সরকারের কাছে পূজা উদযাপন পরিষদের ৮ দাবি

সু.খবর ডেস্ক
সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে শারদীয় দুর্গপূজা উদযাপনকালে ‘সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, হত্যা, নির্যাতনের’ ঘটনায় কঠোর নিন্দা ও গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ। একই সঙ্গে ভুক্তোভোগীদের ক্ষতিপূরণ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তায় ৮টি দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
শুক্রবার রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে ‘শারদীয় দুর্গাপূজায় সারাদেশের পূজাম-পে সাম্প্রদায়িক শক্তির হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও হত্যা’র বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য তুলে ধরেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নির্মল কুমার চ্যাটার্জী।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘প্রশাসন সময়পোযোগী পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং রাজনৈতিক দলসমূহের আপাত নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছি। বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একাধিক মানুষকে সহিংসতার বলি হতে হয়েছে। যারা পরিবারের আপনজনকে হারিয়েছে বা সম্পদ হারিয়েছে তা আর ফেরত পাওয়া যাবে না। আমরা তাদের প্রতি আন্তরিক সহানুভূতি ও সহমর্মিতা জানাই।’
‘সম্পদের যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণে এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের পূর্ণ নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার আশা’য় সরকারের কাছে কয়েকটি দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
দাবিগুলো হলো- ১. ক্ষতিগ্রস্ত সব মন্দির, বাড়িঘর সরকারি খরচে পুনর্র্নিমাণ করে দিতে হবে। গৃহহীনদের দ্রুত পুনর্বাসন করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ২. নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ব্যবস্থা নিতে হবে। ৩. দলমতের ঊর্ধ্বে থেকে বিশেষ ট্রাইবুনালে প্রকৃত দোষীদের বিচারের পদক্ষেপ নিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কোনো ক্ষেত্রেই নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা যাবে না। ৪. সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় প্রকৃত তথ্য উদঘাটনের জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে এবং তদন্ত কমিশনের প্রকাশিত রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। ৫. হিন্দু ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে তা প্রতিবিধানে সরকারের স্পষ্ট বক্তব্য ও পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি করছি। ৬. ২০০১ সালের সাম্প্রদায়িক ঘটনাসমূহের ওপর তদন্ত সম্পর্কিত সাহাবউদ্দিন কমিশন রিপোর্টের পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। ৭. একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত সংখ্যালঘু ও ধর্মীয় নৃগোষ্ঠীর বিষয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি, সংখ্যালঘু বিশেষ সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, অর্পিত সম্পত্তি প্রকৃত স্বত্বাধিকারীর কাছে ফেরত দেওয়া, সংখ্যালঘু ও ধর্মীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্যমূলক আইনের অবসানসহ ইশতেহারে ঘোষিত অন্যান্য প্রতিশ্রুতিগুলোও সরকারের এই মেয়াদে বাস্তবায়ন করতে হবে। ৮. সংবিধানে বিরাজমান অসংগতি দূর করে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ১৯৭২ এর সংবিধান পূর্ণবাস্তবায়ন করতে হবে।
এ সময় আগামী ৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য হিন্দু সম্প্রদায়ের শ্যামাপূজা ও দীপাবলী উৎসব নিয়ে কয়েকটি সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, শ্যামাপূজা গভীর রাতে হয়ে থাকে। এই পূজার সংখ্যা শারদীয় দুর্গাপূজার সংখ্যার চাইতে বেশি হয়ে থাকে। শারদীয় দুর্গাপূজায় সাম্প্রদায়িক অপশক্তির নারকীয় তা-ব ও বিরাজমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তাহীনতার কারণে- ক. এবারের শ্যামাপূজা সংশ্লিষ্ট মন্দির কর্তৃপক্ষের ইচ্ছানুযায়ী প্রতিমা বা ঘটে করা হবে এবং একাধিক দিনের অনুষ্ঠান পরিহার করতে হবে। খ. এবারের শ্যামাপূজায় দীপাবলীর উৎসব বর্জন করা হবে। ৩. সন্ধ্যা ৬টা থেকে ১৫ মিনিটে কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে দর্শনার্থী ও ভক্তরা স্ব স্ব মন্দিরে নীরবতা পালন করবে। ঘ. মন্দির/ম-পের দ্বারে কালো কাপড়ে সহিংসতাবিরোধী শ্লোগান ‘সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াও’ সংবলিত ব্যানার টাঙিয়ে দিতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে কুমিল্লার নানুয়া দীঘির দুর্গাপূজার ম-পে সৃষ্ট ঘটনা নিয়ে কিছু প্রশ্ন করে পূজা উদযাপন পরিষদ। লিখিত বক্তব্যে নির্মল কুমার চ্যাটার্জী বলেন, কুমিল্লা নানুয়া দীঘিপাড়ের ম-পটি অস্থায়ী। ওই দিন রাত তিনটা থেকে চারটার দিকে কিছু সময়ের জন্য ম-প এলাকা বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কী কারণে কিছু সময়ের জন্য ম-প বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল সে বিষয়গুলো তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে? থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হনুমান মূর্তির কোলের ওপর রাখা পবিত্র কোরআন শরিফটি সরিয়ে নেওয়ার পর কেন ভিডিও করার সুযোগ দিলেন এবং কেন সে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে তা সবার কাছে বিরাট প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মিলন কান্তি দত্ত। তিনি বলেন, আমাদের অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় কিন্তু সেগুলো রক্ষা করা হয় না। রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক দোষারোপ স্থিতিকে আরও নাজুক করে দিয়েছে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন- বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাবেক সভাপতি কাজল দেবনাথ, পূজা উদযাপন পরিষদের উপদেষ্টা জয়ন্ত সেন, মহানগরের উদযাপন পরিষদের
সূত্র : সমকাল