সিলেটে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র করার দাবি উপেক্ষিত

স্টাফ রিপোর্টার
কবি, গবেষক, বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেছেন, সিলেট সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। এই অঞ্চলে একটি বিভাগীয় জাদুঘর ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র করার দাবি বহুবার উপেক্ষিত হয়েছে। সিলেটের প্রতœতাত্ত্বিক ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক উপকরণ সংগ্রহে এই ধরণের প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তিনি বলেন, অন্যান্য জেলার সাহিত্য সম্মেলনের সাথে সুনামগঞ্জে সাহিত্য সম্মেলনের কিছুটা পার্থক্য আছে। যারা নির্বাসিত ও নির্যাতিত তারা কিন্তু তাদের পূর্বপুরুষদের ভালোবাসাকে ধরে রেখেছে। আমরাও আমাদের ভালোবাসাকে ধরে রেখেছি স্বযতেœ। আমরা অবহেলার মধ্যে আছি, লাউড় রাজ্যে অবহেলার মধ্যে আছে। আমি আজকে এই অনুষ্ঠান থেকে সুনামগঞ্জবাসীর পক্ষ থেকে থেকে বলতে চাই- তাহিরপুর উপজেলার নাম পরিবর্তন করে লাউড় উপজেলা রাখা হোক। ১৫৯৫ সালে ভারতের বিখ্যাত পন্ডিত ইফরান হাবিব যে মানচিত্র তৈরি করেছেন তাতে দেখা যাচ্ছে- লাউড় আছে, জয়ন্তিয়া আছে, শ্রীহট্ট আছে, বানিয়াচং আছে, তরফ আছে কিন্তু সুনামগঞ্জ বলতে কোন জনপদের নাম নেই। তার মানে তখন আমরা লাউড় রাজ্যের অংশ ছিলাম। আমরা এজন্য গৌরবান্বিত, আমাদের অহংকার আমরা লাউড় রাজ্যের অধীন ছিলাম। লাউড়ের পাহাড়ের চুনাপাথর ছিল বহু আকর্ষণ। চুন-সুরকি দিয়ে আগে যেসর বিল্ডিং হতো তা চুনের উপর তৈরি করা হতো। যার ফলে ব্রিটিশ, খাসিয়া এবং বাঙালিরদের মধ্যে ত্রি পক্ষিয় সমস্যা ছিল। চুনাপাথর জায়গা লিজ দেয়া, কালেক্ট করা আর সুনামগঞ্জ থেকে ছাতক পর্যন্ত নদীর পাড়ে চুনাপাথরের সারি ছিল।
বুধবার দুপুর ১২টায় জেলা শিল্পকলা একাডেমির হাছনরাজা মিলনায়তনে দুইদিন ব্যাপি সাহিত্যমেলায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেবার সময় এসব কথা বলেন তিনি। জেলা পর্যায়ে সাহিত্যকদের সৃষ্টিকর্ম জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার লক্ষ্যে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় এই সাহিত্যমেলা চলবে আগামীকাল বৃহস্পতিবারও। বাংলা একাডেমির সমন্বয়ে এবং জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় হচ্ছে এই সাহিত্যমেলা।
দুই দিনব্যাপী আয়োজিত সাহিত্যমেলার প্রথম দিন সকাল সাড়ে ৯ টায় সাহিত্যিকদের নাম নিবন্ধন করা হয়। এরপর জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরী’র সভাপতিত্বে সূচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন ড. মোহাম্মদ সাদিক, বিশষে অতিথির বক্তব্য রাখেন সাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব আতাউর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু সাঈদ, বাংলা একাডেমির উপ-পরিচালক ড. একে এম কুতুব উদ্দিন। সূচনা বক্তব্য দেন জেলা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক কবি মোহাম্মদ জাকির হোসেন।
ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেন, ১১০ বছর আগে বানিয়াংয়ের শ্রেষ্ঠ পন্ডিত পদ্মনাথ ভট্টাচার্য্য বলেছিলেন লাউড়ের কথা। তাহিরপুর উপজেলার সেই লাউড় রাজ্যে এখন ধ্বংসস্তূপ। এটাকে উদ্ধার করতে হবে। ১১ বছরের চেষ্টায় আমরা এটিকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রতœতাত্বিক সাইট হিসেবে গেজেট করাতে সক্ষম হয়েছি। এখনও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি আছে যেটি আমার খসড়া করা তাহিরপুরের সংসদ সদস্যের প্যাডে পাঠানো। সেই চিঠিতে আমরা লাউড় রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ খনন এবং সংরক্ষণ করার জন্য ৫০ কোটি টাকার নিচে একটি প্রকল্পের জন্য অনুরোধ করা করেছি। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. আতাউর রহমান যদি ফিরে গিয়ে সেই প্রকল্পটি পাশ করার তাহলে বুঝবো আমাদের আজকের অনুষ্ঠান সফল হয়েছে।
তিনি বলেন, বঙ্গ এবং কামরূপের মাঝামাঝি ছিলাম আমরা। বঙ্গ কামরূপি ভাষার আসল রূপটা ধরে রেখেছে সিলেট। অর্থাৎ প্রাচীন বাংলা যদি অনুসন্ধান করেন তাহলে সিলেটে আসতে হবে। সিলেটের মানুষের মুখের মধ্যে এখনও প্রাচীন বাংলার গন্ধ পাওয়া যায়। কবিগুরু বলেছিলেন, ‘মুজতব আলী কথা বললে কমলালেবুর গন্ধ পাওয়া যায়।’ অর্থাৎ তিনি যে সিলেটের বাসিন্দা বুঝা যায়। আমাদের প্রাচীন লোক, গ্রামের লোক কথা বললে বঙ্গ কামরূপি ভাষার গন্ধ পাওয়া যায়। এটা নিয়ে কেউ যদি গবেষণা করতে চায় করতে পারে। আসুন আমাদের এখানে, মানুষের সাথে কথা বলে বঙ্গ কামরুপি ভাষার নমুনা সংগ্রহ করুন। যেটা ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বহু আগেই গুরুত্বের সঙ্গে বলেছেন।


তিনি বলেন, আমাদের ঝর্ণা দাশ পুরস্কায়স্থ একুশে পদক পেয়েছেন, বাংলা একাডেমি পদক পেয়েছেন। কিন্তু খুব বেশি মানুষ ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থকে দেখেন নি। আমাদের শাহেদ আলী জিব্রাইলের ডানা লিখে বিখ্যাত হয়েছিলেন। সত্যজিত রায় জিব্রাইলের ডানা দিয়ে ফিল্ম বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমরা শাহেদ আলীকে খুব একটা গুরুত্ব দেইনি। আমাদের এলাকার মানুষ অবহেলার শিকার। কারণ আমরা মফস্বল। প্রাগ জ্যোতিষপুর রাজ্যে যখন ছিল তখনও আমরা মফস্বল, যখন এটা কামরূপ রাজ্যে তখন আমরা মফস্বল, যখন এটা আসাম ছিল তখনও মফস্বল, যখন পাকিস্তান তখনও মফস্বল, বাংলাদেশও আমরা মফস্বল। একেবারে সীমান্তের কাছাকাছি। ‘বাংলার প্রান্তসীমা হতে নির্বাসিতা তুমি’ বলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও সিলেটকে নিয়ে দুঃখপ্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, আমাদের এখানে দুই হাজার বছরের পুরনো প্রাচীন সাইট আছে। আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে চাই মহাকবি সঞ্জয়কে। যিনি মহাভারত প্রথম বাংলায় অনুবাদ করেছেন। এটা নিয়ে অনেকে বিতর্ক করেন। কবিন্দ্র পরমেশ^রকে মহাভারতে প্রথম অনুবাদক হিসেবে বলা হয়। কিন্তু আমরা জানি মহাকবি সঞ্জয়ই প্রথম অনুবাদক। তিনি কোন রাজপুষের পৃষ্ঠপোষকতা পাননি। তিনি প্রার্থনার অনুসঙ্গ হিসেবে মহাভারত অনুবাদ করেছিলেন। অন্ধকারকে আলোকিত করেছিলেন। আমাদের ৩৬০ জন দরবেশের প্রতিটি মাজার ৭০০/৬০০ বছরের পুরনো।
জেলা প্রশাসক কে উদ্দেশ্যে করে তিনি বলেন, আপনি যে কেন প্রাচীন গ্রামে যান মন্দিরা-একতারার শব্দ শোনবেন। আমাদের ঘরে ঘরে দুর্ব্বিন শাহ, শাহ আব্দুল করিম, মকরম শাহ, সৈয়দ শাহনূর, হাছনরাজা লুকিয়ে আছেন। জেলা প্রশাসক হিসেবে আপনার দায়িত্ব তাদের অনুসন্ধান করে বের করা। একজন শিল্পী যদি না খেয়ে থাকেন তাহলে এর দায় জেলা প্রশাসকের।
এর আগে দুই দিনব্যাপী আয়োজিত সাহিত্য মেলার প্রথম দিন সকাল সাড়ে ৯টায় সাহিত্যিকদের নাম নিবন্ধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর চলে প্রবন্ধ পাঠ ও আলোচনা পর্ব। যেখানে জেলার তিনজন সাহিত্যিকের প্রবন্ধ পাঠ করেন এবং আলোচকও ছিলেন তিনজন।
বেলা সাড়ে ১১ টা থেকে দুপুর ১ টা পর্যন্ত চলে প্রবন্ধ পাঠ ও আলোচনা পর্ব। প্রবন্ধ পাঠ করেন লেখক ও গবেষক মোহাম্মদ সুবাস উদ্দিন, লেখক ও সাংবাদিক শামস শামীম, লেখক সুখেন্দু সেন। আলোচনায় অংশ নেন লোকগবেষক ও সাংবাদিক সুমনকুমার দাশ, কবি ও প্রাবন্ধিক ইকবাল কাগজী, কবি ও অধ্যাপক মোস্তাক আহমাদ দীন। দুপুর ২ টা থেকে চলে লেখক কর্মশালা।
আজ বৃহস্পতিবার দিনব্যাপি হবে সাহিত্যপাঠ, কবি কন্ঠে কবিতা পাঠ, ছড়া পাঠ, কথা সাহিত্যিকদের ছোটগল্প, উপন্যাস থেকে পাঠ এবং নাট্যকারদের নাটক থেকে পাঠ।