঞ্জাত একটি মাহাযোগের উদয়ের ইঙ্গিত মেলে। এই মহাযাগের উদয়টি ছিল বাংলাদেশের স্বাাধীনতার সূর্যের উদয়। যে-সূর্যোদয়ের মহেন্দ্রক্ষণ সৃষ্টির লক্ষ্যে বাঙালি হাজার বছর ধরে হাজার হাজারটা প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে সংগ্রাম করে এসেছে। সেই মহেন্দ্রক্ষণের সুস্পষ্ট পূর্বাভাস ছিল মুজিবের কণ্ঠে, তিনি বলেছিলেন, ‘এ দেশের মানুষকে খতম করা হচ্ছে, বুঝে শোনে চলবেন। দরকার হলে সমস্ত চাকা বন্ধ করে দেয়া হবে। আপনারা নির্ধারিত সময়ে বেতন নিয়ে আসবেন। যদি একটিও গুলী চলে তাহলে বাংলার ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলবেন। যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। আমরা তাদের ভাতে মারবোÑ পানিতে মারবো। হুকুম দিবার জন্য আমি যদি না থাকি, সহকর্মীরা যদি না থাকেন, আপনারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।’ সেদিন স্বাধীনতা সংগ্রামের মহাযোগে ‘অমাবস্যায় পূর্ণিমা হয়’-এর মতো এক আপাত অসম্ভব সম্ভব হয়েছিল। বাঙালি জাতির মধ্যে কোনও দ্বন্দ্ব ছিল না। যারা রাজাকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন তাঁরা পাকিস্তান অন্দোলনের কালে, একাত্তরের যুদ্ধের কালে বাঙালি জাতির থেকে নিজেরা নিজেদের আলাদা করে নিয়েছিলেন, তাঁরা নিজেদেরকে আলাদা করেছিলেন নিজের চেতনায় বাঙালিবিরোধী মানসতা ধারণ ও অবাঙালি সংস্কৃতিকে লালন করে। আর ১৯৭৫-য়ে যাঁরা বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতা ও বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের হাত্যা করে ক্ষমতায় গিয়েছিলেন প্রকৃতপ্রস্তাবে তাঁরা কেউ বাঙালির কেউ নন। তাঁরা নিজেদেরকে বাঙালি জাতিসত্তা থেকে ও বাঙালি সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছিলেন। তাঁরা ৭ মার্চের মহাযোগের মহেন্দ্রক্ষণের ‘দনডোমো’র (দ্বন্দ্বের) প্রতীক মাত্র, আবারও বলি তাঁরা বাঙালি কেউ নয়। যে-বাঙালি শহীদ মিনারের অপমান সহ্য করে সে-বাঙালি কোনওভাবেই বাঙালি হতে পারেন না, নিজেকে তিনি যতই বাঙালি বলুন আদতে তিনি বাঙালি নন, বাঙালির একটি আত্মিক বৈশিষ্ট্য আছে। যে-আত্মিক বৈশিষ্ট্যের জোরে বিমানসেনা মতিউর পাকিস্তানের বিমান ঘাঁটি থেকে বিমান নিয়ে পালায়, মৃত্যুর পরোয়া বরে না।

‘সময় গেলে সাধন হবে না’ এই কথাটি দিয়ে লেখা শুরুর একটি কারণ আছে। কারণটা আর কীছুই নয় একটি সংবাদ শিরোনাম। শিরোনামের মর্মার্থটি বাংলাদেশের বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত জরুরি একটি কাজ শুরু করার প্রসঙ্গ নিয়ে। কথাটা বলা হয়েছে মানুষের ধর্মসাধনাকে উপলক্ষ্য করে। দ্বীনসাধনা অর্থাৎ ধর্মসাধনারও একটা সময় আছে। লালন বলেছেন, ‘দিন থাকতে দ্বীনের সাধন কেন জানলে না/তুমি কেন জানলে না/ সময় গেলে সাধন হবে না।’ কবির এই আত্মজিজ্ঞাসামূলক আক্ষেপ কালের ব্যবধানে অনেক পুরনো। কথাটা কেবল ধর্মসাধনার ক্ষেত্রেই নয়, উচিৎ বিবেচনায় জীবনসাধনার ক্ষেত্রেও খাটে। বাঙালির কবি বাঙালিকে ১৩০ বছর আগে সাবধান করে গেছেন কাজ শুরু করতে দেরি না করার জন্যে। আগের কাজ আগে করো, না হয় ঠকবে। মুদ্দাকথা সময়ের কাজ সময়ে করার জন্যে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অসময়ে কাজ শুরু করলে ফল ভালো হয় না। এই গানেই সতর্কসঙ্কেত পাওয়া যায়, ‘অসময়ে কৃষি কইরে মিছামিছি খেইটে মরে/ গাছ যদি হয় বীজের জোরে/ ফল ধরে না তাতে ফল ধরে না/ সময় গেলে সাধন হবে না।’
আমরা বাঙালিরা স্বভাবদোষে দুষ্ট। আমাদের স্বভাবেরই দোষ, সব কীছুতে দেরি করা, সব কীছুতে পিছিয়ে পড়া। ধর্মসাধনায় কেবল নয়, জীবন সাধনায়ও আমরা পিছিয়ে আছি, যেমন ব্যক্তি জীবনে তেমনি জাতীয় জীবনে। আমরা বুঝতে চাই না যে, যার জীবনই নেই তার আবার ধর্মকর্ম কী। কবরে গিয়ে তো আর ধর্মসাধনা হয় না। আগে জীবনটাকে বাঁচানো চাই, জীবনের উন্নয়ন চাই। জীবনের উন্নয়নের যে পথিকৃত আমরা তাঁকে হত্যা করি এবং পরিত্যাগ করি এবং সময় গেলে বুঝতে পারি জীবনের ধনকে আগে পায়ে ঠেলেছিলাম, এখন ঠেকে শিখেছি, বুকে টানতে হবে।
গত মঙ্গলবারের (১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০) দৈনিক সুনামকণ্ঠের একটি উদ্ধৃত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘শাবিপ্রবির পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে ৭ মার্চের ভাষণ’। শিরোনামটি পাঠ করে উল্লসিত হওয়ার আগে মনের কোণে একধরণের ক্ষোভ জমে উঠতে শুরু করে নিজের অজান্তেই । এখন কেন? এতো দেরিতে কেন? রাগ হয় সেই সব রাজনীতিকদের প্রতি যাঁরা জাতিকে পিছিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে বার বার নিমগ্ন থাকেন। নিজেদের জল ঘোলা করে পান করার স্বভাব দোষটা চাপিয়ে দিতে চান জনগণের ঘাড়ে। জনগণ তো কোনও দিন ঘোলা জল পান করতে চান নি, এবং জনপ্রতিনিধিদেরকে জল ঘোলা করার দায়িত্ব দেওয়া হয় নি। তাঁরা তো ১৯৪৭-য়ে সুখেশান্তিতে দুমুঠো ভাত খেয়ে বাঁচতে চেয়েছিল বলে ব্রিটিশ ভারতের বিরুদ্ধে গিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলন করেছিল, কারও কেনা গোলাম হতে চায়নি। কিন্তু স্বাধীনোত্তর কালে তাঁদের শ্রমের টাকা দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে পাকা দালান, রাস্তা, কলকারখানা গড়া হবে কেন? আর বাঙলার কৃষক-মজুর সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ কেন পেটপুরে দু’মুঠো ভাত খেতে পাবে না ? বৈষম্য নিরসনের আন্দোলন থামাতে পূর্ববঙ্গের মানুষের উপর যুদ্ধ কেন চাপিয়ে দেওয়া হবে ?
এ প্রসঙ্গে কেবল বলতে চাই, আপনারা সব কীছু করুন, কেবল নিজেদের কতিপয়ের স্বার্থোদ্ধারের লোভে দেশের কোটি মানুষের সর্বনাশ করবেন না, তাদেরকে পিছিয়ে দেবেন না, জাতিকে পিছিয়ে দেবেন না, জাতিকে ঘোলা জল পান করতে বাধ্য করে গাধা বানিয়ে দেবেন না। এখনও বঙ্গবন্ধুন শরণাপন্ন হোন। একদা বঙ্গবন্ধু যা করতে চেয়েছিলেন দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য, তাই ছিল সময়োচিত। তাঁকে হত্যা করে, তাঁর প্রদর্শিত পথ থেকে সরে গিয়ে কেবল পিছিয়েই থাকা হলো, দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতাব্দী কালব্যাপী। কাজের কাজ কীছু তো হলো না, পশ্চাৎপদতা, দুর্নীতি, খুন আর নোংরা রাজনীতির পাঁকে নাক ডুবিয়ে থাকা হলো। এই নোংরামির আড়ালে জীবনসাধনা থেকে বিচ্ছিন্নতার চর্চা আর কতো ? এবার ক্ষেমা দিন। ভুলে গেলে চলবে না, শেখ মুজিবকে পরিহার করার আগে তাঁর চেয়ে ভালো কীছু করে দেখাতে হবে, ভালো কোনও দিকনির্দেশনা দিতে হবে জাতিকে। ২১ আগস্টে গ্রেনেড হামলা করে, চোরা পথে ১০ ট্রাক অস্ত্র আমদানি আর ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে উগ্র জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটিয়ে জীবনের সাধনা তো হবেই না, এমনকি দ্বীনের সাধনাও হবে না। সময় এখনও শেষ হয়ে যায় নি। দয়া করে শুরু করুন। শুরু করলেই সে-টা হবে সময় মতো।