সিলেট সিটি নির্বাচনী ফলাফলের রাজনৈতিক তাৎপর্য

অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরান বিজয়ী হওয়ার দৌঁড় থেকে দৃশ্যত ছিটকে পড়লেন। ১৩৪ টি কেন্দ্রের মধ্যে ২টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত হয়। ১৩২ কেন্দ্রের ফলাফলে বিএনপি’র মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী ৪৬২৬ ভোটে কামরানের চাইতে এগিয়ে আছেন। স্থগিত দুই কেন্দ্রের সর্বমোট ভোটার সংখ্যা ৪৭৮৭। অর্থাৎ আরিফের ধনাত্বক পার্থক্যের চাইতে ১৬১ ভোট দুই কেন্দ্রে বেশি থাকায় আরিফকে বেসরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষণা করতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। এই দুই কেন্দ্রে পুনরায় ভোট গ্রহণের পর চূড়ান্তভাবে যেকোন একজন প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে। তবে এই দুইকেন্দ্রে পুনরায় ভোট গ্রহণে আরিফের বর্তমান এগিয়ে থাকার অবস্থানটি পিছিয়ে যাবে আর কামরান জিতে যাবেন, এমন অসম্ভব কল্পনা বোধ করি স্বপ্নেও কেউ করতে পারেন না। সুতরাং সিলেটের ভবিষ্যৎ সিটি মেয়র হিসাবে আরিফুল হক চৌধুরীকেই ধরে নিতে কারও আপত্তি থাকবে না। সিলেটের এই ফলাফল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। স্বয়ং বিএনপি প্রার্থী আরিফ নির্বাচনে নিজের বিজয় সম্বন্ধে অনিশ্চিত ছিলেন বলেই ভোটগ্রহণের দিনেই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বিকাল থেকে যখন একের পর এক বিভিন্ন কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষিত হতে থাকল তখন সকলেই আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলেন, সর্বত্রই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হচ্ছে। কখনও কামরান এগিয়ে তো পরক্ষণেই সামনে চলে আসছেন আরিফ। ফলাফলের এই ইঁদুর দৌঁড়ের প্রতিযোগিতা সারা দেশকেই সোমবার মধ্যরাত পর্যন্ত সিলেটের দিকে দৃষ্টি নিমগ্ন রাখতে বাধ্য করে।
কেন আরিফের এমন অপ্রত্যাশিত ভাল ফলাফল? এর সরল উত্তর হলÑ শেষ অর্থে নির্বাচকম-লী ভোটাররাই শেষ কথা। তাঁরা চাইলে গোপনে গোপনে বিশাল কা- ঘটিয়ে ফেলতে পারেন যা অতিবড় ভবিষ্যৎদ্রষ্টাও টের পান না। সিলেটের অভিজ্ঞতায় আমরা এমনটিই দেখি। এখানে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের দুই ভিন্ন ভিন্ন প্রার্থী থাকায় বিএনপির ভোটে ভাগ বসানোর বাস্তবতা তৈরি হয়। কারণ ধর্মীয় দল সমর্থক ভোটগুলো বিএনপি বরাবর নিজের ভোট ভেবেই এসেছে এতকাল। কিন্তু সিলেটে উল্টোচিত্র দেখা গেল। ধর্মীয় দল সমর্থিত ভোট না পেলেও সিলেটের ধর্মীয় সংখ্যালঘু অধ্যূষিত ভোটকেন্দ্রগুলোতে বিএনপি প্রার্থী ভাল ফলাফল করেছেন। এর অর্থ হলো, হিন্দু ভোট মানেই নৌকার বাক্স বোঝাই করবে, এমন সরলিকৃত ধারণার উপর একটি আঘাত। বিএনপি যদি ভোটের এই সমীকরণটি মাথায় রাখে তাহলে ভবিষ্যতে তাদের রাজনৈতিক আদর্শ-কৌশল নির্ধারণের বিষয়টি প্রভাবিত হতে পারে। এই দেশের মানুষ সর্বদা রাষ্ট্র পরিচালনায় অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল দলকেই দেখতে চায়। এ কারণেই স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রচুর বিনিয়োগ ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়েও জামায়াতসহ নানান ইসলামী দল কখনও ভোটের রাজনীতিতে জায়গা করে নিতে পারেনি। সিলেটের ফলাফল বিএনপিকে যদি ডানপন্থা থেকে মধ্য পন্থায় ফিরাতে বিন্দুমাত্র ভূমিকা রাখে তবেই সিলেটের ভোটারদের বিজয় সাধিত হবে।
একেবারে হাতের মুঠো থেকে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিজয় হাইজ্যাক হয়ে যাওয়ার বিষয়টির উপর দলটিকে দীর্ঘ সময় নিয়ে নির্মোহ বিশ্লেষণে বসতে হবে। প্রাথমিকভাবে দলীয় সমন্বয়হীনতা, কোন্দল, অনান্তরিকতা, প্রার্থীর পড়তি ব্যক্তি ইমেজ; ইত্যাদি কারণগুলো সামনে আনা হচ্ছে। কোন দল পরাজয়ের সঠিক কারণ উদঘাটন করতে পারলে ভবিষ্যৎ জয়ের ভিত রচনা করতে সক্ষম হয়। সিলেটের আওয়ামী লীগকে অবশ্যই তাই অভাবিতপূর্ব খারাপ ফলাফলের বিষয়টি বিশ্লেষণ করেই ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে হবে।