সরকারি চাকুরিতে সুষম নিয়োগ পদ্ধতি প্রবর্তনই মুখ্য হওয়া উচিৎ

প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি কোটা বাতিলের ঘোষণায় ক্ষতিগ্রস্ত হবেন মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম, নারী, প্রতিবন্ধী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও অনগ্রসর জেলাসমূহের অধিবাসীরা। কোটা বিরোধী ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী সব ধরনের কোটা বাতিলের পক্ষে জাতীয় সংসদে বক্তব্য দিলেও এখন পর্যন্ত এ সংক্রান্ত সরকারি কোন প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সর্বসাধারণ্যে এক ধরনের কৌতুহল তৈরি হয়েছে। প্রজ্ঞাপন জারির পর সরকারের মনোভাব বুঝা যাবে। তবে আমাদের পবিত্র সংবিধানে জনগোষ্ঠীর অনগ্রসর, পশ্চাদপদ ও বিশেষ অংশকে সরকারি চাকুরিতে বিশেষ সুবিধা দানের জন্য সরকারকে ক্ষমতা দেয়া আছে। পৃথিবীর প্রত্যেক দেশেই অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূল ¯্রােতের সমান্তরাল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বিশেষ সুবিধা প্রদানের দৃষ্টান্ত রয়েছে। কোটা নিয়ে আন্দোলনকারী ছাত্র সমাজের দাবি ছিল প্রচলিত কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের। তবে তারা কী ধরনের সংস্কার চান সে নিয়ে ছিলো না তাদের স্পষ্ট কোন বক্তব্য। তাদের সার্বিক কথাবার্তার সুর থেকে সাধারণ্যে এমন একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল, যাতে বুঝা গিয়েছিল তারা ৩০% মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে বিশেষভাবে প্রতিবাদী। তাদের আন্দোলনে এমন কিছু বিষয়বস্তু নিহিত ছিল যাতে জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অবজ্ঞা দেখানোর মত। কোটা নিয়ে আন্দোলনকারীদের স্পষ্ট বক্তব্য না থাকায় এবং এ নিয়ে ভবিষ্যতে কোন ধরনের আন্দোলন করার সুযোগ না দেওয়ার অভিপ্রায়ে প্রধানমন্ত্রী সব ধরনের কোটা বাতিলের ঘোষণা দিলেন। এমন একটি ঘোষণার জন্য আন্দোলনকারী থেকে শুরু করে দেশের মানুষ কেউই প্রস্তুত ছিলেন না। এখন দেখার বিষয় হলো সরকারি প্রজ্ঞাপনে বিষয়টিকে কীভাবে আনা হয়। মুক্তিযোদ্ধা বা নারী কোটা কিংবা জেলা কোটা অথবা প্রতিবন্ধী কোটা একেবারে বাদ দিয়ে দিলে আবারও এ নিয়ে কথা উঠবে। ইতোমধ্যে মুক্তিযোদ্ধা সন্তানরা নিজেদের প্রতিবাদী অবস্থানের জানান দিয়েছেন। নারীরাও নিশ্চয়ই সম্পূর্ণ কোটা উঠিয়ে দেয়ার বিষয়টি মেনে নিবেন না। সুতরাং সবদিক সামাল দিয়ে সর্বজনগ্রহণযোগ্য একটি মীমাংসাসূত্র আবিষ্কার করা কিছুটা কঠিন বলেই আমাদের কাছে মনে হচ্ছে। তবে সর্বজনগ্রাহ্য না হলেও গ্রহণযোগ্য একটি পদ্ধতি তো দিতেই হবে।
সরকারের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির অনেক নিয়োগ রয়েছে যেগুলোতে জেলার অধিবাসীদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়ে থাকে। কোটা উঠিয়ে নিলে এসব ক্ষেত্রে কী হবে সেটিও আরেক প্রশ্ন হিসেবে সামনে আসবে। এছাড়া বিসিএস, ননক্যাডার এবং সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকুরিতে কোটা পদ্ধতির কীরূপ অবস্থান হবে সেটি আরেক প্রশ্ন। এমন অবস্থায় সরকারের উচিৎ বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সূত্রপাত করা। হঠাৎ করে কোন সিদ্ধান্ত দেয়ার আগে পুরো বিষয়টি নিয়ে চিন্তা ভাবনা ও আলোচনা পর্যালোচনা করতে হবে নিবিড়ভাবে। নতুবা অনগ্রসর গোষ্ঠী ও অঞ্চল এক ধরনের ভয়াবহ অবস্থায় পতিত হবে।
যারা কোন ইস্যুতে আন্দোলন করেন তাদের সব বক্তব্যকে সরকারের আমল দিলে রাষ্ট্র পরিচালনা সত্যিকার অর্থেই কঠিন হয়ে পড়ে। আসল কথা হলো এমন সুষম ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে হবে যাতে নাগরিক সমাজের বিশেষ কোন অংশের মধ্যে কোন ধরনের বঞ্চনাবোধ তৈরি না করে। তদুপরি সাম্প্রতিক সময়ে নিয়োগে যে ধরনের অসাধু পন্থা অবলম্বনের খবর মিলে তাতে কোটা উঠিয়ে দিলে বা না দিলে কোন রকমফের হবে বলে মনে হয় না। সুতরাং সরকারি চাকুরিতে সুষম নিয়োগ পদ্ধতি প্রবর্তনের বিষয়টিই সরকারের মুখ্য হওয়া উচিৎ।