সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদ_দুই যুগ ধরে হচ্ছে না নির্বাচন, নেই কোন উদ্যোগও

আসাদ মনি
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি অনেক পুরনো। সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯৪ সালে। এরপর আর ছাত্র সংসদ নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রায় ২৫ বছর ধরে কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হচ্ছে না। ‘ছাত্রদের পার্লামেন্ট’ হিসেবে খ্যাত ছাত্র সংসদকে ভুলেই বসেছে কলেজের প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী।
সুনামগঞ্জ জেলা শহরে বর্তমান সময়ে যারা রাজনীতি করছেন, তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সরকারি কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়েই পরবর্তীতে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন।
কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় ছাত্রদের মধ্য থেকে থেকে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না। এক সময় কলেজটিতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়মিত অনুষ্ঠিত হতো। ১৯৯৪ সালের পর থেকে তা বন্ধ হয়ে রয়েছে।
কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন জরুরি মনে করেন সাবেক ছাত্রনেতারা। তাঁরা বলছেন, পড়াশোনার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখা ছাড়াও খেলাধুলা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সংস্কৃতিচর্চা, নিয়মিত সাময়িকী প্রকাশের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল জ্ঞানের চর্চা, তরুণ নেতৃত্বের বিকাশ, শিক্ষার্থীদের ন্যায়সংগত দাবি আদায়, ক্যাম্পাসে বহিরাগত ঠেকানো, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিতে মেধাবী, ত্যাগী ও যোগ্যদের তৈরি করতে ছাত্র সংসদের বিকল্প নেই। ছাত্র সংসদের নির্বাচন না হওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাঁদের ভোটাধিকার হারাচ্ছেন, দেশ হারাচ্ছে তরুণ নেতৃত্ব।
গত ১১ মার্চ ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একে একে সারাদেশের কলেজগুলোতে নির্বাচনের আয়োজন করা হবে বলে আশা করেছিলেন বিশিষ্টজনেরা। ডাকসু নির্বাচনের পর দু’একটি কলেজে নির্বাচনের তৎপরতা দেখা গেলেও বেশিরভাগ কলেজ কর্তৃপক্ষ নির্বাচনের প্রসঙ্গে নিরব আছেন। সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ কর্তৃপক্ষ ব্যতিক্রম নয়। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকা সুকসু নির্বাচন নিয়ে কোনো উদ্যোগই লক্ষ্য করা যায় নি। ছাত্রসংগঠনগুলোও এই বিষয়ে সোচ্চার নয়।
জানা যায়, ১৯৯৩-৯৪ সালে সর্বশেষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে কলেজটিতে। সর্বশেষ কমিটিতে সর্বমোট ১৩ জন নেতা নির্বাচিত হন। সে নির্বাচনে ভিপি পদে মনিষ কান্তি দে মিন্টু ও সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে শামছুল হক নির্বাচিত হোন। এছাড়াও অন্যান্য পদে যারা নির্বাচিত হন তারা হলেন, দফতরবিহীন সম্পাদক পারভেজ আহমদ, ছাত্র মিলনায়তন সম্পাদক হারুন অর রশিদ, ছাত্রী মিলনায়তন সম্পাদক কবিতা দে, সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পাদক পংকজ কান্তি তালুকদার, ক্রীড়া সম্পাদক তুষার কান্তি দেব, সহ-ক্রীড়া সম্পাদক লিটন সরকার, নাট্য ও আপ্যায়ন সম্পাদক সাঈদ আহমদ, বার্ষিকী সম্পাদক গৌতম কুমার বণিক, বিতর্ক ও আলোচনা সম্পাদক বিমল বণিক, সমাজসেবা সম্পাদক যতীন্দ্র মোহন দাশ এবং পাঠাগার সম্পাদক পদে সন্তোষ কুমার চন্দ।
তৎকালীন ছাত্র সংসদের আন্দোলনের মুখে ১৯৯৬ সালে কলেজে অনার্স কোর্স চালু হয়। কলেজে সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মেধা-মনন বিকাশে ছাত্র সংসদ কাজ করেছে। এছাড়াও ছাত্রদের উন্নত চরিত্র গঠন করতে সুকসু ছাত্র সংসদ উল্লেখ্যযোগ্য ভূমিকা রাখতো বলে জানা যায়।
সুকসু’র সাবেক ভিপি অ্যাডভোকেট বুরহান উদ্দিন দোলন বলেন, ১৯৯১-৯২ সালের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিক্ষার্থীরা আমাকে ভিপি, মোজ্জামেল হক চৌধুরী মুনিমকে জিএস, গোলাম কবির’কে এজিএস ও ব্যারিস্টার এনামুল কবির ইমন’কে বার্ষিকী সম্পাদক পদে সহ মোট ১৪ জনকে নির্বাচিত করে।
তিনি আরো বলেন, ছাত্ররাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো ছাত্র সংসদ। ছাত্র সংসদ না থাকলে ছাত্রদের সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলার মতো স্বীকৃত কোনো সংগঠন থাকে না। ছাত্র সংসদ নির্বাচন না থাকার কারণে রাজনীতি ব্যবসায়ীদের হাতে চলে যাচ্ছে।
সুনামগঞ্জ পৌর কলেজের সাবেক অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, ‘সারাদেশের প্রতিটি কলেজেই ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রয়োজন। ছাত্র সংসদ হলো কলেজ প্রশাসনের পাশাপাশি আরেকটি ছায়া প্রশাসন। যে প্রশাসন শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সংরক্ষণে কাজ করবে। কলেজের প্রশাসনের পরিপূর্ণতার জন্য ছাত্র সংসদ প্রয়োজন।’
সুকসু’র সর্বশেষ ভিপি মনিষ কান্তি দে মিন্টু বলেন, সরকারি কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রয়োজনীতা অনেক। শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কথা বলার জন্য একটি কার্যকর ছাত্র সংসদ প্রয়োজন। বর্তমান রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অনৈতিক আস্ফালন, ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ার জন্যই হয়েছে। ছাত্র সংসদ কলেজের সংকট ও স্থানীয় অনেক সমস্যা নিরসনের জন্য কাজ করে থাকে।
কলেজের অধ্যক্ষ নিলিমা চন্দ বলেন, আমি চাই আমার কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হোক, এতে তরুণ নেতৃত্ব তৈরি হওয়ার পাশাপাশি কলেজের উন্নয়ন ও ছাত্রদের মাঝ থেকে জাতীয় নেতৃত্ব তৈরি হবে। তিনি আরো বলেন, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পেলেই আমরা তফসিল ঘোষণা করবো। আমরা প্রস্তুত আছি।