সুনামগঞ্জে বাড়ছে সংক্রমণ- এলাকাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণের সময় পেরিয়েছে

১৪ জুন রবিবার রাতের হিসাব মোতাবেক সুনামগঞ্জে করোনা শনাক্তকৃত আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৫৬৬ জন। সদর ও ছাতক উপজেলা করোনার হটস্পট হয়ে উঠেছে। শনিবারের হিসাব অনুযায়ী সদরে ১৪৪ ও ছাতকে ১৪৫ জন শনাক্ত হয়েছেন। একসময় মনে করা হয়েছিল, প্রান্তবর্তী হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ জেলাটিতে করোনার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম থাকবে। এই জেলায় কোনো শিল্প কলকারখানা নেই, জেলাটি প্রান্তসীমার হওয়ায় এখানে বাইরে থেকে মানুষের অভিগম্যতাও কম। তাই মনে করা হয়েছিল করোনা ভাইরাস এখানে বিধ্বংসী হয়ে উঠবে না। কিন্তু এমন অনুমান যে কতো বড় ভুল ছিল তা এখন প্রতিদিন নতুন করে বুঝা যাচ্ছে। শনিবার একদিনেই ৯২ জন আক্রান্ত হওয়ার মতো অশনিবার্তা পাওয়ার পরদিন রবিবার আরও ৪৮ জনের আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেলো। এই অবস্থা বজায় থাকলে জেলার আক্রান্ত সংখ্যা হাজার ছাড়াতে বেশি দিন সময় নিবে না। সুনামগঞ্জ পৌরশহরের অবস্থা ভয়ংকর হয়ে উঠছে বলে অনেকেই আশংকা প্রকাশ করছেন। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে আক্রান্তদের পরিচয় প্রকাশ করা হয় না বলে পৌর শহরের কোন এলাকায় কতোজন আক্রান্ত হয়েছেন তার প্রকৃত তথ্য জানার উপায় নেই। কিন্তু আক্রান্ত অনেকেই নিজেরা কিংবা তাদের স্বজন ও বন্ধুরা কিছু তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করছেন। তাতে সুনামগঞ্জ পৌরশহরের বহু এলাকায়ই শনাক্তকৃত করোনাক্রান্ত ব্যক্তি রয়েছেন বলে জানা যায়। জেলায় পরীক্ষার পরিমাণও কম। তাই শনাক্তবিহীন অবস্থায় কতো রোগী রয়েছেন আমরা জানি না। যোগাযোগ, অফিস, ব্যবসা; সবকিছু অবারিত থাকায় করোনা ঝুঁকি এখন কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। শহর ও হাটবাজারে আগতরা আক্রান্ত হয়ে গ্রামে গিয়ে আরও বহু জনকে আক্রান্ত করার বাস্তবতার সম্মুখীন আমরা। মূলত পুরো বাংলাদেশই এখন জ্বলন্ত উনুনের ফুটন্ত ডেকচির মধ্যে অবস্থান করছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের আশু কোনো লক্ষণ দৃশ্যমান নয়। অন্য ভয়াবহ দিকটি হলো, ভয়াল ভয়ংকর এই ভাইরাসটি নিয়ে আম জনতা ও সরকার-প্রশাসনের ভাবলেশহীন মনোভাব। যেসব স্বাস্থ্যবিধির কথা সাজিয়ে গুছিয়ে বলা হয় মানুষ নিত্যদিন সেগুলোকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলেছে। প্রশাসনযন্ত্র ও সরকারি মনোভাব অতিশয় শিথিল। এই শিথিলতার কারণে গণ মনোভাবও এখন বেপরোয়া ও পরিনামহীন হয়ে পড়েছে। মহামারী নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবস্থাপনা অন্য অনেক অনুষঙ্গের সাথে একটি মনোস্তাত্ত্বিক লড়াইও বটে। সরকারি পদক্ষেপগুলো গণমানুষ তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করে ওখান থেকে পাঠ গ্রহণ করে। নানা সময়ে আমরা কারফিউ, ১৪৪ ধারা বা অন্যবিধ উপায়ে সরকারের কঠোর মনোভাবের সময় মানুষকে ঘরে থাকতে দেখেছি। কিন্তু এই মহামারীর কোনো পর্যায়েই সরকারি তরফ থেকে ওই ধরণের কঠোর বার্তা দিতে দেখা যায়নি। বরং করোনাকে হালকা করে দেখার প্রবণতাই দেখা গেছে। রাষ্ট্র জনগণকে যে পথ দেখায় সেই পথেই হাঁটবে। ফলে যে দুর্যোগকে খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণে আনা যেত সেই দুর্যোগ এখন আমাদেরকে এমন নাগফাঁসে আবদ্ধ করেছে যেখান থেকে উদ্ধার পাওয়ার সহজ কোনো উপায় দেখা যাচ্ছে না।
তবু কিছু করতে হবে। বাঁচার ব্যবস্থা করতে হবে। মৃত্যুহার শতকরা ১.৩৪ ভাগ বলে স্বস্তির কোনো সুযোগ নেই। কারণ শতকিয়ার এই হিসাবটি ছেলেভুলানো। প্রকৃত মৃত্যুহারের হিসাব বের করতে হবে মোট নিষ্পত্তিকৃত কেসের ভিত্তিতে। ১৪ জুন পর্যন্ত মোট সুস্থ্য ১৮৭৩০, মৃত্যু ১১৭১, মোট নিষ্পত্তিকৃত কেস ১৯৯০১। অর্থাৎ আক্রান্ত বিবেচনায় নিষ্পত্তির হার ২২.৭৩%। নিষ্পত্তিকৃত কেস বিবেচনায় মৃত্যুহার ৫.৮৮%। এই মৃত্যুহার অপরিবর্তিত থাকলে ১৪ জুন পর্যন্ত শনাক্তকৃত ৮৭৫২০ টি কেস নিষ্পত্তি হওয়া পর্যন্ত ৫১৪৬ জনের মৃত্যুর আশংকা বিদ্যমান। পরবর্তী দিনগুলোতে আক্রান্তদের এই হিসাবে অন্তর্ভূক্তি ও বিদ্যমান চরম চিকিৎসা সংকট বিবেচনায় নিলে মৃত্যুসংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এই পরিসংখ্যান কি কখনও স্বস্তিদায়ক হতে পারে?
আমরা আলোচনা শুরু করেছিলাম সুনামগঞ্জের পরিস্থিতি নিয়ে, চলে এসেছে জাতীয় প্রসঙ্গ। করোনা এমন এক সংকট এই সময়ে এসে যার এলাকাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ আর সম্ভব নয়। ফলে সরকারের রেডজোন ভিত্তিক কর্মসূচিগুলোও তেমন ফলপ্রসূ হবে না। এখন যা করতে হবে তা পুরো দেশ নিয়ে করতে হবে। বহির্দেশীয় যোগাযোগও বন্ধ রাখতে হবে। জানি না রাষ্ট্রীয় দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা সেইভাবে পুনর্বিনস্ত করা হবে কিনা।