সাবাশ বাংলার বাঘিনিরা

মেয়েরা শুধু কথায় এগিয়ে যাচ্ছে না। তাঁরা দীপ্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে যাচ্ছে শিক্ষায়, পেশায়, ক্রীড়ায়; সবকিছুতে। ক্ষেত্রবিশেষে ছেলেদের চাইতেও বাংলার দামাল মেয়েরা এখন অনেক বেশি অগ্রগামী। সুদূর মালয়েশিয়ার সবুজ দুর্বাভরা মাঠে বাংলার মেয়েরা রচনা করেছে এক ঐতিহাসিক কীর্তিগাঁথা যা একই সাথে আনন্দের, গৌরবের এবং অহংকারের। তারা এশিয়া কাপ নারী ক্রিকেটে রবিবার শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ভারতকে ৪ উইকেটের ব্যবধানে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নের গৌরব মুকুট মাথায় পরিধান করেছে। যে কাপ জিততে পারেনি ছেলে ক্রিকেটাররা সেই কাপ মেয়েরা জিতে বুঝিয়ে দিল তারা কতদূর অবধি যেতে পারে। ভারত শুধু এশিয়ার ক্রিকেটে নয় বিশ্ব ক্রিকেটেই সমীহ জাগানো এক দল। এই দলকে হারাতে ইস্পাতদৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়ে শেষ বল পর্যন্ত লড়াই করে যেতে হয়েছে বাংলার নারী ক্রিকেটারদের। এবং এই দৃঢ় সংকল্পের এমন সমীকরণ হয়েছিল যেখানে শেষ বলে দরকার ছিল ২ রান, জেতার জন্য। এমন অবস্থায় যে কেউ জিতে যেতে পারে। জিতবে তারাই যাদের ¯œায়ুতন্ত্রের জোর বেশি তারা। জাহানার আলমের অদম্য লড়াইয়ে ওই দুই রান অনায়াসে চলে আসে। এই লড়াকু বাংলাদেশি নারীরা ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছাতে হারিয়েছে এশিয়ার বাঘা বাঘা সব দলকে। পাকিস্তান ও ভারতের মতো দলকে হারায় তারা লীগ লড়াইয়ে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের নিকনেম টাইগার (নারীদের ক্ষেত্রে এটি টাইগ্রেস) শব্দটির যথার্থতা তাঁরা প্রমাণ করেছে। তাই টুপি খোলা অভিনন্দন বাংলার বাঘিনিদের।
এই যে নারী ক্রিকেটাররা বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের বিজয় পতাকা উড়াল তারা কিন্তু জাতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কাছে ব্রাত্য এক দলই। ছেলে ক্রিকেটাররা এখন যে ধরনের সুযোগ সুবিধা বোর্ড থেকে পাচ্ছেন তার ছিটেফোটাও জুটছে না নারী ক্রিকেটারদের বেলায়। নারী ক্রিকেটাররা কোন সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামোর আওতায় আসতে পারেননি এখনও। আমরা অবাক বিষ্ময়ে লক্ষ্য করছি, এশিয়া কাপে শক্ত প্রতিপক্ষকে হারিয়ে একের পর এক ম্যাচ জিতে চললেও দেশীয় গণমাধ্যমে সেই খবর অবহেলার সাথে পরিবেশন করা হয়েছে। ছেলে ক্রিকেটারদের নিয়ে গণমাধ্যমগুলো যে ধরনের ক্রেজ তৈরি করে সেখানে নারী ক্রিকেটারদের নিয়ে তাদের কোন আগ্রহই নেই। তাই সালমা, রুমানা, নিগার সুলতানা, শামীমা, আয়েশা, ফারজানা, ফাহিমা, সানজিদা, জাহানারা, খাদিজা, নাহিদাদের পরিচিতি তেমন করে গড়ে উঠেনি। এই নারী ক্রিকেটারদের মধ্যে কেউ সাকিব, মোস্তাফিজ বা মাশরাফির মতো তারকা প্রচার পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেননি। এই ধরনের অবহেলা আমরা নারী ফুটবলারদের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করেছি। বিদেশে দেশের সম্মান অর্জনকারী নারী ফুটবলারদের লোকাল বাসে করে বাড়ি ফিরার বিড়ম্বনাজনক খবরও আমাদের জানা। কেন এই অবহেলা ? নারী বলে ? এমন বিজয়ের পরও যদি মানসিকতায় বিরাজমান লিঙ্গ বৈষম্যের অবসান না ঘটাতে পারে তাহলে আমাদের জাতিগত সুনামই নষ্ট হবে।
মূলত লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য যেকোন জাতিকে পিছিয়ে রাখে। কাউকে পুরুষ বলে অহেতুক আলিঙ্গন আর কাউকে নারী বলে দৃষ্টিককটুভাবে বর্জন করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসাটাই আধুনিক এবং প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির মূল চাহিদা। এখানে যোগ্যতা অনুসারে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যোগ্যকে সম্মান জানাতে হবে, তাঁকে যথাযথ আসন দিতে হবে। নারীবাদীতার তথাকথিত ফ্যাশন নয়, দরকার নারীকে মানুষ ভাবার মতো পরিবেশ তৈরি। তাহলেই সালমা-রুমানাদের হাতে যে বিজয়কীর্তি রচিত হলো এমন বহু কীর্তিই সামনে রচিত হতে থাকবে।