সাহিত্যে ভাষা আন্দোলন

সজীব দে
ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সকল আন্দোলনে বাঙালিরা প্রেরণা খুঁজে নিয়েছে ২১শে থেকে। সাম্প্রদায়িকতা বিরোধীতা ক্রমে ক্রমে পরিণত হয়েছিল ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে। যার পরিণতি লাভ করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে ২৩ বছরের শোষণ-বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে আমরা লাভ করি বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন দেশ।
ভাষা আন্দোলন শুধু রাজনীতি নয়, সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও প্রভাব ফেলেছিল। রক্ত দিয়ে শহীদের মান রাখার কথা বলেছিলেন বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিম।
‘মুখের বোল কাইড়া নিবে
রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে
আমরা মায়ের ভাষায় কথা বলবো
প্রয়োজনে রক্ত দেবো
জীবন দিয়ে বাংলা রাখবো
ঢাকার বুকে রক্ত দিছে বাংলা মায়ের সন্তান
আমরা রাখবো তাদের মান।’
ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই বাংলা সাহিত্যে সৃষ্টি হয়েছিল নতুন ধারা। একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে কবি-সাহিত্যিকরা সৃষ্টি করেছেন কবিতা-গল্প-উপন্যাস-ছড়া-গান-প্রবন্ধ-নাটক-চলচ্চিত্রসহ বিভিন্ন রচনা। এই সব লেখনিতে প্রকাশ পেয়েছে বাংলা ভাষা ও ভাষা শহীদদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং একুশে চেতনা সমুন্নত রাখার দৃপ্ত শপথের কথা। একুশে চেতনায় প্রথম কবিতা রচনা করেন কবি মাহবুব আলম চৌধুরী কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ Ñ
‘এখানে যারা প্রাণ দিয়েছে
রমনার ঊর্ধ্বমুখী কৃষ্ণচূড়ার তলায়
সেখানে দাঁড়িয়ে আমি কাঁদতে আসিনি
আজ আমি শোক বিহ্বল নই
আজ আমি প্রতিজ্ঞায় অবিচল
…………………………….
আমি আজ তাদের ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি
যারা আমার অসংখ্য ভাইবোনকে নির্বিচারে হত্যা করেছে।’
প্রথম গান ভাষা সৈনিক আনম গাজিউল হকের ‘ভুলব না, ভুলব না এ একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না’ গানটি সারা বাংলায় শিহরণ তুলেছিল। ৫৩-৫৫ সাল পর্যন্ত এই গানটি বেশি গাওয়া হতো।
‘ভুলব না, ভুলব না এ একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না
লাঠি গুলি আর টিয়ার গ্যাস, মিলিটারী আর মিলিটারী
ভুলব না।
রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই এ দাবিতে ধর্মঘট, বরকত সালামের খুনে
লাল ঢাকার রাজপথ
স্মৃতি-সৌধ ভাঙ্গিয়াছে জেগেছে
পাষাণে প্রাণ,
মোরা কি ভুলিতে পারি খুনে রাঙা
জয়-নিশান?
ভুলব না।’
প্রথম প্রভাত ফেরীর গান রচনা করেন প্রকৌশলী মোশারফ উদ্দিন আহমদ ১৯৫৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে। চরণটি ছিল-
‘মৃত্যুকে য়ারা তুচ্ছ করিল
ভাষা বাঁচাবার তরে
আজিকে স্মরিও তাঁরে’।
একুশের প্রথম সংকলন সম্পাদনা করেন হাসান হাফিজুর রহমান। ১৯৫৩ সালে পুঁথিপত্র থেকে ‘একুশের সংকলন’ প্রকাশিত হয়। সংকলনটির প্রকাশক ছিলেন রাজনৈতিক কর্মী মোহাম্মদ সুলতান। একুশের প্রথম নাটক মুনির চৌধুরীর ‘কবর’। ১৯৫৩ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি মঞ্চস্থ করা হয় কারাগারে। প্রথম উপন্যাস জহির রায়হানের ‘আরেক ফাল্গুন।’ উপন্যাসে আবেগপ্রবণ ভাষায় পরম মমতায় তুলে ধরা হয়েছে ভাষা শহীদদের কথা।
‘আকাশে মেঘ নেই। তবু ঝড়ের সঙ্কেত।
বাতাসে বেগ নেই। তবুু, তরঙ্গ সংঘাত।
কন্ঠে কন্ঠে এক আওয়াজ, শহীদদের খুন
ভুলবোনা। বরকতের খুন ভুলবো না।’
প্রথম চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া।’ ১৯৭০ সালে ছবিটি পরিচলনা করেন ঔপন্যাসিক ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান । পুলিশের ভেঙে দেয়া শহীদ মিনার নিয়ে প্রথম কবিতা লেখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্র আলাউদ্দিন আল আজাদ। কবিতার নাম ‘স্মৃতিস্তম্ভ’।
‘স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু
আমরা এখনো চারকোটি পরিবার
খাড়া রয়েছি তো। যে ভিত কখনো কোন রাজন্য
পারেনি ভাঙতে
…………………….
ইটের মিনার
ভেঙেছে, ভাঙুক। ভয় কি বন্ধু,
দেখ একবার আমরা জাগরী
চার কোটি পরিবার।’
ঢাকা কলেজের ছাত্ররা ১৯৫৩ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে একুশের একটি সংকলন বের করে। হাসান হাফিজুর রহমান ভাষা আন্দোলনকে সামনে নিয়ে লিখেছেন কবিতা ‘মিছিলের একমুখ,’ ‘ফেব্রুয়ারির ঢাকা আমার,’ ও ‘অমর একুশে’। এসব কবিতায় ফুঁটে উঠেছে বাঙালির জাগরণের ইতিহাস। অমর একুশে কবিতায় তিনি লিখিছেন-
“আবুল বরকত নেই; সেই অস্বাভাবিক বেড়ে ওঠা
বিশাল শরীর বালক, মধুর স্টলের ছাদ ছুঁয়ে হাঁটতো
আর একবারও ডাকলে ঘৃণায় তুমি কুচকে উঠবে
যে তাঁকে ডাকো না;
সালাম, রফিকউদ্দিন, জব্বার, কি বিষন্ন থোকা থোকা নাম”
আবু জাফর ওবায়দুলাহ কবিতা ‘কোনো এক মাকে’। খোকা, যে শহিদ হয়েছে ভাষা-আন্দোলনে। আর সে কখনো উড়কি ধানের মুড়কি হাতে অপেক্ষামান মায়ের কাছে ফিরে আসবে না, সে কথা মা কিছুতেই বুঝতে চায় না। কবিতায়-
‘কুমড়ো ফুল শুকিয়ে গেছে,
ঝরে পড়েছে ডাঁটা,
পুঁইলতাটা নেতানো
“খোকা এলি?”
ঝাপসা চোখে মা তাকায়
উঠোনে, উঠোনে
যেখানে খোকার শব
শকুনিরা ব্যবচ্ছেদ করে
এখন,
মার চোখে চৈত্রের রোদ
পুড়িয়ে দেয় শুকুনিদের
তারপর,
দাওয়ায় বসে
মা আবার ধান ভানে,
বিন্নি ধানের খই ভাজে,
খোকা তার কখন আসে!
এখন, মার চোখে শিশির ভোর,
স্নেহের রোদে ভিটে ভরেছে।’
একুশে ফেব্রুয়ারির আত্মসচেতন করে ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে প্রেরণা যুগিয়েছে। যা ফুটে উঠেছে কবি শামসুর রাহমানের ‘শহীদ মিনারে কবিতা পাঠ’ কবিতায়।
‘আমরা ক’জন
শহীদ মিনারের পাদপীঠে এসে দাঁড়ালাম
ফেব্রুয়ারির শীত বিকেলে।
আমাদের কবিতা পাঠের সময় মনে হয়
তারা এলেন শহীদ মিনারে, নিঃশব্দে কিছুক্ষণ
আসা যাওয়া করে চত্বরে ক’জন
শহীদ দাঁড়ান পাদপীঠে।’
মহাদেব সাহার ‘একুশের গান’ খোন্দকার আশরাফ হোসেনের ‘ফেব্রুয়ারিতে জনৈক বাগান মালিক’ ফজলে লোহানীর ‘একুশের কবিতা’ রয়েছে একুশে চেতনার প্রভাব। ঢাকা কলেজের ২য় বর্ষের ছাত্র আবদুল গাফফার চৌধুরী লিখেছিলেন কালজয়ী কবিতা-
‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রুঝরা ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।’
কথিত আছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আবদুল গাফফার চৌধুরী বুলেটবিদ্ধ জৈনক তরুণের শিয়রে বসে ত্রিশ লাইনের এই কবিতাটি লিখেছিলেন। যা এখন আমাদের একুশের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। আমার তো মনে হয় আমাদের জাতীয় সংগীতের পর সবচেয়ে জনপ্রিয় গান এটি। গানটির রচিয়তা আবদুল গাফফার চৌধুরী স্বেচ্ছানির্বাসনে আর সুরকার আলতাফ মাহমুদ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানীদের হাতে নিহত হয়েছেন।
ছোটগল্পেও ভাষা-আন্দোলনের তাৎপর্য ফুটে উঠেছে। যেমন শওকত ওসমানের ‘মৌন নয়,’ সাইয়িদ আতীকুলাহর ‘হাসি’ অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ‘দৃষ্টি,’ মিন্নাত আলীর ‘রুম বদলের ইতিকথা,’ সরদার জয়েন উদদীনের ‘খর¯্রােত,’ নূরউল আলমের ‘একালের রূপকথা,’ রাবেয়া খাতুনের ‘প্রথম বধ্যভূমি,’ মঈদ-উর-রহমানের ‘সিঁড়ি’ সেলিনা হোসেনের ‘দীপান্বিতা’ শহীদুলা কায়সারের ‘এমনি করেই গড়ে উঠবে,’ সৈয়দ শামসুল হকের ‘স¤্রাট,’ মুর্তজা বশীরের ‘কয়েকটি রজনীগন্ধা,’ বশীর আল্ হেলালের ‘বরকত যখন জানত না সে শহীদ হবে’, শওকত আলীর ‘অবেলায় পুনর্বার’ রাজিয়া খানের ‘শহীদ মিনার,’ রিজিয়া রহমানের ‘জোৎস্নার পোস্টার’, মাহমুদুল হকের ‘ছেঁড়া তার’, মঈনুল আহসান সাবেরের ‘মরে যাওয়ার সময় হয়েছে’, রশীদ হায়দারের ‘সুদূরের শহীদ,’ এবং জহির রায়হানের ‘একুশের গল্প,’ ‘সূর্যগ্রহণ’, কয়েকটি সংলাপ’ ইত্যাদিতে ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন দিকের চিত্র অংকিত হয়েছে।
১৯৬৫ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে প্রভাত ফেরীর গান হিসাবে তোফাজ্জল হোসেনের এই গানটি গাওয়া হয়েছিল।Ñ
‘শহীদি খুন ডাক দিয়েছে
আজকে ঘুমের ঘোরে
আজ-রাজপথের যাত্রী মোরা
নুতন আলোর ভোরে
………………..
এগিয়ে চল সম্মুখ পানে
রক্তরেখা ধরে।’
(ডি. এ রশীদ ও মহিউদ্দিন আহমদ সম্পাদিত ‘একুশে সংকলন’ ঢাকা-১৯৫৬)
আমাদের ছড়া সাহিত্যও যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে ভাষা-আন্দোলনের। ভাষা-আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে অসংখ্য ছড়া। আল মাহমুদের বিখ্যাত ছড়া ‘একুশের ছড়া’।
“ফেব্রুয়ারি একুশ তারিখ
দুপুর বেলার অক্ত
বৃষ্টি ঝরে, বৃষ্টি কোথায়
বরকতেরই রক্ত’।
মসউদ উশ শহীদ তাঁর ‘ভাষার জন্যে’ ছড়ায় লিখেছেন,
‘ভাষার জন্যে লড়াই হলো
লড়াই করে আস্থা পেলাম,
ভাষার জন্যে লড়াই করে
স্বাধীনতার রাস্তা পেলাম’।
পাকিস্তানী শাসক ও তাঁদের সহযোগিরা খুন করতে চেয়েছিল একটি জাতির সত্তাকে, একটি জাতির বুঝবার শক্তিকে, দেখবার দৃষ্টিকে, অনুভব করার ক্ষমতাকে, একটি জাতির বিবেককে। চেয়েছিল পরাধীনতার বেড়জালে আটকে রাখতে। পরাধীনতার চেয়েও ভয়ংকর বিষয় তিতে তিলে অস্তিত্ব ধ্বংস করা। কিন্তু ষড়যন্ত্রীরা সফল হতে পারেনি। বুকের তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করে আমাদের মুখের ভাষা এনে দিয়েছেন ভাষা শহীদরা। নিরস্ত্র হয়েও সশস্ত্র শাসকদের প্রতিরোধ করেছিলেন অদম্য সাহসে। এই একুশে আমাদের কন্ঠে ভাষা দিয়েছে, হৃদয়ে আবেগ ও সংকল্পের দৃঢ়তা দিয়েছে। আর তাই তো নতুন প্রজন্মের কাছে কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ আহবান জানিয়েছেন ভাষা শহীদদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণে রাখার জন্য। কবির ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ কবিতায়,Ñ
‘হে নতুন প্রজন্ম!
ভুলে যেয়ো না সেইসব কিশোরের কথা
যারা একদিন কচি গলায়
বাংলাদেশের সব শহরের রাস্তায় রাস্তায়
অজস্র কৃষ্ণচূড়া আর পলাশ ফুলের গন্ধে
ফুটিয়ে তুলেছিলো আরেক রকম রক্ত-লাল-ফুল;
রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই!’
বাঙালির জীবনে যে অসাম্প্রদায়িক, মানবতাবাদী, ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার উন্মেষ ঘটেছিল তার প্রভাব পড়েছে একুশের সাহিত্যে। বাঙালি ভাষা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদের ভাষা হয়েছে একুশের সাহিত্য। বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার প্রতি গভীর মমতার উন্মেষ ঘটিয়েছে তা। একুশের সাহিত্যের মাধ্যমেই ফুটে উঠেছে আমাদের জাতিসত্তার পরিচয়, লিপিবদ্ধ হয়েছে আমাদের ইতিহাসের গৌরবগাথা।