সাহিত্য পত্রিকা মাসিক ‘শ্রীভূমি’

নন্দলাল শর্মা
উনিশ শতকের নবজাগরণের জোয়ার বরাক-সুরমা উপত্যকায়ও প্রভাব বিস্তার করেছিল। এরই ফসল  এখানকার প্রথম পত্রিকা সিলেট থেকে ১৮৭৫ সালে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘শ্রীহট্ট প্রকাশ’। এর সম্পাদক ছিলেন স্বভাবকবি প্যারীচরণ দাস। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোন সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের জন্য আরও কিছুকাল অপেক্ষা করতে হয়েছিল। “জাতির নষ্টকোষ্ঠীর পুনরুদ্ধার আর ইতিহাসের ছিন্নসূত্রের পুনরাবিষ্কারের মধ্য দিয়ে বাঙালির সারস্বত সাধনা ও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ প্রতিষ্ঠিত হয় ২৯ এপ্রিল ১৮৯৪ সালে।…প-িত ভুবনমোহন বিদ্যার্ণব শ্রীহট্টে সাহিত্য পরিষদের একটি শাখা স্থাপনের জন্য উদ্যোগী হয়েছিলেন, ব্যোমকেশ মুস্তাফীর প্রয়াণে দুর্ভাগ্যত তা ফলপ্রসূ হয়ে ওঠেনি।” (সুবীর ২০১৫:৩১-৩২) তবে “১৯১২ খ্রি. সুরমা সাহিত্য সম্মিলনীর প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় করিমগঞ্জ শহরে। তখন বিশিষ্ট শিক্ষক ভারতচন্দ্র চৌধুরী, সাহিত্যিক সঙ্গীতজ্ঞ জ্যোতিষশাস্ত্রবিদ মহকুমা শাসক রজনীকান্ত রায় দস্তিদার, সাহিত্যিক প্যারীচরণ নন্দী, সতীশচন্দ্র দেব প্রমুখ লব্ধপ্রতিষ্ঠ ব্যক্তিরা মিলে করিমগঞ্জে একটি সাহিত্যিক গোষ্ঠী তৈরি করেছিলেন। তাঁদের উদ্যোগেই আয়োজিত হয়েছিল সুরমা সাহিত্য সম্মিলনীর এই অধিবেশন। সম্মিলন উপলক্ষে গঠিত অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি ও সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে ভারতচন্দ্র চৌধুরী ও সতীশচন্দ্র দেব।” (অমলেন্দু ২০১৬:৯-১০) এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছিলেন ‘দেবীযুদ্ধ’ প্রণেতা কবি শরচ্চন্দ্র চৌধুরী। অধিবেশনে একখানা মাসিক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু নানা কারণে এ প্রস্তাব সঙ্গেসঙ্গে বাস্তবায়িত করা সম্ভবপর হয়নি।
সুরমা  সাহিত্য সম্মিলনীর দ্বিতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় শিলচর শহরে ১৯১৪ খ্রিস্টাবেদ এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন পদ্মনাথ ভট্টাচার্য। অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি ও সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে কামিনীকুমার চন্দ ও অবন্তীনাথ দত্ত। তখন “এই প্রান্তিক ভূমিতে পত্রিকা প্রকাশের তাগিদ অনুভূত হয়েছিল। সেই সঙ্গে জাগ্রত হয়েছিল ঐতিহ্য সন্ধানের প্রবল আকাক্সক্ষা। এই দ্বিবিধ মানসিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ‘সুরমা সাহিত্য সম্মিলনীর’ শিলচর অধিবেশনে ঐতিহ্য সন্ধানের জন্য জগন্নাথ দেবকে সম্পাদক মনোনীত করে গঠিত হয়েছিল ‘শ্রীহট্ট-কাছাড় অনুসন্ধান সমিতি’ আর নবম প্রস্তাবে এ অঞ্চল থেকে সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল।” (অমলেন্দু ২০১৬:১১)
সুরমা  সাহিত্য সম্মিলনীর করিমগঞ্জ অধিবেশনে সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের জন্য যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল তা বাস্তবায়নের জন্য শিলচর অধিবেশন অগ্রণী হন। এজন্য একুশ সদস্যবিশিষ্ট একটি শক্তিশালী কমিটি গঠিত হয়। কমিটিতে ছিলেন পদ্মনাথ ভট্টাচার্য, অচ্যুতচরণ চৌধুরী, ভুবনমোহন বিদ্যার্ণব, কামিনীকুমার চন্দ, জগন্নাথ দেব, সতীশচন্দ্র দেব, রজনীচন্দ্র দত্ত কাব্যরঞ্জন, লালা প্রসন্ন কুমার দে, রজনীকান্ত রায় দস্তিদার, শরচ্চন্দ্র চৌধুরী, রজনীরঞ্জন দেব, হরকিশোর চক্রবর্তী, সতীশচন্দ্র রায়, মৌলভী মোজাহেদ আলী, ঈশানচন্দ্র চক্রবর্তী, অশ্বিনীকুমার চক্রবর্তী, বিরজাকান্ত ঘোষ, গগনচন্দ্র দত্ত, মৌলভী মফিজুর রহমান, মহেন্দ্রনাথ কাব্যসাঙ্খ্যতীর্থ এবং করুণাময় তর্কশাস্ত্রী।
শিলচর অধিবেশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মাসিক সাহিত্যপত্রিকা ‘শ্রীভূমি’ করিমগঞ্জ থেকে প্রকাশিত হয়। পত্রিকা প্রকাশে আর্থিক সহায়তা দান করেছিলেন রমণীমোহন দাস, বসন্তকুমার ধর বৈরাগী, গুরুসদয় দত্ত, কৃষ্ণকিশোর সেনপুরকায়স্থ, সুরেন্দ্রনাথ সেনপুরকায়স্থ, ছত্রধারী রায়, শ্যামাচরণ দত্ত, বঙ্কচন্দ্র সেন, মৌলভী আবদুল খালেক চৌধুরী, নরেন্দ্রনাথ দত্ত, মথুরানাথ চৌধুরী, মৌলভী আবদুল হামিদ চৌধুরী, আবদুল গফুর এবং তারাচরণ দাস।
শ্রীভূমি পত্রিকার প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৩২২ বঙ্গাব্দের (১৯১৫ খ্রি.) বৈশাখ মাসে এবং শেষ সংখ্যা (দ্বিতীয় বর্ষ অষ্টম সংখ্যা) প্রকাশিত হয় ১৩২৩ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ মাসে।  পত্রিকাটি এক বৎসর আট মাসে বিশ সংখ্যার পরিবর্তে আঠারটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। প্রথম বর্ষ ষষ্ঠ ও সপ্তম সংখ্যা এবং দ্বিতীয় বর্ষ পঞ্চম ও ষষ্ঠ সংখ্যা যুগ্ম সংখ্যা রূপে প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটিতে সম্পাদকের নাম উল্লেখ করা হত না। অধ্যাপক যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য ‘শ্রীহট্টবাসী সম্পাদিত এবং শ্রীহট্ট ও কাছাড় হতে প্রকাশিত সংবাদপত্র’ (১৩৪৯ বঙ্গাব্দ) পুস্তিকায় লিখেছেন (পৃ.২৬) শ্রীভূমির সম্পাদক ছিলেন সতীশচন্দ্র দেব (লাউতা, করিমগঞ্জ) ও ভুবনমোহন বিদ্যার্ণব  (বেজুড়া, হবিগঞ্জ)। শ্রীভূমি মুদ্রিত হত করিমগঞ্জ প্রেসে পত্রিকাটির মুদ্রক ও প্রকাশক ছিলেন নলিনীসুন্দর দেবগুপ্ত। প্রথম বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা থেকে এই দায়িত্ব পালন করেন অবনীকুমার চৌধুরী। প্রতি সংখ্যার মূল্য ছিল চার আনা, বার্ষিক সডাক দুই টাকা, মফস্বলে দুই টাকা ছয় আনা। পত্রিকাটির অঙ্গসজ্জা, মুদ্রণ, বাঁধাই, প্রচ্ছদ আকর্ষণীয় ছিল। প্রথম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে প্রচ্ছদে একটি উদ্ধৃতি ছাপা হত । এটি হলÑ“আমরা বাঙ্গালী। বঙ্গভাষা আমাদের ভাষা। বঙ্গীয় সমাজ আমাদের সমাজ। আমাদের দেহে দেহে বাঙ্গালীর রক্ত প্রবাহিত। আমাদের মস্তিষ্কে বাঙ্গালীর চিন্তা¯্রােতঃ। বঙ্গভারতি! তোমার বিজয়শঙ্খ পতিত সমাজের পাপতাপ দূর করুক।”
শ্রীভূমি পত্রিকায় কবিতা, গান, গানের স্বরলিপি, গল্প, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী, জীবনী, অনূদিত রচনা, পুস্তক সমালোচনা প্রভৃতি ছাড়া একটি ধারাবাহিক উপন্যাস (অসমাপ্ত) প্রকাশিত হয়। প্রতি সংখ্যায় সম্পাদকীয় প্রকাশিত হত না। প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যা এবং দ্বিতীয় বর্ষ প্রথম সংখ্যায় সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছে।  প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছিলÑ“শিশু দেহের সম্বল অপরিণত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। অকিঞ্চিৎকর উপাদান  লইয়াই ‘শ্রীভূমি’ ভূমিষ্ঠ হইল।…শ্রীহট্ট কাছাড়ে ভাষা জননীর বীণা বাজে না। এখানে অর্চ্চক আছেন, অর্চ্চনা নাই;…বঙ্গে মাসিক পত্রিকার জীবন নানা কারণে বিঘœসঙ্কুল, কিন্তু পথ কণ্টকাকীর্ণ দেখিলেই লোকে তীর্থ ভ্রমণে অগ্রসর হয় নাকি?…এই অনুষ্ঠান ফলে নিন্দা বা প্রশংসা যাহা ঘটিবে, আমাদিগকে তাহাই গ্রহণ করিতে হইবে। সাধুগণ এইমাত্র আশীর্বাদ করুন, আমরা যেন স্বার্থের কুহকে লক্ষ্যভ্রষ্ট হইয়া আত্মবিস্মৃত না হই।”
দ্বিতীয় বর্ষ প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছিলÑ“যাহারা মনে করিয়াছিলেন কলিকাতার উচ্চশ্রেণীর মাসিকগুলির মত শ্রীভূমিও সর্বাংশে একখানি উচ্চাঙ্গের মাসিকে পরিণত হইবে, তাঁহাদের অনেকেই নিরাশ হইয়াছেন। ফলতঃ শ্রীহট্টের সমবেত সাহিত্যশক্তি শ্রীভূমির রক্ষণপোষণে প্রযুক্ত হইলে এবং দেশের ধনবানগণ এদিকে আশানুরূপ অনুকম্পা প্রদর্শন করিলে এরূপ আশা দুরাশা নহে; কিন্তু আমাদেরই অক্ষমতা, আমাদেরই ভেদবিভেদ  আমাদের জাতীয় সাধনার অঙ্গহানি করিতেছে, অন্যথা আমরা দেখাইতে পারিতাম শ্রীহট্টের সাহিত্যশক্তি অকিঞ্চিৎ নহে।”
শ্রীভূমি পত্রিকা নবীন লেখকদের পৃষ্ঠপোষকতা কামনা করেছিল। প্রথম বর্ষ অষ্টম সংখ্যায় ‘লেখকদের প্রতি নিবেদন’ অংশে বলা হয়েছিল “লেখকগণ-বিশেষভাবে সুরমা উপত্যকার নূতন লেখকগণ যাহাতে ‘শ্রীভূমি’ হইতে রীতিমত উৎসাহ পান সে বিষয়ে আমাদের বিশেষ দৃষ্টি আছে। ‘শ্রীভূমি’র কলেবর ক্ষুদ্র এবং অন্য কারণেও মনোনীত প্রবন্ধাদি প্রকাশে অনেক বিলম্ব হইয়া যায়,…এবিষয়ে লেখকগণের ধৈর্য্যাবলম্বন বাঞ্ছনীয়। যাঁহারা প্রবন্ধাদি দিয়া এ পর্যন্ত ‘শ্রীভূমি’ প্রচারে আমাদের সহযোগিতা করিয়াছেন, তাঁহাদের নিকট আমরা সবিশেষ কৃতজ্ঞ। আমাদের ভরসা আছে সহৃদয় লেখকগণের নিকট হইতে আমরা এইরূপ উৎসাহ ও সহানুভূতি লাভে বঞ্চিত হইব না।”
মফস্বল থেকে সাহিত্যপত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করা এখনও সহজ কর্ম নয়। শতবর্ষ পূর্বে এ কাজটি আরও দুরূহ ছিল।
শ্রীভূমির আঠারটি সংখ্যায় প্রকাশিত রচনাগুলোকে বিন্যস্ত করলে দেখা যায় এতে আটান্ন জন কবির ৮৮টি কবিতা, দশজন কবির বারোটি এবং অজ্ঞাতনামা কবির দুটি -মোট চৌদ্দটি গান, দুটি মৌলিক নাটিকা ও দুটি নাটকের বাংলা অনুবাদ, একটি ধারাবাহিক উপন্যাস,পনের জন গল্পকারের ষোলোটি গল্প, এবং আদিবাসী, ইতিহাস ও ঐতিহ্য  জ্যোতিষশাস্ত্র, ধর্ম ও দর্শন, লোকসংস্কৃতি, বিজ্ঞান, শিক্ষা, সমাজ, সাহিত্য বিবিধষিয়ক ও অনূদিত প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী ছাড়াও বিশটি গ্রন্থের পরিচিতি  প্রকাশিত হয়েছে।
বরাকসুরমা উপত্যকায় মননশীল সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে শ্রীভূমি পত্রিকার ভূমিকা অনস্বীকার্য। সাহিত্যের ইতিহাসে পত্রিকাটির যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। বরাক উপত্যকা বঙ্গসাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন, কাছাড় জেলা সমিতি পত্রিকাটি প্রকাশের শতবর্ষ উদযাপন করেছে এবং ড. অমলেন্দু ভট্টাচার্যের অক্লান্ত পরিশ্রমে পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যা ভূমিকা সহ পুনঃ প্রকাশ করেছে। এতে নতুন প্রজন্ম পত্রিকাটির প্রতি আগ্রহী হবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
সহায়ক প্রবন্ধ
অমলেন্দু ভট্টাচার্য    ‘শ্রীভূমি’ পরিচিতি। পুনর্মুদ্রিত শ্রীভূমি ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা, শিলচর, ২০১৬
তুষারকান্তি নাথ       শ্রীভূমি:সাহিত্য-সাধনা। দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গ, ১ মে,২০১৬
সুবীর কর            ‘শ্রীভূমি’ পত্রিকার শতবর্ষ, রাষ্ট্রীয় ও সাহিত্য সম্মেলন:ঐতিহ্য ও আমাদের সাম্প্রতিক নিয়ে কিছু কথা। বর্ণিকথা        নভেম্বর, ২০১৫
নন্দলাল শর্মা         শতবর্ষ আগের সাহিত্যপত্রিকা ‘শ্রীভূমি’ । প্রসঙ্গ সিলেট (গ্রন্থ)ঢাকা ২০১২