সরকারী দপ্তরে জনদুর্ভোগ

স্বপন কুমার দাশ রায়
দেশের আইন প্রণয়ন করা হয় নাগরিকদের সুরক্ষার উদ্দেশ্যে এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। যে কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রণীত আইনের মুখ্য উদ্দেশ্য হলো জনকল্যাণ নিশ্চিত করা। সংসদ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান। একই সাথে দেশের মহামান্য উচ্চ আদালত আইনের ব্যাখ্যার মাধ্যমে যে অভিমত ব্যক্ত করেন বা সিদ্ধান্ত প্রদান করেন তা নজির হিসেবে আইনের মর্যাদা লাভ করে।
আমাদের দেশে এমন অনেক প্রতিষ্ঠান, অফিস ও কর্মকর্তা আছেন যিনি বা যারা নিজেদের আর্থিক স্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে প্রচলিত আইনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে নিজেদের খেয়াল খুশী মত আইনের ব্যাখ্যা প্রদান করেন এবং বেআইনী ভাবে অনাকাংখিত জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করেন। ফলশ্রæতিতে অতি সাধারণ নাগরিকগণ আর্থিক ও মানসিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এরকম কিছু অতি সাধারণ অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আজকের লিখার উপজীব্য।
(১) সাব-রেজিষ্ট্রার অফিসের হয়রানি ঃ-
১৯০৮ সালের নিবন্ধন আইনের ১৭ ধারা অনুযায়ী কতিপয় দলিলের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : (১) সাফকবালা দলিল (২) স্থাবর সম্পত্তির দান সংক্রান্ত দলিল (৩) মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের অধীনে হেবার ঘোষণা (৪) হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধদের ব্যক্তিগত আইনের অধীনে দান ঘোষণা (৫) উইল ব্যতীত অন্যান্য দলিল যাহা দ্বারা বর্তমানে বা ভবিষ্যতে কোন স্থাবর সম্পত্তিতে অধিকার বা স্বত্ব স্বার্থ সৃষ্টি করে অথবা অবসান করে (৬) বন্ধকী দলিল (৭) আদালতের কোন ডিক্রি বা আদেশ বা রোয়েদাদ দ্বারা বর্তমানে বা ভবিষ্যতে কোন স্থাবর সম্পত্তিতে অধিকার, স্বত্ব ও স্বার্থ সৃজন করে কিংবা অবসান ঘটায় এতদসংক্রান্ত দলিল (৮) ব্যক্তিগত আইন অনুসারে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত স্থাবর সম্পত্তির বন্টন নামা দলিল (৮) রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাসত্ব আইন ১৯৫০ এর ৯৬ ধারার অধীনে বিক্রয় দলিল (১০) দত্তক পুত্র গ্রহণের প্রাধিকার পত্র ইত্যাদি সহ আরো কিছু দলিলের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নিবন্ধন আইনের ১৭ (ক) ধারা অনুযায়ী স্থাবর সম্পত্তির বিক্রয় চুক্তি বা বায়নাপত্র নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক বটে।
আইনের সুস্পষ্ট বিধান থাকা স্বত্তে¡ও সাধারণ মানুষ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রতিনিয়ত যেসব হয়রানীর শিকার হন তা হলো :-
ক) নাবালকের সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে হয়রানির শিকার হন। মুসলিম আইন অনুযায়ী কোন নাবালকের আইনানুগ অভিবাবক এবং হিন্দু আইন অনুযায়ী কোন নাবালকের স্বাভাবিক অভিভাবক (ঘধঃঁৎধষ এঁৎফরধহ) কর্তৃক নাবালকের স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে আদালতের পূর্বানুমতির প্রয়োজন হয় না। মুসলিম আইন অনুযায়ী একজন নাবালকের আইনানুগ অভিভাবক (খবমধষ এঁৎফরধহ) হলো তার পিতা অথবা পিতা কর্তৃক উইলের মাধ্যমে নিযুক্ত কোন অভিভাবক অথবা দাদা (ঋধঃযবৎ’ং ঋধঃযবৎ)। বর্ণিত আইনানুগ অভিভাবক কর্তৃক নাবালকের স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে কোন আদালতের পূর্বানুমতির প্রয়োজন নেই। হিন্দু আইনে একজন নাবালকের স্বাভাবিক অভিভাবক (ঘধঃঁৎধষ এঁৎফরধহ) হলো তার পিতা ও মাতা। পিতার অবর্তমানে মাতা স্বাভাবিক অভিভাবক হন। হিন্দু আইন অনুযায়ী কোন স্বাভাবিক অভিভাবক (ঘধঃঁৎধষ এঁৎফরধহ) কর্তৃক তার নাবালক সন্তানের স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে আদালতের পূর্বানুমতির প্রয়োজন হয় না। হিন্দু আইন অনুসারে কোন স্বাভাবিক অভিভাবকের তার নাবলক সন্তানের শরীর ও সম্পত্তির অভিভাবক নিযুক্ত হওয়ার জন্য আদালতে দরখাস্ত বা মামলা করার প্রয়োজন নেই।
আইনের উক্তানুরূপ প্রতিষ্ঠিত বিধান থাকা সত্তে¡ও সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিষ্ট্রার অজ্ঞতার কারণেই হোক অথবা নিজে আর্থিক ভাবে লাভবান হওয়ার অসৎ উদ্দেশ্যেই হোক কোন অভিভাবক কর্তৃক তার নাবালক সন্তানের স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত দলিল নিবন্ধনে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন।
নিবন্ধন আইনের ৭৮ (ক) ও ৭৮ (খ) ধারায় কতিপয় দলিলের নিবন্ধন ফিস সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। যেমন- কোনো সম্পত্তির মূল্য অনুর্ধ্ব পাঁচ লক্ষ টাকা হলে সেক্ষেত্রে বায়নাপত্রের নিবন্ধন ফিস পাঁচ শত টাকা এবং উক্ত সম্পত্তির মূল্য পাঁচ লক্ষ টাকার উর্ধ্বে কিন্তুু অনুর্ধ্ব পঞ্চাশ লক্ষ টাকা হলে সেক্ষেত্রে বায়নাপত্র নিবন্ধনের ফিস এক হাজার টাকা এবং উক্ত সম্পত্তির মূল্য পঞ্চাশ লক্ষ টাকার উর্ধে হলে সেক্ষেত্রে বায়নাপত্র নিবন্ধনের ফিস দুই হাজার টাকা। মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের অধীনে স্থাবর সম্পত্তির হেবা ঘোষণার সম্পত্তির মূল্য যা হোক না কেন নিবন্ধনের ফিস একশত টাকা। অনুরূপভাবে হিন্দু, খ্রিস্টান, ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ব্যক্তিগত আইন অনুসারে স্থাবর সম্পত্তির দান ঘোষণার নিবন্ধন ফিস একশত টাকা স্থাবর সম্পত্তির মূল্য যা হোক না কেন। অনুরূপভাবে স্থাবর সম্পত্তি বিষয়ক বন্টন নামা দলিল নিবন্ধনের ফিস (১) সম্পত্তির মূল্য অনুর্ধ্ব তিন লক্ষ টাকা হলে পাঁচশত টাকা, (২) সম্পত্তির মূল্য তিন লক্ষ টাকার উর্ধে এবং অনুর্ধ দশ লক্ষ টাকা হলে সাতশত টাকা (৩) সম্পত্তির মূল্য দশ লক্ষ টাকার উর্ধ্বে এবং অনুর্ধ্ব ত্রিশ লক্ষ টাকা হলে এক হাজার দুইশত টাকা (৪) সম্পত্তির মূল্য বিশ লক্ষ টাকার উর্ধে এবং অনুর্ধ পঞ্চাশ লক্ষ টাকা হলে এক হাজার আটশত টাকা এবং (৫) সম্পত্তির মূল্য পঞ্চাশ লক্ষ টাকা উর্ধের হলে দুই হাজার টাকা।
আইনের উক্তানুরূপ সুস্পষ্ট বিধান থাকা সত্তে¡ও কোন নাগরিক বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন না আইন নির্ধারিত ফিস পরিশোধ করে কোনো বায়নাপত্র বা বন্টন দলিল নিবন্ধন করতে পেরেছেন। ইদানিং শোনা যাচ্ছে ব্যাংকে সম্পত্তি বন্ধক দিয়ে যারা ঋণ গ্রহণ করছেন সে সব বন্ধক দাতার নিকটও অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হচ্ছে।
অপুত্রক হিন্দু বিধবাগণ স্বামীর ত্যজ্য সম্পত্তি হস্তান্তরে দুর্ভোগের শিকার হন। ১৯৩৭ সালের ঞযব ঐরহফঁ ডড়সবহ’ং জরমযঃং ঞড় চৎড়ঢ়বৎঃু অপঃ অনুযায়ী হিন্দু বিধবা স্বামীর ত্যজ্য সম্পত্তিতে একপুত্রের সমান অংশ প্রাপ্ত হন। আর যদি কোনো পুত্র সন্তান না থাকে তবে ঐ বিধবা স্বামীর ত্যজ্য সাকুল্য সম্পত্তিতে জীবন স্বত্বে (ঙহ খরভব ওহঃবৎবংঃ) স্বত্ববান হন। জীবন স্বত্বে হলেও ঐ বিধবা আইনগত প্রয়োজনে (ঙহ খবমধষ ঘবপবংংরঃু) স্বামীর ত্যজ্য সম্পত্তি বিক্রয়ের অধিকারী হন। এক্ষেত্রে দেখা যায় যে কোনো কোনো সাব-রেজিস্ট্র্রার অজ্ঞতা প্রসূত কারণে অথবা উদ্দেশ্য মূলক ভাবে বিধবার সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল নিবন্ধনে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন।
(২) রাজস্ব অফিসে হয়রানী ঃ-
দেশের অধিকাংশ নাগরিক তাদের স্থাবর সম্পত্তির খাজনা প্রদান, খতিয়ান হালনাগাদকরণ, নামজারী ও জমা খারিজ এবং খতিয়ানের জাবেদা নকল সংগ্রহের জন্য ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় পর্যন্ত নিয়মিত যাতায়াত করেন। রাজস্ব অফিস বিষয়ে সাধারণ নাগরিকবৃন্দ নিয়মিত যে সব অভিযোগ করেন সেগুলো হলো :-
ক. সরকারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী নামজারী ও জমা খারিজ বাবদ মোট খরচ ১১০০/= টাকা। কিন্তুু প্রকৃতপক্ষে এমন একজন নাগরিক খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি বা যারা সরকার নির্ধারিত ফিস দ্বারা জমির নামজারী ও জমা খারিজ করতে পেরেছেন।
খ. বেশ ক’ বছর যাবৎ নামজারী রিভিউ নামক সহজ পদ্ধতিটি একশ্রেণির ভূমিখোর লোকের নিকট পূর্বতন খরিদ্দারগণকে হয়রানী করার মোক্ষম অস্ত্র হয়ে উঠেছে। দেখা যায় যে কোনো খরিদ্দার প্রকৃত মালিক বা তার উত্তরাধিকারী হতে বহু পূর্বে জমি খরিদ করে আইনানুগ পদ্ধতিতে নিজ নামে নামজারী করিয়েছেন। একশ্রেণির সুযোগ সন্ধানী ভূমিখোর শ্রেণীর লোক মূল মালিকের দূরবর্তী কোন ওয়ারিশ হতে একই জায়গা সম্পর্কে দলিল করে অথবা দলিল করার লক্ষ্যে দীর্ঘদিন পর নামজারী রিভিউ দায়ের ক্রমে হয়রানী করেন। তামাদির মেয়াদ ত্রিশ দিন হওয়া সত্বেও দশ বছরের অধিক কাল অতিবাহিত হয়েছে এরকম নামজারীর ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) নামজারীর রিভিউ দরখাস্ত গ্রহণ ও নিষ্পত্তি করেন।
গ. অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পন আইন ২০০১ এর দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে ‘খ’ তপশীল ভূক্ত অর্পিত সম্পত্তির তালিকা বাতিল করা হয়েছে। এমনভাবে বাতিল করা হয়েছে যে ঐ সম্পত্তি কোনদিনই অর্পিত সম্পত্তি ছিল না। ‘খ’ তপশীল ভূক্ত অর্পিত সম্পত্তি মূল মালিক বা তার উত্তরাধিকারী বা তার স্বার্থাধিকারী (ঝঁপপবংংড়ৎ রহ রহঃবৎবংঃ) এর নামে নামজারী করার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এতদ্সত্বেও সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) ঐ সম্পত্তি নামজারী ও জমা খারিজ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন।
ঘ. হিন্দু বিধবা তার স্বামীর ত্যজ্য সম্পত্তি সম্পর্কে নিজ অংশ অনুসারে পৃথক খতিয়ানে নামজারী ও জমা খারিজ করার অধিকারী হন। দেখা যায় যে, কোনো কোনো সহকারী কমিশনার (ভূমি) অজ্ঞতার কারণেই হোক কিংবা উদ্দেশ্যমূলক ভাবেই হোক হিন্দু বিধবার প্রাপ্য সম্পত্তি তার নামে পৃথক খতিয়ানে নামজারী ও জমা খারিজ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন।
ঙ. রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাসত্ব আইন ১৯৫০ এর অধীনে চূড়ান্ত ভাবে প্রকাশিত এস.এ ও আর এস খতিয়ান সাক্ষ্য আইনের ৭৪ ধারা অনুসারে সরকারি দলিল (চঁনষরপ উড়পঁসবহঃ) বটে। বেঙ্গল রেকর্ডস ম্যানুয়েল অনুসারে দেশের যে কোন নাগরিক ঐ সকল ডকুমেন্টস পরিদর্শন করার এবং জাবেদা নকল উত্তোলনের অধিকারী হন। বিগত বেশ বছর যাবৎ সুনামগঞ্জ কালেক্টরেটে এক অলিখিত নিয়ম চালু করা হয়েছে। ঐ অফিস হতে ১নং খাস খতিয়ানের কোন জাবেদা নকল বা এতদসংক্রান্ত কোন তথ্য কোনো নাগরিককে প্রদান করা হয় না। ফলশ্রæতিতে অনেকেই আইন সংগত প্রতিকার লাভে ব্যর্থ হন। সদাশয় জেলা প্রশাসক মহোদয় একটু খোঁজ নিয়ে দেখবেন কি কোন আইনের আওতায় ১নং খতিয়ানের জাবেদা সকল সরবরাহ করা হয় না ?
এছাড়াও আরো অনেক দাপ্তরিক হয়রানি আছে। স্বল্প পরিসরে একসাথে সবকিছু আলোচনা করা সম্ভব নয়। মূলত যে সব ক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিকবৃন্দ আইন থাকা সত্বেও দাপ্তরিক হয়রানির শিকার হন সেগুলোই আলোচিত হলো। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তাগণ একটু মানবিক এবং সচেতন হলেই উপরোক্ত নাগরিক দুর্ভোগ এড়ানো সম্ভব হবে। নতুবা সরকারি কর্মকর্তাদের জনসেবা করার বিষয়টি কেবল শ্লোগান হয়েই থাকবে। বাস্তবে কার্যকর হবে না।
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী।