সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রয়াণ দিবস আজ

সজীব দে
‘শোন রে মালিক, শোন রে মজুতদার!
তোদের প্রাসাদে জমা হল কত মৃত মানুষের হাড়
হিসাব কি দিবি তার?
…………….
শোনরে মজুতদার,
ফসল ফলানো মাটিতে রোপণ
করব তোকে এবার।’
কৃষক-শ্রমিক-মজুরদের পক্ষে আর শোষক-মালিক-মজুতদারদের অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে কলম ধরা, গণজাগরনের তরুণ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। কবিতায় সমাজতন্ত্রের ধারার প্রবর্তক, সাম্যবাদী এ কবি অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেমন রাজপথে প্রতিবাদ করেছেন, তেমনি তাঁর কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন মালিক শ্রেণী ও বৃটিশদের অত্যাচার-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মুক্তির নিশান। তিনি দেখিয়েছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পথ সংকীর্ণ হলেও এ পথেই মুক্তি।
বাংলা কাব্য সাহিত্যের অন্যতম কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ৭২তম প্রয়াণ দিবস আজ। ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট মাতামহের ৪৩, মহিম হালদার স্ট্রীটের বাড়ীতে তার জন্ম।। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল ফরিদপুর জেলার (বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া থানার উনশিয়া গ্রামে)। পিতা নিবারন ভট্টাচার্য, মা সুনীতি দেবী। আট-নয় বছর বয়স থেকেই সুকান্ত লিখতে শুরু করেন। কবি সুকান্তের প্রথম লেখা একটি গল্প ‘সঞ্চয়’ প্রকাশিত হয় স্কুল ম্যাগাজিনে। তিনি ‘আকাল’ নামে একটি সংকলন সম্পাদনা করেন। এই সংকলনে তার বন্ধু সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরীসহ সে সময়ের অনেক লেখকরা লিখেছেন। ১৯৪৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে অকৃতকার্য হন। এ সময় ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকা-ে যুক্ত হওয়ায় তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে।
১৯৪৪ সালে সুকান্ত ভট্টাচার্য ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। তিনি কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা দৈনিক স্বাধীনতার (১৯৪৫) ‘কিশোর সভা’ বিভাগ সম্পাদনা করতেন। সুকান্তের সাহিত্য-সাধনার মূল ক্ষেত্র ছিল কবিতা। সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, যন্ত্রণা ও বিক্ষোভ তাঁর কবিতার প্রধান বিষয়বস্তু। অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের স্বার্থে ধনী মহাজন অত্যাচারী প্রভুদের বিরুদ্ধে সুকান্ত ছিলেন সক্রিয়। মানুষের কল্যাণের জন্য তিনি নিরন্তর নিবেদিত থেকেছেন। তাঁর রচনাকর্মে গণমানুষের আশা-আকাক্সক্ষার বাণীসহ শোষণহীন এক নতুন সমাজ গড়ার অঙ্গীকার উচ্চারিত হয়েছে।
কবি লিখেছেন,
‘তোমাদের পথ যদিও কুয়াশাময়,
উদ্দাম জয়যাত্রার পথে জেনো ও কিছুই নয়।
তোমরা রয়েছ, আমরা রয়েছি, দুর্জয় দুর্বার,
পদাঘাতে পদাঘাতেই ভাঙব মুক্তির শেষ দ্বার।
আবার জ্বালাব বাতি,
হাজার সেলাম তাই নাও আজ, শেষযুদ্ধের সাথী।’
পুরুষতান্ত্রিক এ সমাজ ব্যবস্থায় আজ নারীরা অত্যাচারিত, নির্যাতিত ও ধর্ষিত। নারীকে মানুষ ভাবা হয় না, তারা যেন শুধুই নারী। কবি সুকান্ত নারীদেরকে আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘মেয়েদের পদবীতে গোলমাল ভারী/অনেকের নামে তাই দেখি বাড়াবাড়ি/‘আ’কার অস্ত দিয়ে মহিলা করার/চেষ্টা হাসির। তাই ভূমিকা ছড়ার/‘গুপ্ত’ ‘গুপ্তা’ হয় মেয়েদের নামে/দেখেছি অনেক চিঠি, পোষ্টকার্ড, খামে/সে নিয়মে যদি আজ ‘ঘোষ’ হয় ‘ঘোষা’/তা হলে অনেক মেয়ে করবেই গোসা/‘পালিত’ ‘পালিতা’ হলে ‘পাল’ হলে ‘পালা’/নির্ঘাৎ বাড়বেই মেয়েদের জ্বালা।’
পার্টি ও সংগঠনের কাজে অত্যধিক পরিশ্রমের ফলে সুকান্ত ভট্টাচার্য দুরারোগ্য ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হন। ‘আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ/র্স্পধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি/আঠারো বছর বয়সেই অহরহ/ বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি।’ আঠারো বছরের মাত্র তিন বছর পর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ১৯৪৭ সালের ১৩ মে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। আজ কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রয়াণ দিবসে তাঁর প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। কবি তাঁর কর্মে আমাদের মধ্যে বর্তমান আছেন, থাকবেন।