সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ- দুই মাসে লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও কেনা হয়নি

আকরাম উদ্দিন
সুনামগঞ্জে এবার সরকারিভাবে কৃষকদের কাছ থেকে ছয় হাজার মেট্রিক টন ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। দুই মাস আগে জেলায় ধান ও চাল ক্রয় শুরু হলেও এ পর্যন্ত ধান কেনা হয়েছে দুই হাজার ১ মেট্রিক টন।
এবার সুনামগঞ্জের হাওরে ধানের উৎপাদন বেশি হওয়ায় শুরু থেকেই দাবি ছিল সরকারিভাবে ধান ক্রয়ের পরিমাণ বাড়ানো এবং তা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কেনার। এ নিয়ে স্মারকলিপি ও মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হলেও ধানের পরিমাণ আর বাড়েনি। ধান কেনায় ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। ধানের চেয়ে চাল ক্রয়েই সংশ্লিষ্টদের আগ্রহ বেশি।
সুনামগঞ্জে ‘হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’র সদস্য সচিব চিত্তরঞ্জন তালুকদার জানান, সরকারিভাবে ধানের দাম প্রতিমণ ধরা হয়েছে এক হাজার ৪০টাকা। কিন্তু এখন হাওর এলাকায় প্রতিমণ ভালো ধান বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৮০০টাকায়। অথচ হাওরে প্রতিমণ ধান উৎপাদনে ব্যয় হয় প্রায় ৯০০টাকা। এমনিতেই ধানের কম দাম নিয়ে হাওরের কৃষকেরা বিপাকে আছেন। ঘরে ধান থাকলেও বিক্রি করতে পারছেন না তারা। আবার গুদামে ধান দিতে গেলেও নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। এক শ্রেণির প্রভাবশালী ও মধ্যস্বত্বভোগীরাই গুদামে ধান দেয়। চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন,‘আমরা শুরু থেকেই ধান ক্রয়ের পরিমাণ বাড়ানো এবং সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহের দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু কোনো ফল হচ্ছে না।’
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানান গেছে, গত বছর সুনামগঞ্জের হাওরে ব্যাপক ফসলহানির কারণে জেলায় সরকারিভাবে ধান ক্রয় করা হয়নি। এবার হাওরে বোরো ধানের ফলন ভালো হয়েছে। ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ছয় হাজার মেট্রিক টন। এরপর দাবি ওঠে ধানের পরিমাণ বাড়ানোর। পরে জেলা খাদ্যবিভাগ ৩০হাজার মেট্রিক টন ধানের চাহিদা দিয়ে মন্ত্রলণালয়ে চিঠি দেয়। কিন্তু এখনো ধানের পরিমাণ বাড়েনি। এবার প্রথমে চাল ক্রয়ের বরাদ্দ এসেছিল ৬হাজার ৬৯২ মেট্রিক টন। এর মধ্যে আতপ চাল ৫হাজার ৪৮৬ মেট্রিক টন এবং সেদ্ধ ১হাজার ২০৬ মেট্রিক টন। পরে আতপ চালের পরিমাণ আরও ৪ হাজার ৮৪৮ মেট্রিক টন বাড়ানো হয়েছে।
জেলা খাদ্য বিভাগের হিসেব অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে এ পর্যন্ত সদর উপজেলার মল্লিকপুর খাদ্যগুদামে এক হাজার মেট্রিক টনের মধ্যে ৫৫০ মেট্রিক টন, দোয়ারাবাজার উপজেলায় ৪০০ মেট্রিক টনের মধ্যে ১৫ মেট্রিক টন, ছাতক উপজেলায় ৪০০মেট্রিক টনের মধ্যে মাত্র তিন মেট্রিক টন, জগন্নাথপুর উপজেলায় দুটি খাদ্যগুদামে ৬০০ মেট্রিক টনের মধ্যে মাত্র চার মেট্রিক টন, দিরাই উপজেলায় ৭০০ মেট্রিক টনের মধ্যে ৪৪৪ মেট্রিক টন, শাল্লা উপজেলায় ৭০০ মেট্রিক টনের মধ্যে ২০০ মেট্রিক টন, ধর্মপাশা উপজেলার দুটি খাদ্যগুদামে ৮০০ মেট্রিক টনের মধ্যে ৩১৪ মেট্রিক টন, জামালগঞ্জ উপজেলায় ৬০০ মেট্রিক টনের মধ্যে ১৯১ মেট্রিক টন, তাহিরপুর উপজেলায় ৫০০ মেট্রিক টনের মধ্যে ১৪১ মেট্রিক টন এবং বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় ৩০০ মেট্রিক টনের মধ্যে ১৩৮ মেট্রিক টন ধান কেনা হয়েছে।
অন্যদিকে এ পর্যন্ত চাল কেনা হয়েছে আতপ ৭ হাজার ৯০৭ মেট্রিক টন এবং সেদ্ধ এক হাজার ২০৬ মেট্রিক টন। গত ১৮ মে থেকে জেলায় চাল ও ধান ক্রয় অভিযান শুরু হয়।
জানতে চাইলে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. জাকারিয়া মুস্তফা জানান, তারা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনতে চাইছেন। মধ্যস্বত্বভোগী কিংবা দালালেরা যাতে গুদামে ধান দিতে না পারে এ জন্য কৃষকদের তালিকা করে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে ধান ক্রয়ে একটু বেশি সময় লাগছে। তিনি বলেন,‘বৃষ্টিসহ নানা কারণে ধানক্রয়ে কিছুটা সময় লাগছে। তবে ৩১ আগস্টের মধ্যে জেলায় ধান-চাল ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়ে যাবে।’ ধান ক্রয়ের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন,‘মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া আছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা আসেনি। বরাদ্দ বাড়ানো হলে কৃষকদের কাছ থেকেই সেই ধান নেওয়া হবে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জে গত বছরের এপ্রিল মাসে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে বাঁধ ভেঙে ১৫৪টি হাওরের সব ফসল তলিয়ে যায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জেলার সোয়া তিন লাখ কৃষক পরিবার। এবার হাওর ২ লাখ ২২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল। কৃষকেরা নির্বিঘেœ তাদের ধান গোলায় তুলতে পেরেছেন। এতে জেলায় ধানের উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন।