সরকারি দল করা হল না

শাহরিয়ার চৌধুরী বিপ্লব
সুরমা নদীর স্রোতধারা কখনো সুনামগঞ্জকে ভাসায়, কখনো হাসায়, কখনো কাঁদায়। এ নদীর মাঝিরা কখনো উজানে যায়, কখনো ভাটীতে নৌকা চালায়। এ জলের ডানপিটে বালকেরা  উজানে সাঁতার কাটে কখনো ভাটিতে গা ভাসায়। একমাত্র অবাধ্য বেপরোয়া বালক আপনি,  শুধু উজানেই সাঁতার কাটলেন, স্রোতের টানে গা ভাসাতে পারলেন না কোনদিন।  
এবার কি সুযোগ এসেছিল? সরকারি দলের নেতা হবার মাহেন্দ্রক্ষণ কি কড়া নেড়েছিল দরজায় ? জানি না। বুক ফেটে যায়। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।
আমি কেমন অপয়া। কেমন অলক্ষুণে। এভাবে আমার কথা ফলে গেল?  দম আটকে যায়। বমি আসে। কি লিখি? বিশ্বাস করুন জগলু    
ভাই আমি এমন সত্যি চাই নি। এমন হাসিঠাট্টা চাই নি। এমন হেয়ালি জোকস করিনি। নিজের বুক থাপড়াতে পারি। নিজের মাথা নিজে ফাটাতে পারি। কি করে বুঝাই এটা আমার মনের কথা ছিল না। বরং এবার  আমার আশংকা  বদলে যাবার সময় ছিল। এবার আসছিল সময় আপনার।  এবারই ভাটির টানে স্রোতের পক্ষে হাল ধরার সময় হয়েছিল। সারাজীবন আপনি স্রোতের বিপরীতে ইলিশ মাছের মতো উজানে সাঁতার কেটেছেন। উজান গাংগের মাঝি হিসাবেই আপনার বেড়ে উঠা। আফালের বিপরীতে অন্ধকারে রাতে ঝড়ের টালমাটাল নৌকার মাঝি ছিলেন সারা জীবন।
আওয়ামী লীগ আর সুনামগঞ্জের প্রতিটি ক্রাইসিসে আপনি ছিলেন কংক্রিটের দেয়াল। ৭৫ পরবর্তী দলের দু:সময়, ৮২ পরবর্তী নেত্রী ও দলের চরম সংকটে আমরা দেখেছি আপনিই ছিলেন মুজিব সৈনিকদের একমাত্র আশ্রয়স্থল। ছাত্রজীবনের আদর্শিক রোমান্টিসিজমে পড়ে আপনার বিপরীত গ্রুপে রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছিলাম। তখন বিভিন্ন কারণে আপনাকে ভালো না লাগলেও আপনার ব্যক্তিগত অহংবোধ আমাকে টানতো। ৯০ সালের দিকে সুনামগঞ্জের রাজনৈতিক মেরুকরণে আমরা কিছু ছাত্রকর্মী আব্দুস সামাদ আজাদের আহবানে মূল স্রোতধারায় ফিরে আসলেও আপনার সাথে আমার  অদৃশ্য দেয়ালটা ভাংগা হয় নি। তারপরেও আপনি আমাকে জেলা যুবলীগের যুগ্ম আহবায়ক বানিয়েছিলেন। আব্দুস সামাদ আজাদের বিশাল জনসভায় আমাকে পরিচালনা করার দায়িত্ব দিয়ে ঋণী করেছিলেন। (এ ঋণ শোধ করার জন্যেই দুইটি নির্বাচনে আপনার পক্ষে থাকার চেষ্টা করেছি।) তখন থেকেই বন্ধু কল্লোল আর ভাগনা শিপারের কারণে রাতের পর রাত দিনের পর দিন একসাথে আড্ডা, হিন্দু ছাত্রাবাস, মুসলিম ছাত্রাবাস, লঞ্চঘাট, বাসস্টেন্ড আর পুলের উপর ম্যারাথন সময় কাটাতে কাটাতে কিছুটা দেয়াল ভেংগে যায়। বয়সে বড় হয়েও কলেজ নির্বাচনের উৎসবমুখর রাতগুলোতে অনেকটা বন্ধুর মতই হয়ে যান আপনি। ৯৩ সালে একই বছর দুইবার রাজনৈতিক কারণে জেলে যাই। জেলখানায় আপনি যখন দেখতে আসতেন আমরা ছাড়াও অন্যান্য কয়েদীরা আপনাকে ঘিরে কি যে আনন্দের আসর জমাতো তা নিজে না দেখলে কাউকে বুঝানো যাবে না।
এইতো পরশুদিন। অনেক দিন পরে। প্রায় দুই বছর পরে  কথা। হঠাৎ করেই আলীয়া মাদ্রাসা মাঠের কোণায়।  স্বভাবসুলভ খোঁচা দিয়ে ডাকলেন, ও বা কেন্দ্রীয় নেতা,  তোমরার দলের কিতা খবর? দল তো আপনারার। আমি  চাকুরীজীবী। বললাম। তিনি বললেন হুনলাম তুমি আছো কমিটিতে। আমরা আছি নি? আবার জিজ্ঞাস করলেন।
হেসে হেসে বল্লাম-আপনারে সরকারি দলে মানায় না। সরকারি দলের নেতা আপনি হতে পারবেন না কোনদিন।  উনি হাসি দিয়ে বললেন,‘এইটা আমার মনের কথা খইছো। আরো কিছুক্ষণ উল্টাপাল্টা কথা। আজ কেন জানি মনে হয়েছিল ভাটি নৌকার মাঝি আপনাকে মানাতো না। সরকারি দলের নেতা হওয়া আপনাকে মানায় না। আপনার জন্য বিরোধী দলের নেতা কিংবা সরকারী দলের বিরোধী নেতা এই পদবীটাই মানানসই। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে চার খলিফার এক খলিফা হিসাবে সুনামগঞ্জের ছাত্র সমাজের একসময়ের প্রাণস্পন্দন ছিলেন আপনি। পরবর্তীতে আবারো বিরোধী দলের ঝাঁঝালো নেতা হিসাবেই গণমানুষের হৃদয়ে আপনার অবস্থান ছিল সুন্দর মনোরম।  আমাদের তারুণ্যের দেখা প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা, আত্মশক্তিতে বলিয়ান,  ব্যক্তিগত অহংকারে ভরা,  সেই জগলুল যেন মাঝখানে হারিয়ে যায়। আড্ডাপ্রিয়, পরিচিত সবাইকে নকল করার দারুণ এক প্রতিভার হঠাৎ যেন ম্লান হয়ে যায় মাঝখানে। পরে যদিও দুইবার পৌর মেয়র হয়েছিলেন কিন্তু দলের নেতৃত্ব থেকে সরে যাওয়া ছিল আপনার জীবনের চরম দু:খগাঁথা।  
দু:খনৌকার মাঝি জগলুল ভাই। আপনাকে ছাড়া কি করে এ শহরের আড্ডা হবে? পূজার দলবাঁধা,  বিয়ে বাড়ীর খানাপিনা, উকিলপাড়ার খেজুড়ে আলাপ, বালুর মাঠের সন্ধ্যার খুনসুটি, মিছিলের টানটান উত্তেজনা, গ্রুপিং রাজনীতির হিসাব নিকাশ ? সুরমার ¯্রােতের বিরুদ্ধ আওয়াজ? বৈরী বাতাসের শনশন সুরেলা ধ্বনি? আপনি থেমে গেলেন বলে সুরমা নদীর জল আজ অশ্রু হয়ে মিশে যায় হৃদয়ে আমার আমাদের।
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় ছাত্রলীগ, সুনামগঞ্জ জেলা।