সরস্বতী পূজা আজ

স্টাফ রিপোর্টার
সরস্বতী শব্দটি ‘সার’ এবং ‘স্ব’ দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। সেই অনুসারে সরস্বতী শব্দের অর্থ যিনি কারো মধ্যে সারজ্ঞান প্রকাশ করেন। আবার সরস্বতী শব্দটি সংস্কৃত ‘সুরস বতি’ শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থ হচ্ছে জলের আধার। সরস্বতী সাক্ষাৎ দেবী মূর্তি এবং নদী-দুইরূপেই প্রকটিত। ঋগবেদে (২/৪১/১৬) বর্ণনা করা হয়েছে-
অম্বিতমে নদীতমে সরস্বতী।
অপ্রশস্তা ইব স্মপ্রিশস্তিমন্ব নস্কৃধি।।
অর্থাৎ মাতৃগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, নদীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, দেবীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হে সরস্বতী, আমরা অসমৃদ্ধের ন্যায় রয়েছি, আমাদের সমৃদ্ধশালী করো।
বিদ্যার দেবী শ্রীশ্রী সরস্বতী পূজা আজ বৃহস্পতিবার। বিদ্যা ও জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীর চরণে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করবেন অগণিত ভক্ত। বিভিন্ন পূজাম-প দেবী সরস্বতীর বন্দনায় ঢাক-ঢোল-কাঁসর, শঙ্খ ও উলুধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠবে। শাস্ত্রমতে, প্রতিবছর মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে কল্যাণময়ী বিদ্যাদেবীর বন্দনা করা হয়।
সরস্বতী দেবী শ্বেতশুভ্রবসনা। দেবীর এক হাতে বেদ, অন্য হাতে বীণা। এ জন্য তাকে বীণাপাণি বলা হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতে, দেবী সরস্বতী সত্য, ন্যায় ও জ্ঞানালোকের প্রতীক। বিদ্যা, বাণী ও সুরের অধিষ্ঠাত্রী। অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করতে কল্যাণময়ী দেবীর চরণে ‘সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে/বিশ্বরূপে বিশালাক্ষী বিদ্যংদেহী নমোহস্তুতে’ এই মন্ত্র উচ্চারণ করে বিদ্যা ও জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রণতি জানানো হবে।
সরস্বতী জ্যোতির্ময়ী অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তিনি বাগদেবী। সরস্বতী নদীর তীরে দেবীর স্তোত্র ও আরাধনার মাধ্যমে বেদধ্বনি হতো বলে এই নদী বাগদেবীর বাসস্থান বলে অভিহিত। নদী অর্থে তিনি পবিত্র তোয়া সঙ্গীতময় ও সুন্দর স্তোত্রের উদ্বোধনকারী। বাগদেবী অর্থে তিনি মানবহৃদয়কে পবিত্র করেন। তিনি সুন্দর ও মর্ত্যবাক্যের প্রেরণকাত্রী। তিনি মহাসমুদ্রের মতো পরমাত্মার প্রকাশ করেন। তিনি সমুদয় মানব-মানবীর হৃদয়ে জ্যোতি সঞ্চারিত করেন। পরমাত্মার মুখ থেকে তার আবির্ভাব।
দেবী সরস্বতী পরমেশ্বরের গুণের প্রকাশ। বেদ অনুসারে নিরাকার ব্রহ্ম যখন বিদ্যা দান করেন তখন সেই গুণকে সরস্বতী বলা হয়। প্রাচীন কালে ব্রহ্মের এই গুণ অনুসারে পৌরাণিকগন একটি নারীর রূপ প্রদান করেন। যাকে আমরা স্থূল অর্থে ব্রহ্মার স্ত্রী বলে মনে করি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ব্রহ্মার স্ত্রী বলে কিছু নেই। এমন কি ব্রহ্মা বলেও আলাদা কোনো সত্তা নেই। পৌরানিক বিশ্লেষন অনুসারে দেবী সরস্বতীর গায়ের রং হয় সব সময় সাদা বা শ্বেত-শুভ্র জাতীয়। দেবী সরস্বতীর শুভ্রমূর্তি আসলে নিষ্কলুষ চরিত্রের প্রতীক। এটা এই শিক্ষা দেয় যে, প্রত্যেক ছেলে মেয়েকে হতে হবে নিষ্কলুষ নির্মল চরিত্রের অধিকারী। যে ছেলে মেয়ে বাল্যকাল থেকে নিজেকে নিষ্কলুষ রাখার চেষ্টা করবে, সে যে সারা জীবন তার সকল কর্ম ও চিন্তায় নিজেকে নিষ্কলুষ রাখতে পারবে, তাতে তো আর কোনো সন্দেহ নেই।
মাতা সরস্বতীর পূজায় আর একটি অন্যতম লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে দেবী সরস্বতীর সাথে থাকা রাজহাঁস। রাজহাসেঁর মধ্যে এমন ক্ষমতা আছে যে, এক পাত্রে থাকা জল মিশ্রিত দুধের থেকে সে শুধুমাত্র দুধ শুষে নিতে পারে। মাতা সরস্বতী যেহেতু শিক্ষার্থী সংশ্লিষ্ট পূজা সেই প্রেক্ষাপটে এটা বলা যেতে পারে যে, রাজহাসেঁর এই তথ্য শিক্ষার্থীদেরকে এই শিক্ষা দেয় যে, সমাজে ভালো মন্দ সব কিছুই থাকবে, তার মধ্যে থেকে তোমাদেরকে শুধু ভালোটুকু শুষে নিতে হবে। অধিকাংশ হিন্দু ছেলে-মেয়েরা যে মেধাবী এবং চরিত্রবান বা চরিত্রবতী, সরস্বতী পূজা এবং তার রাজহাঁসজনিত এই শিক্ষাই তার কারণ।
সরস্বতীর হাতের বীণা হচ্ছে শিল্পকলার প্রতীক। হাতে থাকে পুস্তক এবং সরস্বতী পূজাতেও বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক দিতে হয়। পুস্তক যে জ্ঞানের আশ্রয়, এটা তো আর নতুন কোনো কথা নয়। পূর্ণ বিকশিত একটি পদ্মফুলের উপর সরস্বতীর বসে থাকার মানে হলো- সরস্বতীর আদর্শকে লালন করে নিজের জীবনকে বিকশিত করতে পারলে সেই জীবনও ফুলের মতোই পবিত্র, সুন্দর, বিকশিত ও সমৃদ্ধ হবে। স্বয়ং ঈশ্বর হলেও সরস্বতী নারী মূর্তি অর্থাৎ মাতৃমূর্তি, এর কারণ হলো- পিতার চেয়ে মায়ের কাছে কোনো কথা বলা সহজ বা কোনো কিছু চাওয়া সহজ। সরস্বতীর পূজারীরা যেহেতু সাধারণভাবে শিশু বা বালক-বালিকা অর্থাৎ শিক্ষার্থী, তাই তারা যাতে সহজে নিজের মনের কথা নিজের মনের আকুতি, দেবী মায়ের কাছে জানাতে পারে, এজন্যই সরস্বতীকে কল্পনা করা হয়েছে মাতৃরূপে।