সিলেটের ম্যাজিকম্যানের বিদায়ে আমরা শোকাহত

ঘাতক করোনা ভাইরাস সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র, আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বদর উদ্দিন আহমদ কামরানকেও মাত্র ৬৯ বছর বয়সে জীবন অধ্যায় থেকে কেড়ে নিলো। ভাইরাসটি উগ্র চরিত্র ধারণ করলে কতোটা মহাবিপদ ডেকে আনে প্রতিদিন তার প্রমাণ মিলছে। কামরান তার সর্বশেষ উদাহরণ। কামরানের মৃত্যু সিলেটের স্থানীয় রাজনীতির ভারসাম্য নষ্ট করবে। তিনি এমন এক চরিত্রের রাজনীতিবিদ ছিলেন যিনি সর্বস্তরের সিলেট মহানগরবাসীর অন্তরে জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন। তিনি সবচাইতে প্রিয় ছিলেন সিলেটের তথাকথিত অনভিজাত প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের কাছে। সিলেট নগর-মহানগরকেন্দ্রীক ভোটের রাজনীতিতে কামরান ছিলেন হ্যামিলনের বংশিবাদকের মতো। একইসাথে তিনি ছিলেন সিলেট আওয়ামী লীগের এক স্তম্ভ। এই স্তম্ভটি এমনই মজবুত ছিল যে, সিলেট মহানগরীর গ-ি পেরিয়ে তার শক্তিমত্তা পুরো বিভাগজোড়ে ছড়িয়ে পড়েছিলো। আওয়ামী রাজনীতি, আন্দোলন, সংকট, নির্বাচন; সর্বত্রই কামরান ছিলেন অপরিহার্য এক চরিত্র। তাঁর এই বিশিষ্টতা তাঁকে আঞ্চলিক গ-ির সীমা পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়েও পরিচিত করে দিয়েছিলো। বাংলাদেশের যে ক’জন রাজনীতিবিদ পুরো দেশে পরিচিত, কামরান তাঁদের অন্যতম। এই অর্জন তিনি জন্ম বা পারিবারিক সূত্রে অর্জন করেননি। সারা জীবনের নিবেদন দিয়ে একটি একটি সিঁড়ি টপকে তিনি উচ্চতর আসনে উঠতে পেরেছিলেন। তাঁর এই অর্জন স্বোপার্জিত। মানুষের পাশে থেকে মানুষের নাড়ির স্পন্দন বুঝে তিনি নিজেকে অবিকল্প করে তুলেছিলেন। প্রতিকূল সময় ও পরিবেশে কামরান নিজের যোগ্যতার পরিচয় দিতে সক্ষম হন। মানুষ কখনও তাঁকে বিমুখ করেনি। তাই তাঁকে সিলেটের রাজনীতির ম্যাজিকম্যান বলা হয়। এমন এক বিশিষ্ট চরিত্রের অন্তর্ধান সত্যিকার অর্থেই অপূরণীয় ক্ষতির কারণ। কামরানের মৃত্যুতে সিলেটবাসী আজ সেরকম শূন্যতা অনুভব করবেন। বিরল প্রতিভার এই রাজনীতিকের বিদায়ে আমরাও শোকাহত।
কামরানের জনপ্রতিনিধিত্ব শুরু একেবারে প্রাথমিক পর্যায় থেকে। হুট করে তিনি গাছের মগডালে আরোহণ করেননি। সিলেট পৌরসভার নির্বাচিত কমিশনার হিসাবে তাঁর জনপ্রতিনিধিত্বের অভিষেক ঘটে। ১৯৭২ সনে উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রাবস্থায় তিনি এই পদ লাভ করতে সক্ষম হন। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাননি কামরান। তিনবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। দুইবার নির্বাচিত হন চেয়ারম্যান। ২০০২ সনে সিলেট পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীতকালে কামরান ছিলেন পৌর চেয়ারম্যান। ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তিনি মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই হিসাবে তিনি সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রথম মেয়র। তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রাপ্ত পদবিতে সন্তুষ্ট থাকবার পাত্র তিনি নন। ২০০৩ সনে অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচনে জিতে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম নির্বাচিত মেয়রের পরিচয়ের পালকও নিজের করে নেন। ২০০৭ সনে কারান্তরীণ থাকাবস্থায় কামরান দ্বিতীয় মেয়াদে মেয়র নির্বাচিত হন। এইভাবে দীর্ঘদিন তিনি জনপ্রতিনিধির আসনে বসে মানুষের কাজ করতে প্রয়াসী ছিলেন। সর্বশেষ নির্বাচনে অল্প ভোটের ব্যবধানে তিনি হেরে গেলেও কামরান জনতার সঙ্গ ছাড়েননি। তাই আজও তার পরিচয় সিলেটের সাধারণ মানুষের বন্ধু। এমন বন্ধুকে হারিয়ে সিলেটবাসী আজ সত্যিই হতবাক-বাকরুদ্ধ।
তিনি সিলেট আওয়ামী লীগকেও নেতৃত্ব দিয়েছেন বলিষ্টভাবে। বহুদিন নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করার পর ২০০২ থেকে ২০১৯ সন পর্যন্ত সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতির পদে থেকে দুঃসময় ও সুসময়ে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ২০১৯ সনে তিনি সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হন। কামরান রাজনীতির কারণে জীবন শংকায়ও পড়েন। সবসময় সামনের কাতারে থেকে তিনি সিলেটের আওয়ামী রাজনীতিকে আগলে রেখেছেন। আজ যখন কামরান নেই তখন নিশ্চিতভাবেই দল তাঁর অভাব অনুভব করবে তীব্রভাবে। সামনে কখনও যদি দুঃসময় আসে তখন এই তীব্রতা সুতীব্র হবে। সুতরাং দলীয় নেতা কর্মীরাও আজ কামরান বিহনে শোকে স্তুব্ধ। কামরানের শূন্যতা পূরণে সিলেট আওয়ামী লীগকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হবে।
বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের স্মৃতির উদ্দেশ্যে আমাদের অনিঃশেষ শ্রদ্ধা।