সময় শেষ কাজ শুরু

এনামুল হক, ধর্মপাশা
নীতিমালা অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ শেষ করার কথা থাকলেও সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার কাইলানি হাওরে ৫৭নম্বর প্রকল্পে কাজ শুরু হয়েছে ২৯ ফেব্রুয়ারি। ওই প্রকল্প এলাকায় নেই কোনো সাইনবোর্ড। ফলে কে কীভাবে এ প্রকল্পের কাজ করছেন তা অধরাই থাকছে। বাঁধের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের কাছ থেকে জানা গেলো পরিমল মজুমদার নামের এক ব্যক্তি এ প্রকল্পের কাজ করাচ্ছেন। গত সোমবার দুপুরে তাকে প্রকল্প এলাকায় পাওয়া যায়নি। কিছুক্ষণ পর স¤্রাট চৌধুরী নামের এক ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত হয়ে জানালেন তিনি এবং পরিমল মজুমদার দু’জনে এ প্রকল্পের কাজ করছেন। তবে স¤্রাট চৌধুরী প্রকল্পের সভাপতি নাকি সদস্য সচিব তা না জানিয়েই সেখান থেকে সরে যান। এর আধাঘণ্টা পর প্রকল্প এলাকায় দেখা হয় পরিমল মজুমদারের সাথে। তিনি জানালেন, তিনি সভাপতি ও স¤্রাট চৌধুরী সদস্য সচিব। তাদের যৌথ স্বাক্ষরে বিল উত্তোলন হয়েছে এবং ২৯ ফেব্রুয়ারি থেকে কাজ শুরু করেছেন তারা।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অধীনে ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্র সোনার থাল, জয়ধুনা, ধানকুনিয়া, সোনামড়ল, কাইলানী, গুড়াডোবা, গুরমা ও গুরমার বর্ধিতাংশে বোরো ফসল রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের জন্য প্রথমে ১৫৯টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এসব প্রকল্পে কাজের জন্য প্রকল্প
বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন ও কাজ শুরু হয়নি কাবিটা নীতিমালার বেধে দেওয়া নির্ধারিত সময়ে। যদিও পাউবোর দাবি হাওর থেকে দেরিতে পানি নামায় কাজ শুরু করতে দেরি হয়েছে। পাউবোর তথ্যমতে এখন পর্যন্ত ১৫৯টি প্রকল্পের মধ্যে ২৩টি প্রকল্পে মাটি ফেলার কাজ বাকি রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তার সংখ্যা অনেকটাই বেশি।
এদিকে ফ্রেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে চন্দ্রসোনার থাল হাওরের অধীনে সাথারিয়া পাথারিয়া হাওরে ১৫টি, কাইলানী হাওরের অধীনে টঙ্গী ফসলরক্ষা বাঁধে ৪টি ও সোনামড়ল হাওরে ১টিসহ আরো ২০টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এই ২০টি প্রকল্পের কাজ ফেব্রুয়ারির মধ্য থেকে শেষ সপ্তাহে শুরু হয়েছে। এসব প্রকল্পের কাজও চলছে কচ্ছপ গতিতে। এ মাসের মাঝামাঝি সময়ে আকস্মিক বন্যার পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার আগেই হাওরে পানি ঢুকে ফসলি জমির ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে করে ১৭৯টি প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দকৃত ৩৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকাই বিফলে যেতে পারে।
এ মাসের ৮ তারিখের মধ্যে মাটির ফেলার কাজ, স্লোপ ও কম্পেকশনসহ যাবতীয় কাজ শেষ করার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টদের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো কোনো পিআইসি প্রশাসনের নির্দেশনাকে তোয়াক্ষা না করে খেয়াল খুশিমতো কাজ করে যাচ্ছে। এ নিয়ে গত বুধবার উপজেলা কাবিটা বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতিসহ অন্যরা পিআইসি সভাপতি ও সদস্য সচিবদের সাথে মতবিনিময় সভায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
গত সোমবার থেকে বুধবার পর্যন্ত উপজেলার কাইলানি, চন্দ্র সোনারথাল, সোনামোড়লসহ কয়েকটি হাওরের একাধিক বাঁধ সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা যায়, শুধুমাত্র মাটি ফেলে বাঁধ ঘষামাজা করে সমান করে রাখা হয়েছে। এসব বাঁধের উপর দিয়ে হেঁটে গেলে অথবা স্লোপ দিয়ে নিচে নামতে চাইলে পা মাটিতে দেবে যায়। গত মঙ্গলবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ কাবিটা কমিটির সদস্যবৃন্দ সরেজমিনে মাঠ পরিদর্শন করে এমন কাজের সত্যতা পান। পরিদর্শনকালে তদারকি কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা উপজেলা পল্লী জীবিকায়ন কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম সোহাগ ১৭৩ নং প্রকল্পের সদস্য সচিব ফয়েজ উদ্দিনকে লাঠি দিয়ে প্রহার করেন। বিষয়টি নিয়ে বাঁধের কাজের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। প্রহার করার মত কাজ করছে বলে প্রহার করা হয়েছে বলে জানান অভিযুক্ত ওই কর্মকর্তা।
উপজেলা কাবিটা কমিটির সদস্য গোলাম আজহারুল ইসলাম জানান, ‘পিআইসিকে প্রহার করা মোটেও উচিত হয়নি। ওই কর্মকর্তাকে তদারকি কর্মকর্তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন।’
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের ধর্মপাশা উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব চয়ন কান্তি দাস বলেন, ‘এখনো মাটি ফেলার কাজ ভালোমতো শেষ হয়নি। কবে নাগাদ বাঁধের কাজ পুরোপুরি শেষ হবে তা বলা যাচ্ছে না। ফলে আগাম বন্যা আসলে ফসলহানি ঘটতে পারে।’
৫৬ নম্বর প্রকল্পের সভাপতি বদিউজ্জামানসহ কাজ শেষ করতে না পারা কয়েকজন বলেন, ‘দেরিতে কাজ বুঝিয়ে দেওয়ায় এখনো কাজ শেষ করতে পারিনি। তবে দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
সুনামগঞ্জ পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী মাহমুদুল ইসলাম বলেন, ‘হাওর থেকে দেরিতে পানি নামায় কাজ শুরু করতে দেরি হয়েছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ও উপজেলা কাবিটা বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি আবু তালেব বলেন, ‘আগামী ৮ তারিখের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে। কাজের সময়সীমা বৃদ্ধির জন্য উপজেলা কমিটির পক্ষ থেকে জেলা কমিটিকে জানানো হয়েছে। বাঁধের কাজে গাফিলতির জন্য এখন পর্যন্ত তিন জনকে জেলসহ একাধিক পিআইসিকে জরিমানা করা হয়েছে।’