সীমাহীন জনভোগান্তি

আকরাম উদ্দিন
টানা তিন ধরে অযৌক্তিক পরিবহন ধর্মঘট বহাল থাকায় সারা জেলার যাত্রীদের সমস্যা চরমে উঠেছে। পরিবহন শ্রমিকরা নিজেদের যানবাহন বন্ধ রেখেই বসে থাকেনি। বরং তারা দিনব্যাপী আব্দুজ জহুর সেতু, নতুন বাসস্ট্যান্ড, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড প্রভৃতি এলাকায় পিকেটিং করে ছোটখাট যানবাহন চলতেও বাধা দিয়েছেন। পরিবহন খাতের জড়িত মালিক শ্রমিকদের এরকম তৎপরতায় সাধারণ মানুষ চরমভাবে বিরক্ত হয়ে উঠেছেন। দিনভর এই অযৌক্তিক ধর্মঘটের বিরুদ্ধে নানা মন্তব্য শোনা যায় বিভিন্ন জনের মুখে।
টানা পরিবহন ধর্মঘটের কারণে বাজারে নিত্য পণ্যের সংকট তৈরি হওয়ার মত অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে কয়েকজন ব্যবসায়ী এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। ব্যবসায়ীদের অভিমত, আর কয়েকদিন এরকম অবস্থা চলতে থাকলে বাজারে সকল পণ্যের ঘাটতি তৈরি হবে এবং এ কারণে দ্রব্যমূল্যও বৃদ্ধি পেতে পারে। এই ধর্মঘটে সবচাইতে অসুবিধায় পড়েছেন যারা বাইরে কায়িক শ্রম বিক্রি করে জীবিকা চালান সেইসব মানুষের। কোম্পানিগঞ্জ ও ভোলাগঞ্জের পাথর মহালে কাজ করেন এমন অনেক শ্রমজীবিকে বাসের জন্য অপেক্ষমাণ থাকতে দেখা গেছে বাস টার্মিনালে। কয়েকজন ব্যক্তিকে দেখা যায়, তারা মুমূর্ষু রোগীকে নিয়ে সিলেট যাবেন। কিন্তু কোন বাস না পেয়ে যেতে পারছেন না। এদিকে জেলা শহরে অবস্থান করে বিভিন্ন উপজেলায় চাকুরি করেন এমন অনেক ব্যক্তিকে সকাল বেলা যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে পুরাতন বাসস্ট্যান্ড ও আব্দুজ জহুর সেতু এলাকায়। এদের অনেকেই সময়মত অফিসে যেতে পারছেন না বলে জানান। সবচাইতে বেশি অসুবিধায় পড়তে দেখা যায় বিদ্যালয়গামী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মহিলা শিক্ষকদের। শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড ও হাজীপাড়া মোড়ে সকাল সাড়ে আটটা থেকে মহিলা শিক্ষকদের জটলা দেখা যায়। এদের অনেকেই দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, জামালগঞ্জ ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা সহ সদর উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে চাকুরি করেন। যানবাহন না পেয়ে অনেককেই বাড়ি ফিরতে দেখা গেছে। অনন্যোপায় হয়ে কেউ কেউ বিকল্প ব্যবস্থায় গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। গত রবিবার থেকে শুরু হয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষক নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা। যানবাহন না পেয়ে তাদেরকে জেলা সদরে আসতে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। অনেকেই আগের দিন রাতে শহরে এসে আত্মীয় স্বজনের বাড়ি কিংবা হোটেলে উঠেছেন। এ কারণে তাদের যাতায়াত খরচ পাঁচ ছয় গুণ বেশি হয়েছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন ভূক্তভোগী। শহর থেকে দূরবর্তী অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা জেলা সদরের বিভিন্ন বিদ্যালয় ও কলেজে পড়াশোনা করেন। এই শিক্ষার্থীরা গত কয়েকদিন ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসতে পারছেন না। পরিবহন চালক-হেলপাররাও যে এই ধর্মঘটে খুশি এমনটি মনে হয়নি তাদের সাথে কথা বলে। কযেকজন চালক হেলপার এই প্রতিবেদককে বলেছেন, ভাই গাড়ি বন্ধ থাকলে আমাদের পেটও বন্ধ হয়ে যায়। ধর্মঘট আরও লম্বা হলে আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে। ছোট যানবাহনের চালকরা আরও বেশি নাখোশ। একজন সিএনজি চালক বলেন, সারাদিন গাড়ি চালিয়ে মালিককে দেয়ার পর চার পাঁচ শ’ টাকা পাই যা দিয়ে সংসার চালাই। গত দুই দিন পকেটের টাকা খরচ করে চলেছি। আজ ধার করতে হবে। আগামী কাল থেকে কী হবে আল্লাই জানেন।
রবিবার দুপুরে শহরের নতুন বাস টার্মিনালের ভেতরে তিন দিন ধরে বন্ধ কাউন্টারের সামনেও অবস্থান করছিল দূর-দূরান্ত থেকে আগত যাত্রীরা। পুরো টার্মিনাল জুড়ে সারিবদ্ধভাবে শত শত বাস। এ সময় দেখা যায়, টার্মিনালের ভেতরের একটি অফিসে বসে কয়েকজন চালক ও হেলপার টিভি দেখছেন। তাঁরা দেখছেন সারা দেশের ধর্মঘটের বিস্তারিত সংবাদ। টিভি’র বিজ্ঞাপনের ফাঁকে আলাপ হয় একাধিক চালক ও হেলপারের সাথে। এসময় এ প্রতিবেদককে বাস চালক নুরুল ইসলাম, বাহার উদ্দিন ও হেলাপার সাব্বির আহমদ জানান, জানমালের নিরাপত্তা না থাকায় সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কে গাড়ি চালাতে পারছেন না তাঁরা।
অফিসের পাশে দুইজন হেলপার গাড়ি ধূয়া-মুছার কাজ করছেন। এর পাশে আরও দুইজনে গাড়ি মেরামতের কাজ করছেন। টার্মিনালের ভেতরে ১০-১৫টি চায়ের দোকান বন্ধ রয়েছে। একটি দোকান খোলা আছে কিন্তু কাষ্টমার নেই।
টার্মিনালের সামনে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের পশ্চিম দিকে একটি অফিসে বসে শ্রমিক নেতারা ছোট-খাটো ঘটনার সালিশ করে সময় পার করছেন। কথা হয় সুনামগঞ্জ জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ফারুক আহমদ এবং দপ্তর সম্পাদক মো. ফরিদ আহমদের সাথে। তাঁরা জানান, চলমান ধর্মঘটের আজ ৩য় দিন। টার্মিনালে গত ৩ দিন ধরে বাস, মিনিবাস, মাইক্রোবাস সহ প্রায় ৪ শত গাড়ি বন্ধ রয়েছে। এই ধর্মঘটে জেলার সকল মানুষের ক্ষতি হচ্ছে এবং ভুগান্তি বাড়ছে যাত্রীদের। আমাদের গাড়ি যদি রোডে উঠে তখন এর নিরাপত্তা দেবে কে। এই জন্য আমরা গাড়ি বন্ধ রেখেছি।
রবিবার ভোরে জগন্নাথপুর উপজেলা থেকে সিএনজি করে সুনামগঞ্জ শহরে এসেছেন মো. নুরুল ইসলাম। তিনি কারাগারে দেখতে এসেছেন তাঁর ছেলেকে। এখন বাস কাউন্টারে এসে গাড়ি ছাড়ার অপেক্ষা করছেন তিনি।
যাত্রী আমিনুল হক এসেছেন সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের বেলাবরহাটী থেকে। তিনি চাকুরি করেন সিলেটে। তিনিও গাড়ি ছাড়ার অপেক্ষো করছেন কাউন্টারের সামনে।
সানোয়ারা বেগম ও শাহনাজ বেগম এসেছেন সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের লালপুর গ্রাম থেকে। তারা সন্তানদের নিয়ে নিজ বাড়ি সিলেটের বিছনাকান্দিতে যাবেন। তিনিও গাড়ি ছাড়ার অপেক্ষা করছেন কাউন্টারের সামনে।
যাত্রী রেখা বেগম এসেছেন জেলার বাইরের মোহনগঞ্জের পাশে গাগলাজুর থেকে। তিনি যাবেন সিলেটে। সেখানে কাজ করেন তিনি।
বাস টার্মিনালে কাউন্টারের সামনে অবস্থান করা দূরপাল্লার যাত্রীরা মারাত্মক হতাশায় ভুগছেন। এ সময় এই প্রতিবেদককে জানালেন তাঁদের পরিচিতজনের বাড়িতে উঠার কথাও ভাবছেন তাঁরা। উপজেলা বা গ্রামের স্বজনদের বাড়িতে পৌঁছার আনুমানিক সময় ও দূরত্বের কথাও জেনে নিচ্ছেন বিভিন্ন জনের কাছ থেকে। দুপুরে খাওয়া, গাড়ি দিয়ে যাওয়া, আনুষাঙ্গিক খরচ নিয়ে পকেটে থাকা টাকার হিসাবেও দুশ্চিন্তায় সময় পার করছেন।