সুকুমার রায়ের প্রয়াণ দিবস আজ

সজীব দে

শুনেছ কি ব’লে গেল সীতানাথ বন্দ্যো ?
আকাশের গায়ে নাকি টক্ টক্ গন্ধ ?
টক্ টক্ থাকে নাকো হ’লে পরে বৃষ্টি
তখন দেখেছি চেটে একেবারে মিষ্টি।

শিবঠাকুরের আপন দেশে,
আইন কানুন সর্বনেশে!
কেউ যদি যায় পিছলে প’ড়ে,
প্যায়দা এসে পাকড়ে ধরে,
কাজির কাছে হয় বিচার-
একুশ টাকা দ- তার।

‘পরশু রাতে পষ্ট চোখে দেখনু বিনা চশমাতে,
পান্তভূতের জ্যান্ত ছানা করছে খেলা জোছনাতে’
শিশুদের জন্য এরকম অনেক মজার ছড়া লিখেছেন খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক সুকুমার রায়। ছোটবেলা থেকেই সুকুমার রায় গান গাইতেন, নাটক করতেন, কবিতা লিখতেন, মুখে মুখে তৈরি করে ফেলতেন নানা ধরণের ছড়া। সুকুমার রায়ের লেখনী থেকে যে হাস্যরসের উৎসধারা বাংলা সাহিত্যকে অভিষিক্ত করেছে তা অতুলনীয়। তাঁর সুনিপুণ ছন্দের বিচিত্র ও স্বচ্ছন্দ গতি, তার ভাব সমাবেশের অভাবনীয়। ১৯২৩ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর মাত্র ৩৬ বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ করেন তিনি। সুকুমার রায়কে বলা হয় ভারতীয় সাহিত্যে ‘ননসেন্স রাইমের’ প্রবর্তক। তিনি একাধারে লেখক, ছড়াকার, শিশুসাহিত্যিক, রম্যরচনাকার, প্রাবন্ধিক ও নাট্যকার। জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী ও বিধুমুখী দেবীর ২য় সন্তান সুকুমার রায়।
‘হাঁস ছিল, সজারু, (ব্যাকরণ মানি না),
হয়ে গেলে “হাঁসজারু” কেমনে তা জানি না।
বক কহে কচ্ছপে “বাহবা কি ফুর্তি!
অতি খাসা আমাদের বকচ্ছপ মূর্তি।’
কবিতার সঙ্গে ছিল ‘হাঁসজারু’, ‘বকচ্ছপ’, ‘বিছাগল’, ‘গিরিগিটিয়া’ প্রভৃতি সন্ধিযুক্ত কল্পিত প্রাণীর বিচিত্র সব ছবির সমাহার। যেগুলো আজও সমান ভাবে জনপ্রিয়।
সিটি স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাশ করে ফিজিক্স ও কেমিস্ট্রিতে ডাবল অনার্স নিয়ে ১৯০৬ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বি. এস-সি পাশ করেন সুকুমার রায়। কলেজে থাকতে গড়ে তোলেন ‘ননসেন্স ক্লাব’। তার শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন প্রখ্যাত রসায়নবিদ প্রফুল্লচন্দ্র রায়। ক্লাবের মুখপত্র ছিল হাতে লেখা কাগজ-‘সাড়ে বত্রিশ ভাজা’। ননসেন্স ক্লাবের সভ্যদের নিয়ে অভিনয় করার জন্য দু’টি নাটক লিখেছিলেন সুকুমার ‘ঝালাপালা’ ও ‘লক্ষণের শক্তিশেল’।
‘মাথায় কত প্রশ্ন আসে, দিচ্ছে না কেউ জবাব তার-
সবাই বলে, “মিথ্যে বাজে বকিসনে আর খবরদার!”
অমন ধারা ধমক দিলে কেমন করে শিখব সব?
বলবে সবাই “মুখ্য ছেলে”, বলবে আমায় “গো গর্দভ….!’
এমন আজগুবি অথচ সার্থক রচনা ছিলো সুকুমার রায়ের। ‘আবোলতাবোল’ গ্রন্থের ভূমিকায় নিজেই লিখেছিলেন, ‘যাহা আজগুবি, যাহা উদ্ভট, যাহা অসম্ভব, তাহাদের লইয়াই এই পুস্তকের কারবার। ইহা খেয়াল রসের বই, সুতরাং সে রস যাঁহারা উপভোগ করিতে পারেন না, এ পুস্তক তাঁহাদের জন্য নহে।’
১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলে শিক্ষিত বাঙালিরা অনেকেই শপথ নিয়েছিলেন যে তারা বিদেশী জিনিস ব্যবহার করবেন না। এই নিয়ে তখন সুকুমার রায় একটা গান না লিখেন-
‘আমরা দেশি পাগলের দল,
দেশের জন্য ভেবে ভেবে হয়েছি পাগল,
(যদিও) দেখতে খারাপ টিকবে কম, দামটা একটু বেশী
(তাহোক) তাতে দেশেরই মঙ্গল।’
১৯১১ সালে সুকুমার রায় ‘গুরুপ্রসন্ন ঘোষ স্কলারশিপ’ নিয়ে আলোকচিত্র ও মুদ্রণপ্রযুক্তির ওপর উচ্চতর শিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে যান এবং কালক্রমে ভারতের অগ্রগামী আলোকচিত্রী ও লিথোগ্রাফার হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। আট বছর বয়সে ‘নদী’ নামে তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ‘মুকুল পত্রিকায়। ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় তার প্রথম প্রকাশিত কবিতা দু’টি ছিল ‘বেজায় রাগ’ ও ‘খোকা ঘুমায়’।
‘দ্রিঘাংচু’। একটি গল্পের নাম। এক রাজসভায় অকস্মাৎ একটি দাঁড়কাক প্রবেশ করে গম্ভীর কণ্ঠে ‘কঃ’ শব্দটি উচ্চারণ করার ফলে যে প্রতিক্রিয়া হয় তাই নিয়েই গল্প। গল্পের শেষে রাজামশাইকে রাজপ্রাসাদের ছাতে একটি দাঁড়কাকের সামনে দাঁড়িয়ে চার লাইনের এই মন্ত্র উচ্চারণ করতে হয়। মন্ত্রটি ছিল-
‘হলদে সবুজ ওরাং ওটাং
ইঁট পাটকেল চিৎ পটাং
গন্ধ গোকুল হিজিবিজি
নো অ্যাডমিশন ভেরি বিজি…’
ছোটদের উপযোগী করে সহজ ভাবে তিনি বিজ্ঞানের জটিল বিষয় ব্যাখ্যা করেছেন অজ¯্র রচনার মাধ্যমে। এ বিষয়ে তার প্রথম লেখা প্রবন্ধ ‘সূক্ষ্ম হিসাব’। কত সহজ ভাবে ছোটদের তিনি উপমা সহকারে ‘বেগ’ ও ‘বল’ সম্বন্ধে বুঝিয়েছেন।
‘তাল গাছের উপর হইতে ভাদ্র মাসের তাল যদি ধুপ করিয়া পিঠে পড়ে তবে তার আঘাতটা খুবই সাংঘাতিক হয়; কিন্তু ঐ তালটাই যদি তাল গাছ হইতে না পড়িয়া ঐ পেয়ারা গাছ হইতে এক হাত নীচে তোমার পিঠের উপর পড়িত, তাহা হইলে এতটা চোট লাগিত না। কেন লাগিত না? কারণ, বেগ কম হইত। কোন জিনিস যখন উপর হইতে পড়িতে থাকে তখন সে যতই পড়ে ততই তার বেগ বাড়িয়া চলে। ……।’
‘ঘনিয়ে এল ঘুমের ঘোর
গানের পালা সাঙ্গ মোর’
(আবোল তাবোল)
সুকুমার রায়ের মৃত্যুর কিছুদিন পর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনের মন্দিরে একটি প্রার্থনা সভায় আয়োজন করেন। সভায় তিনি বলেন, ‘আমার পরম স্নেহভাজন যুবকবন্ধু সুকুমার রায়ের রোগশয্যার পাশে এসে যখন বসেছি, এই কথাই বার বার মনে হয়েছে, জীব-লোকের ঊর্ধ্বে আধ্যাত্মলোক আছে। যে-কোন মানুষ এই কথাটি নিঃসংশয়ে বিশ্বাসের দ্বারা নিজের জীবনে স্পষ্ট করে তোলেন, অমৃতধামের তীর্থযাত্রায় তিনি আমাদের নেতা। আমি অনেক মৃত্যু দেখেছি, কিন্তু এই অল্পবয়স্ক যুবকটির মতো অল্পকালের আয়ুু নিয়ে মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে এমন নিষ্ঠার সঙ্গে অমৃতময় পুরুষকে অর্ঘ্যদান করতে আর কাউকে দেখি নি। মৃত্যুর দ্বারের কাছে দাঁড়িয়ে অসীম জীবনের জয়গান তিনি গাইলেন। তাঁর রোগশয্যার পাশে বসে সে গানের সুরটিতে আমার চিত্ত পূর্ণ হয়েছে।’