সুদখোরের কারণে যুবকের আত্মহত্যা/ সুদখোরদের বিরুদ্ধে হত্যার দায় আনা উচিৎ

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় তাহিরপুর উপজেলার বালিজুরি ইউনিয়নের পাতারগাঁও গ্রামের যুবক ফয়সাল আহমদ সৌরভ গত বৃহস্পতিবার সুূদখোরদের যন্ত্রণায় আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহননের আগে তিনি নিজের ফেসবুক ওয়ালে একটি পোস্ট লিখে যান যেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, সফিক ও রফিক নামের দুই সুদখোরের অত্যাচারে তিনি জীবন বিসর্জনের মতো চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। সৌরভের ওই পোস্ট থেকে আরও জানা যায়, তিনি সফিক নামের এক সুদখোরের কাছ থেকে সুদে এক লাখ টাকা ধার নিয়ে ইতোমধ্যে তিন লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন। আসল টাকার দ্বিগুণ সুদ পরিশোধ করার পরও তার নাকি দেনা শোধ হয়নি। সফিক আরও সাড়ে তিন লক্ষ টাকা পাওনা দাবি করে সৌরভকে নানাভাবে হেনস্তা করে চলেছিলো। এই সাড়ে তিন লক্ষ টাকার জন্য সফিকের সহযোগী রফিক নামের আরেক সুদখোর কয়েকদিন আগে সৌরভের পণ্য ভর্তি নৌকা আটকে দেয়। এতে সৌরভ দিশেহারা হয়ে শেষ পর্যন্ত আর কোনো উপায় না পেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। সৌরভের স্ত্রী ও ফাইজা নামের ছোট্ট একটি কন্যা সন্তান রয়েছে।
সুদখোর সফিক ও রফিক তাহিরপুর উপজেলার যথাক্রমে আনোয়ারপুর ও নূরপুর গ্রামের অধিবাসী। বালিজুরি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান স্বীকার করেছেন সুদখোর সফিকের যন্ত্রণার বিষয়টি সৌরভ তাঁকে জানিয়েছিলেন। জানার পর স্থানীয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিসুলভ সামাজিক উদ্যোগ নিলে হয়তো বিষয়টি মিমাংসা সম্ভব হত। কারণ মাত্র এক লক্ষ টাকার জন্য সাড়ে পাঁচ লক্ষ টাকা সুদ দাবি করার মত নির্মমতা কেবল অগ্রহণযোগ্যই নয় বরং নিকৃষ্ট অপরাধও বটে। কিন্তু সুদখোর সফিক ও রফিককে কোনো সামাজিক বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি। সমাজে সুদখোরদের দাপট ও প্রভাব এতে পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান।
কেবল সৌরভ নয়, জনপদের প্রতিটি অঞ্চলে চশমখোর সুদখোরদের দাপট লক্ষণীয়। এদের নির্মমতার কারণে কতো মানুষ ভিটেছাড়া হয়েছেন, কত মানুষ সর্বশ্বান্ত হয়ে নিঃস্ব হয়েছেন, কত মানুষ আত্মহননের মতো চরম পন্থা অবলম্বন করেছেন; তার হিসাব মিলানো কঠিন। এই সুদখোররা গোন্ডা পোষে, প্রভাবশালীদের আশীর্বাদপুষ্ঠ থাকে এবং এরা অতিশয় নির্দয়, ক্রোড় ও অমানবিক প্রকৃতির। এরা খাতককে ভীতি দেখিয়ে ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে টাকা আদায় করে। দুর্বল খাতক কখনও এদের দাপটের সামনে কোনো প্রতিকার পায় না। বিচারের বাণী এখানে নিরবে মাথা খুঁড়ে মরে।
সুদখোরদের দাপট ও অত্যাচারের কাহিনী সুবিদিত হলেও এদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র অবস্থান গ্রহণ করে থাকে এমন বাস্তবতা নেই। ফলে সুদখোররা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সমাজ ও সমাজনেতৃত্বের দায়িত্ব হলো- এমন ঘৃণ্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ ও ঘৃণা তৈরি করা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো- এদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে আইনের প্রয়োগ ঘটানো। একই সাথে উচ্চসুদে যাতে কাউকে ধারদেনা করতে না হয় সেই ধরনের পরিবেশ তৈরির জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো ও সেবা সহজীকরণ।
তাহিরপুরের সৌরভ যে দুই সুদখোরের কারণে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন সেই সফিক ও রফিককে দ্রুত আইনের আওতায় এনে সুবিচার নিশ্চিত করার জন্য আমরা দাবি জানাই। এই সুদখোর দুইজন নিশ্চিতভাবেই হত্যাকারী। এরা শিশু ফাইজাকে চিরতরে পিতৃস্নেহ লাভ থেকে বঞ্চিত করলো এবং একটি তরতাজা জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিলো।