সীমান্ত থেকে বালু-পাথরের বাল্কহেডে মাদক যাচ্ছে

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর সীমান্তের পাহাড়ী নদীকে ব্যবহার করছে মাদক ব্যবসায়ীরা। এরা সীমান্তের ওপার থেকে নানা কায়দায় মাদক এনে গন্তব্যে পৌছে দিচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের জন্য সম্প্রতি সীমান্তের মাদক ব্যবসায়ীদের প্রকাশ্য ঘোরাফেরা কমলেও ব্যবসা বন্ধ হয়নি তাদের। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় গত ১৪ মে’র আইন-শৃঙ্খলা সভায় একজন ইউপি চেয়ারম্যানসহ সভায় উপস্থিত কয়েকজনই বলেছেন,‘সীমান্ত পথ দিয়ে আসা মাদক কিছু অসৎ বালু-পাথর ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা বাল্কহেড বা ট্রলারে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দিচ্ছে। সুনামগঞ্জ বিজিবির ২৮ রাইফেল ব্যাটেলিয়ানের অধিনায়ক বলেছেন,‘আমাদের অবস্থান পরিস্কার, মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’।’
সুনামগঞ্জের সীমান্ত এলকায় অন্তত ২৫ জন মাদক ব্যবসায়ীকে সাধারণেরা চিনেন। নানা কৌশলে দেশের অভ্যন্তরে মাদক এনে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়াই তাদের কাজ।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার একটি সীমান্ত গ্রামের মসজিদের মোতাওয়াল্লি নিজের নাম পত্রিকায় না ছাপার অনুরোধ করে জানালেন,‘সীমান্তে বিজিবির তৎপরতা বেড়েছে, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশি অভিযান চলছে। এরপরও থেমে নেই মাদক ব্যবসায়ীদের অপকর্ম। সম্প্রতি মাদক ব্যবসায়ীদের প্রকাশ্যে বিচরণ কিছুটা কমলেও ব্যবসা বন্ধ হয়নি।’ এরা এখনও ‘ভাড়ানি’দের (সীমান্তে এই শব্দ পরিচিত, যাকে সকলে বহনকারী হিসাবে চিনেন) ব্যবহার করে নানা পন্থায় মাদক নিয়ে আসছে দেশে। মধ্যরাতে সর্টপ্যান্ট পড়ে গায়ে তেল মেখে সীমান্তের ওপারের কাকইগড়া নিয়ে যাওয়া হয় ভাড়ানিদের । ওখান থেকে ফেরার পথে মাদক ব্যবসায়ী বা তার ঘনিষ্ট লোকজন টর্চ লাইট নিয়ে ভাড়ানিদের লাইনের সামনে থাকে। পথে কোন সমস্যা থাকলে টর্চ লাইট দিয়ে সিগন্যাল (বিশেষ ভঙ্গিতে) দেওয়া হয়। ভাড়ানিরা তখন নিরাপদ অবস্থানে চলে যায়। শরীরে তেল মাখা হয়, ধরা খেলেও যাতে কোনভাবে পিছলে ছুটতে পারে। এছাড়া সুযোগ বুঝে কাটাতারের উপর মইয়া ফেলে রশি দিয়ে টেনে মাদকের কার্টন দেশের ভেতরে নিয়ে আসা হয়। নদী পথে বা সীমান্তের কোন এলাকায় সীমানা ঘেষা সড়কের কালভার্টের ভেতরে বড় বাঁশ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ওই বাঁশের মাথায় মাদকের কার্টন বা বস্তা বেধে দিলে এপার থেকে টেনে আনা হয়।’ তিনি জানান, ওই ব্যবসায়ীদের মধ্যে যাদের বাড়ি নদী পথের কাছে তারা বেশিরভাগ সময় বাল্কহেড বা ট্রলারের অসৎ শ্রমিকদের যোগসাজসে বালু পাথরের ভেতরে মাদক ঢুকিয়ে গন্তব্যে পাঠায়।
সদর, বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর সীমান্ত এলাকায় একাধিক বিশ্বস্ত ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে মাদক ব্যবসায়ী হিসাবে যাদের নাম জানা গেছে, এরা হলো- গফুর মিয়া, আলম মিয়া, রহমত আলী, কালা মিয়া, মানিক মিয়া, হাসেন মিয়া, সুজাত মিয়া, শহীদ মিয়া, আলউদ্দিন, হারুন মিয়া, বিল্লাল মিয়া, আইজু মিয়া, কাজল, ভুট্ট, সিরাজ, লাল, এরশাদ, দীন ইসলাম, আয়াত আলী, আবু তৈয়ব, আবু তাহের, মালেক ও মতি মিয়া। এদেরকে সীমান্তের বাসিন্দাদের সকলেই মাদক ব্যবসায়ী হিসাবে চিনেন। বিভিন্ন সময় এরা গ্রেপ্তার হয়েছে, মামলাও রয়েছে। বেশিরভাগ সময় বালুর ভেতরে মাদক গন্তব্যে পৌঁছে দেয় তারা।
গত ১৪ মে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় ফতেহ্পুর ইউপি চেয়ারম্যান রঞ্জিত চৌধুরী রাজন তাঁর বক্তব্যে বলেন,‘সীমান্ত নদী দিয়ে যাওয়া বালু ভর্তি কোন কোন বাল্কহেড’এ কৌশলে মাদক যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়।’
রঞ্জিত চৌধুরী রাজন শনিবার দুপুরে এ প্রতিবেদককে বলেন,‘সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে বালু-পাথর নেবার সময় কিছু কিছু অসৎ ব্যবসায়ী গাঁজা, দুই নম্বর ইয়াবা ও বিদেশী মদ নিয়ে যাচ্ছে বলে আমরা শুনেছি। একটি চক্র এই রোডকে নিরাপদ মনে করছে। বড় বালু পাথর ব্যবসায়ী এবং যারা পরিচিত বা নিয়মিত বালু-পাথরের ব্যবসা করেন, তাদের ট্রলারে বা বাল্কহেডে এমনটা হয় না। যারা হঠাৎ ব্যবসা করতে আসে, তারাই এই অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত বলে জানিয়েছেন অনেকে।’
বিশ্বম্ভরপুর থানার ওসি মোল্লা মনির হোসেন বলেন,‘বাল্কহেড’এ বালু-পাথরের ভেতরে মাদক যাবার কথা শুনেছি আমরা। আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায়ও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। পরে পুলিশ অভিযান হয়েছে। কিন্তু কিছুই পাওয়া যায়নি। আমরা মনে করছি এই বিষয়টি সত্য নাও হতে পারে।’
সুনামগঞ্জ ২৮ রাইফেল ব্যাটেলিয়ানের অধিনায়ক লে. কর্নেল এসএম আবুল এহসান বলেন,‘সীমান্তে জোরদার তৎপরতা আছে। মাদকের বিষয়ে আমাদের অবস্থান পরিস্কার ‘জিরো টলারেন্স’। সীমান্তের ৫-৬ কিলোমিটারের মধ্যে মাদক ব্যবসায়ীদের কোন তৎপরতা নেই।’