সাদা ড্যাগা

সজল কান্তি সরকার
গিরস্তের পুত-হেমন্তে করে জ্যুত, বরষায় খেলে কুত্কুত্। বৃষ্টিভেজা সকালে আষাঢ়ের উঠোন যখন বিকেলের রোদে ভেজামাটি চুষে টানটান হয়ে থাকে গিরস্তের পুতেরা তখন মাটিতে কুত্কুত্রে ঘর এঁকে গুটি’র দান মারে। খাল পার হয়ে পশ্চিমপাড়ার জিয়া তখন পুবপাড়া আসে তামাল গুটি নিয়ে ‘ডাগদৌড়’ আর ‘বীজদৌড়’ খেলতে। নাকসই তার হাতের নিশানা। ঠুনাভরা গুটির মালিক সে। তার খেলার সুনামে আনাম গাঁও পঞ্চমুখ। গুটিহীন খেলোয়ার অনেকেই তার গুটিবাহক। আজ্ঞাবাহকও বটে। মাগনা মগজ খাটায় জিয়ার পক্ষে। কেউ কেউ জিয়ার গুটি চুরিদারি করে গুটিওয়ালা হয়। আমি তখন পাকা খেলোয়াড় না। বয়সও কম, তাই কুত্ কুত্ খেলি। একদিন কায়েশ হল তমালগুটি খেলতে। তাই বন্ধু-বান্ধবসহ স্কুলবাড়ির তমালগাছ থেকে নৌকার ‘ডরা’ ভরে তমাল নিয়ে এলাম। যারা নৌকা ‘বাইছে’ তাদেরকেও কিছু দিলাম। তমালের বাকল ছাড়ানোর জন্য গোররের নীচে রেখে দিলাম কিছুদিন। বাকল পঁচে গেলেই খেলার গুটি তৈরি হবে। এই কথা জিয়াও তার তলপিবাহকদের কানে চলে গেছে। তাই আমরা সাবধান। গুটির প্রতি নজর রাখি। চুরি হতে পারে।
স্কুলে যাওয়া এখন নানা অজুহাতে বন্ধ। ‘বান-তুফানে ইস্কুলে গিয়া কিতা অইব? বাঁচলে গিরস্ত অইব।’ -এই কথা গাঁয়ের সবাই কয়।
বড়’ বেটাইনেও আলগঘরে তাস খেলে। বেট্টাইনে কড়ি খেলে, আমরা খেললে দুষ কি? তাই সকল মহলেই খেলা জমছে। কিছুদিন পর গোবর থেকে গুটি তুলে নিলাম। অনেক কষ্টে তমালের বাকল ছাড়াই। আমি এখন এক কলসি গুটির মালিক। তিন কলা, চার কলাবিশিষ্ট শক্ত শক্ত গুটি। কোনটা বাদামী, কোনটা ধূষর, কোনটা কালো রঙের। ছোট, বড়, মাঝারিসহ নানা রকমের গুটি। মাটির কলসী ভরে পানি দিয়ে গুটি ডুবিয়ে রেখেছি ভারী হওয়ার জন্য। গুটি ভারী হলে দান মারতে বেশ সুবিদা হয়।
তারপর একদিন জিয়ার সাথে দান মারতে শুরু করি। মাঝে মাঝে দু’একটি দান জিতলেও শেষ পর্যন্ত ‘রাঢ়ী’ হয়েই বাড়ি ফিরি। আমার সাথে যারা ছিল সকলেরই এক অবস্থা। জিয়ার হাত যেমন-তেমন, একটা ‘ড্যাগা’ আছে তার সেইরকম! ড্যাগদৌড়, বীজদৌড়, গাত্তুয়া ও নৈ যাই খেলি না কেন তার কাছে হারতেই হয়। আমার পক্ষের দু’একজন ঘাঢ়ে গামছা ঝুলিয়ে এখন জিয়ার গুটিবাহক হয়ে গেছে। আমার ভা-ে আর গুটি নাই। তাই সুযোগ বুঝে আবার একদিন নৌকা নিয়ে চলে গেলাম ইস্কুলবাড়ি। এ সুযোগ জিয়ার নেই। কেননা এ গাঁয়ে আমার বাবাই কেবল নৌকার মালিক। তমাল গাছটাও আমাদের। তাই এবার নৌকার দুই ডরা ভরে তমাল নিয়ে এলাম। অনেক গুটি। হাত পাকা করতে গোপনে গোপনে আমরা গুটি টুকাটুকির মহড়া শুরু করলাম। একটা ছোট কালো ড্যাগা পেলাম এবার। টুকা দিলে খুব দৌড়ায়। তাই সবাই সিদ্ধান্ত নিলাম জিয়ার সাথে এবার ড্যাগদৌড় খেলব। আলোচনা সাপেক্ষে খেলা শুরু হল। জিয়া হেরে গেল। আমরা খুশি। পরদিন আবার খেলা শুরু। জিয়ার তলপিবাহকরাও কেউ কেউ আজ পরিকল্পিত ভাবে খেলায় উঠলো। আমি একা। এক পর্যায়ে আমি বেশি বেশি দান পেতে শুরু করলাম। আমার ড্যাগা সবার নজরে পড়ল। তাই জিয়া সিদ্ধান্ত নিল। খেলার পদ্ধতি পরিবর্তন করবে। আমি রাজী না হওয়ার এদিনের মত খেলা এখানেই শেষ হল। পরদিন সকালে জিয়ার পক্ষ থেকে লোক এসে বললো খেলা হবে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্তে। সে সিদ্ধান্ত দেবে উভয় পক্ষের লোকজন। প্রয়োজনে লটারী হবে। নীতিগত কথা। তাই আমরা মেনে নিলাম। পরদিন যথারীতি সকাল থেকে খেলা শুরু হল। লটারীতে ড্যাগদৌড় খেলার সিদ্ধান্ত হলো। খেলা চললো বিরামহীন। আমার ড্যাগার কাছে জিয়া ড্যাগা অসহায় হয়ে গেল। এক পর্যায়ে দূপুরের খাবারের বিরতির পর আবার নতুন উদ্যোমে খেলা শুরু হল। দর্শক এখন আমাদের দলে মগজ খাটায়। বুদ্ধি দেয়। অর্থাৎ জিতের নাও। জিয়ার তলপিবাহকগণ কেমন জানি রাগে গ্যাত্গুত্ করছে। জিয়াও ক্রুধে ঘাঢ় ফুলিয়ে বাতাসে মাটি কুড়ছে। তাই খেলায় দানে-দানে গুটির পরিমান একের পর এক বাড়িয়ে ধরছে। খেলার আবার নিয়ম আছে, যে হারবে তার সিদ্ধান্তে পরবর্তি দানে গুটির পরিমান নির্ধারণ হবে। তাই এবার জিয়ার সিদ্ধান্ত দিল বিশগুটির দান। অর্থাৎ উভয় পক্ষ মিলে চল্লিশগুটি। প্রথমে জিয়া দান মারল। কাজ হল না। সকলেই চিন্তায় আছে। এত বড় দান কখনও হয়নি। দু’হাতে দান মারতে হয়। তাই আমি ড্যাগা পাশেই মাটিতে রেখে দু’হাতে দান ছুড়লাম। দানে টুক্কার বীজগুটি নির্নয় হল। এবার ড্যাগ দিয়ে টুক্কা দেয়ার পালা। কিন্তু আমি ড্যাগা খুঁজে পাচ্ছি না। ড্যাগা উধাও হয়ে গেল। আমারা বলছি জিয়া ড্যাগা গুম করেছে! তারা বলছে খেলা বন্ধ করতে এটা আমাদের চালাকি। খেলায় হৈ চৈ বেধে গেল। অনেক খোজাখুঁজি করেও শেষ পর্যন্ত ড্যাগা পাওয়া গেল না। অমীমাংসিত ভাবে দানগুটি তৃতীয় পক্ষের কাছে জমা রেখে খেলা শেষ হল।
তারপর থেকে ড্যাগা ছাড়া আমি আর কখনও খেলায় জিততে পারিনি। তমাল গুটি ও জনগণ এখন তার দখলে। জিয়ার ড্যাগা এখন খেলার আতঙ্ক। এভাবে বেশ দিন গেল। একদিন তার ড্যাগা’টি গুম হয়ে গেল। আমরা মহাখুশি। এখন সমানে-সমান খেলা চলে। মাঝে মাঝে দিন শেষে আমাদেরও লাভ হয়। ড্যাগা ছাড়া জিয়া খেলতে সুবিধা পাচ্ছে না। তমালগুটি তার কমে গেল। সংগ্রহ করবারও উপায় নেই। তাই মত পাল্টাল। সিদ্ধান্ত নিল এখন থেকে মার্বেল খেলবে। তার বাবার টাকা আছে। তাই কষ্ট করে তমাল সংগ্রহের চেয়ে মার্বেল কেনাই ভাল। কি আর করি! টাকা-পয়সার কারবার শুরু হয়েছে। এক ডজন মার্বেলের দাম একটাকা। বাবারে বাবা! আট-আনা কেজি লবন,ক’জনের সাধ্য আছে মার্বেল খেলার? তাই আমরা নিজরা নিজেরা তমাল খেলেই দিন কাটাই। একদিন আমার সাথীরা খুব করে আমাকে বলল, মার্বেল খেলতে। কি করি! মেনে নিলাম। তাই এক টাকার মার্বেল কিনে মার্বেলের গতিবিধি বুঝার আগেই জিয়ার কাছে হেরে গেলাম। কিন্তু সাহসটা বেড়ে গেল। খারাপ কাজটাও শিখে গেলাম। আমাদের পুর্বপাড়ায় মার্বেল খেলা কেউ পছন্দ করে না, তবুও চুরিদারি করে দু’চার দান খেলা হয়। একদিন তো খেলতে গিয়ে টাকা-পয়সার অযুহাত এনে মইনচাচা-জিয়া এবং আমাকে গৈল ঘরে বেঁধে রাখে। অন্যেরা তখন ভালোমানুষ হয়ে যায়। কেউ কেউ বগল বাজিয়ে আনন্দ করে। কিছুদিন পর চাচা বিদেশ চলে গেলে আমরা আবার খেলতে শুরু করি। তলপিবাহকরাও তখন গা ঘেষতে শুরু করে।
একদিন আমি মামার বাড়ি থেকে বেশ কিছু মার্বেল ও একটি সাদা ড্যাগা নিয়ে আসি। সবাই মহাখুশি। ড্যাগা নিয়ে স্বপ্নের শেষ নেই। খেলা শুরু। প্রতিদিনেই জিয়া খেলাতে হেরে যায়। মার্বেলে আমার পুটলি ভরে গেছে। মাঝে মাঝে আমি মার্বেল দান-খয়রাতও করি। জিয়া এখন দিশেহারা। আমার ড্যাগা গুম করার জন্য অনেক চেষ্টা করেও সে ব্যর্থ হয়। গোপনে গোপনে আমাকে বেশ ক’বার হামলাও করে। কাজের কাজ হয় না। তাই জিয়ার সাথে খেলা বন্ধ করে নিজেরা নিজেরাই শান্তিপূর্ণভাবে ঢংগাঢঙ্গি খেলে সময় কাটাই। এ নিয়ে খেলোয়ার মহলে নানা সমালোচনা শুরু হয়। খেলার সাহস নাই-ইত্যাদি, ইত্যাদি। তাই পুণরায় জিয়ার সাথে খেলার সিদ্ধান্ত নিলাম। একটু ভিন্ন কৌশলে। জিয়া শর্ত দিল সাদা ড্যাগা দিয়ে সে খেলবে না। আমরা বললাম-এমন আপত্তি পূর্বে আমরাও করেছিলাম তুমি রাজি হওনি তাই এখন এসব কথা বলা নিয়ম পরিপন্থী। অগণতান্ত্রিক। তাই জিয়ার সাথে আর খেলা হয় না। এ দিকে তলপিবাহকদের আবার মন খারাপ। খেলা না হলে মার্বেল চুরিদারি কিংবা মগজদালালি বন্ধ থাকে। তাই খেলা নিয়ে সবাই আমাকে মন্দ বলছে। সুনাম নষ্ট হচ্ছে। তাই ভাবছি -মার্বেল হাতে নিয়ে ঘরে বসে খেলোয়ার হয়ে কি লাভ? কুত্ কুত্ খেলা বা তমালগুটি খেলারও বয়স পার হয়ে গেছে! তাই আমি নতুন সিদ্ধান্ত নিলাম। ড্যাগা আমার থাকবে প্রয়োজনে আমি দানে দুইগুটি দেব, জিয়া দেবে একগুটি। অর্থাৎ আমার এ ড্যাগার জন্য তাকে কিছুটা ছাড় দেব। এ নিয়ে উভয় পক্ষ আলোচনায় বসার দিন তারিখ ঠিক করলাম। তারপর যথারীতি একদিন সন্ধ্যায় আমরা আলোচনায় বসলাম কিন্তু কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হল না। তাই পূণরায় আলোচনা হবে সিদ্ধান্ত নিয়ে সভা শেষ হল। তারা চলে গেল। কিন্তু তাদের ভাব-সাব দেখে আমাদের মনে হল জিয়া আমাদের শর্তে রাজী হবে। তাই আমরা নিজেরা দুই-একগুটি দানের সিদ্ধ্যান্তেই অনড় থাকলাম। আমার দলের সবাই যার যার মত রাড়ি ফিরে গেল। আমি রাতের খাবার খেয়ে মার্বেলগুলোতে হাত বুলিয়ে ড্যাগাটি বালিশের নিচে যতœ করে রেখে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুমের ঘুরে স্বপ্ন দেখলাম জিয়ার সঙ্গে দুই-এক দান খেলছি। জিয়া দানে দানে হারছে। একবার একটি বড়দান ধরলাম। আমি দান ফেলে সাদা ড্যাগায় যখন জোড়ে টুক্কা দিলাম ড্যাগা দৌড়ে অনেক দূরে চলে গেল। চারপাশে সবাই হাততালি দিতে লাগল। এদিকে ‘কাউয়া’ এসে আমার সাদা ড্যাগাটি ডিম ভেবে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল। আমি অসহায়ের মত তাকিয়ে রইলাম। আমার কেউ কাউয়ার পিছনে ছুটবে তো দূরের কথা একটি ডিলও ছুড়ল না! আমি ড্যাগা হীন হয়ে গেলাম। সবাই শান্তনা দিল – আমরা আছি, ভয় নাই। ইত্যাদি, ইত্যাদি। কি আর করি! খেলার নিয়ম ভঙ্গ করা তো যায় না! তাই ড্যাগা ছাড়া দ্বিগুন লোকসানে জিয়ার সংগে খেলায় হারতে থাকলাম। আমি ‘রাঢ়ী’ হয়ে গেলাম। চেয়ে দেখি সবাই জিয়া তলপিবাহক হয়ে বগল বাজিয়ে আনন্দ করছে। এমন সময় হঠাৎ দরোজায় কড়া নাড়ার শব্দে ঘুম ভাঙ্গল। জেগে দেখি জিয়ার লোকজন দলবেঁধে খেলার চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানতে এসেছে। আমি বালিশের নীচ থেকে সাদা ড্যাগা হাতে নিয়ে চুমু খেলাম। মার্বেলগুলো দেখে নিলাম ঠিকটাক আছে কিনা। আর ভাবছি- দরজা খোলে ওদেরকে কি বলব?
লেখক- গল্পকার ও কলামিষ্ট।