সুনামগঞ্জের উঁচু এলাকার পানি সরেছে /ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে বিস্ময়ে চোখ ছানাবড়া ব্যবসায়ীদের

বিশেষ প্রতিনিধি
পানি কিছুটা কমায় সুনামগঞ্জ শহরের বাণিজ্যিক এলাকায় (অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকা) ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে বিস্ময়ে চোখ ছানাবড়া হয়ে গেছে দোকানিদের। এতো বড় বিপর্যয়ের কথা চিন্তাও করতে পারেন নি তারা। মঙ্গলবার সামান্য রোদের দেখা মেলায় দোকান খুলে বিষন্ন মনে দোয়ামুছার কাজ করছিলেন অনেকে। ব্যবসায়ীরা বললেন, সরকার, ব্যাংক এবং নিজ নিজ ব্যবসার মহাজনদের সহযোগিতা ছাড়া এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয় বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই। কেউ কেউ ব্যবসা ছেড়ে দিতেও বাধ্য হতে পারে। না হয় নতুন করে ব্যবসা শুরু করতে হবে।
সুনামগঞ্জ শহরের পুরাতন বাসস্টেশনের সবচেয়ে বড় পার্সের দোকানী আওলাদ হোসেন বললেন, বৃহস্পতিবার রাত নয়টায় পানি দোকানের সামনের সড়কের দুই ফুট নীচে ছিল, স্টাফদের বাড়িঘর সব ডুবে যাচ্ছে, তারাও রাত ১১ টার দিকে উৎকণ্ঠা নিয়ে বাড়িঘরে গেছে, একজন স্টাফ নিয়ে এতো বড় দোকানের এক র‌্যাক মালামাল গভীর রাত পর্যন্ত উপরে তুলেছি, যাওয়ার সময় মাথায় নিয়েই গেছি, পানি হয়তোবা আরেক র‌্যাক ছুঁয়ে যেতে পারে, কিন্তু দোকান খুলে দেখলাম পানি চার র‌্যাক ছুঁয়েছে। গোদামে আরও খারাপ অবস্থা, কত টাকার ক্ষতি হয়েছে এই মূহূর্তে বলা কঠিন, ছোট-বড় কোন ব্যবসায়ীর পক্ষেই এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। এমন করুণ অবস্থা কেবল পার্সের ব্যবসায়ী আওলাদ হোসেনের নয়। শহরের ওষুধ, পুস্তক, কাপড়, খাদ্যপণ্য, সিমেন্ট, কম্পিউটার সামগ্রীসহ সকল ধরণের ব্যবসায়ীদেরই একই অবস্থা।
শহরের ডিএস রোডের কাপড় ব্যবসায়ী পার্থ দাস বললেন, প্রায় সকল কাপড় ব্যবসায়ীর শো-রুমে বুক সমান পানি ছিল। শেষ রাতে একসঙ্গে তিন-চার ফুট পানি বেড়েছে। কে কিভাবে তার কাপড় সরাবে। যোগাযোগের সকল নেটওয়ার্কও বন্ধ ছিল। বিদ্যুৎ নেই। বাড়ি থেকে শো-রুমে, কিংবা শো-রুম থেকে বাড়ি যাওয়ারও কোন উপায় ছিল না। এই অবস্থায় ডুবে যাবার সময় অনেকে কেবল দাঁড়িয়ে দেখেছেন অনেকে।
শহরের স্টেশন রোডের ওষুধ ব্যবসায়ী আলতাফ হোসেন বললেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানাতেও সংশ্লিষ্টদের দুর্বলতা ছিল। এতো বড় বিপর্যয়ে পূর্বাভাস জানাতে আরও নানা উদ্যোগ থাকা জরুরি ছিল। সেটি হয় নি। মানুষকে সতর্ক করা গেলে ক্ষতি কমানো যেত। শহরের অনেক ওষুধ ব্যবসায়ীর চার-পাঁচ লাখ টাকার ওষুধও ডুবেছে।
পুরাতন বাসস্টেশনের মোটর সাইকেল ও গাড়ীর যন্ত্রাংশের ব্যবসায়ী রিপন মিয়া বললেন, দোকান খুলে মনে হয়েছে চিৎকার দিয়ে কাঁদতে মনে হয়েছে। কমপক্ষে ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
জেলা পুস্তক ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল হোসেন বললেন, সুনামগঞ্জ শহরের প্রায় সবকয়টি পুস্তক ব্যবসা শহরের পৌরবিপণি ও আলফাত স্কয়ার কেন্দ্রীক। এই এলাকায় এর আগে কোনদিন পানি ওঠেনি। তবুও বই-পত্র কিছু ওঠিয়ে গেছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু পানি যে পরিমাণে ওঠেছে, ব্যবসায়ীদের লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। সরকারি প্রণোদনা, ব্যাংক ঋণ মওকূপ ও নতুন ঋণ না পেলে ঠিকে থাকা সকলেরই কঠিন হবে।
সুনামগঞ্জ ব্যবসায়ী সমিতির কোষাধ্যক্ষ চন্দন রায় বললেন, বড় ব্যবসায়ী, ছোট ব্যবসায়ী সকলেরই ক্ষতি হয়েছে। দোকান খুলে অনেকের বিক্রয় করার মতো পণ্যই নেই। সবই ডুবেছে। শহরের প্রাণকেন্দ্রের বড় ব্যবসায়ী থেকে পাড়া-মহল্লার ছোট ছোট ব্যবসায়ী অনেকের ছাল সমান পানি ছিল। কেউ কিছুই রক্ষা করতে পারে নি। সহযোগিতা না পেলে অনেক ব্যবসায়ী ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হবে। বন্যার ক্ষতি কাটাতে ব্যবসায়ীদের পাশে সরকারই দাঁড়াতে হবে।
গ্রামের পানিবন্দি মানুষ ত্রাণ পাচ্ছে না
আবহাওয়া কিছুটা ভালো থাকায় মঙ্গলবার উন্নয়ন সংগঠন, বেসরকারি সংস্থা ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে অনেক ত্রাণ সহায়তাকারী দলকে বানভাসি মানুষদের সহায়তা করতে দেখা গেছে। তবে বেশিরভাগ সহায়তাকারী দল শহরের আশপাশেই ত্রাণ দিয়েছে। পৌর এলাকারও যেখানে বেশি পানি, অর্থাৎ গাড়ি যাচ্ছে না, সেখানে ত্রাণকর্মীদের দেখা যাচ্ছে না।
সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার পাঠানবাড়ি – হাছনবাহারের প্রতিটি ঘরেই ছাল সমান পানি ছিল। এই গ্রামের কিছু বসতঘরও বানের পানিতে ভেসে গেছে। মঙ্গলবার বিকাল ৬ টা পর্যন্ত সেখানে কোন ত্রাণদলকে দেখা যায় নি।
গ্রামের হতদরিদ্র মকদ্দুছ মিয়া ও রমজান মিয়া বললেন, ‘কোন বাড়িতঔ থাকার অবস্থা আছিল না, মঙ্গলবার বাড়িত গেছে কেউ কেউ, মাছা বাইন্দা আছে কয়েক পরিবার, খাওয়া দাওয়ার কোন ব্যবস্থাঔ নাই, কোন সায়-সাইজ্জা (সাহায্য) লইয়াও কেউ আইছে না।’
মঙ্গলবার জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী সুনামগঞ্জ বিজিবি ও বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে বানভাসি মানুষদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে।
দুই লাশ ভেসে ওঠেছে
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার নবীনগর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল্লা বিন ফারুকের লাশ মঙ্গলবার সদর উপজেলার ইসলামগঞ্জ এলাকায় ভেসে ওঠেছে। আব্দুল্লা বিন ফারুকের বাবার নাম ফারুক আহমদ। এর আগের দিন সোমবার শহরতলির ওয়েজখালির ফিরোজ মিয়ার ছেলে কারচালক আলাল মিয়ার লাশ পাওয়া যায়। শুক্রবার বিকালে ওই চালক সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঢল দেখতে সড়কে হাঁটছিল। সুনামগঞ্জ সদর থানার ওসি ইখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী লাশ পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে দুইজনেই বানের পানিতে ডুবে মারা গেছে।
শুক্রবার ভোর রাত থেকে মুঠোফোন, টেলিফোন ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় ভয়াবহ বন্যায় কতজন মারা গেছেন এই তথ্য জানা যায় নি।