সুনামগঞ্জে বিদ্যুতের সাব-স্টেশন বন্ধ করে দিলে কেমন হয়?

স্বপন কুমার দেব
(একটি রম্য আলোচনা)
বাঙালকে হাইকোর্ট দেখানো হচ্ছে এমন একটা প্রচলিত কথা আমাদের মধ্যে চালু আছে। এখানে বাঙাল বলতে মুর্খ, অশিক্ষিত, বোকা মানুষদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। ভিন্ন আঙ্গিকে ওপার বাংলা বা পশ্চিম বাংলার বাঙালিদের বলা হয় ‘ঘটি’। তদানীন্তন পূর্ব বাংলা থেকে বা এরও আগে এই অঞ্চল থেকে ওখানে গিয়ে যারা বসতি স্থাপন করেছিলেন তাদেরকে সেখানকার বাঙালিরা তুচ্ছার্থে সম্বোধন করতেন ‘বাঙাল’ বলে। এক সময়ে কলকাতায় বাঙাল খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত হয় বিখ্যাত ফুটবল দল ‘ইস্ট বেঙ্গল’। ঘটিরা তাদের স্থানীয় প্লেয়ারদের নিয়ে গঠন করেন আরেক বিখ্যাত ফুটবল দল ‘মোহনবাগান’। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বি দুটি ঐতিহ্যবাহী দলের পূর্বতন জৌলুস আর নেই। দুই দলের খেলার দিন ঘটি-বাঙালের উত্তেজনা ছিল দেখার মতো। বাঙালদের প্রতীক জোড়া ইলিশ আর ঘটিদের চিংড়ি মাছ। তবে কলকাতা শহরে জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাঙালরাই এগিয়ে এবং তাদের দাপটও বেশী। আগে তো ঘটি-বাঙালদের মধ্যে বিয়েই হতো না। যাই হোক এখন সেখানকার পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে এখন ব্যবধান ও ঝগড়া ফ্যাসাদ অনেক কমে গেছে। সেই পটভূমিতে তদানীন্তন পূর্ব বাংলা বা বর্তমান বাংলাদেশের সব বাঙালিই বাঙাল। বাঙাল শব্দের মধ্যে একটা গর্ববোধও লুকিয়ে আছে। মনে হয় বাঙাল মানে খাঁটি বাঙালি। আবার বৃহত্তর সিলেট ও কাছাড় অঞ্চলের বাঙালিরা সিলেটি হিসবেও একটা আলাদা আভিজাত্য অনুভব করেন। যাই হোক বিষয়বস্তু হলো বিদ্যুতের সাব-স্টেশন/পাওয়ার গ্রীড্ ইত্যাদি নিয়ে। প্রায় দু’তিন মাস হলো অনেক গ্যাঞ্জাম অতিক্রম করে সুনামগঞ্জে বহু প্রতিক্ষিত বিদ্যুতের সাব-স্টেশনটি চালু হয়েছে। এতোদিন চালু হওয়ার আগে আমরা সুনামগঞ্জবাসী বাঙালদেরকে প্রতিনিয়ত বিদ্যুত বিভাগের বড়, ছোট, মাঝারি সব কর্মকর্তাই বুঝিয়েছেন সাব-স্টেশন চালু হয়ে গেলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। ২৪ ঘন্টা আমরা বিদ্যুৎ পাব। আর ছাতকের দোহাই দিতে হবে না। এখন বুঝা যায় আসলে এ ধরণের আশ্বাস দেয়ার মধ্যেও লুকিয়ে ছিল বেশ কিছুটা তামাশা। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সরবরাহ, বিতরণ সবই একটা জটিল ট্যাক্নোলজি। কর্তৃপক্ষ অবশ্যই আরো বেশী ট্যাকনিক্যাল। উনারা সে ধরণের প্রযুক্তি বিদ্যায় ডিগ্রিপ্রাপ্ত ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তা জনগণের ট্যাক্সের টাকায়ই হোক আর অন্যভাবেই হোক। আমরা যে যার লাইনে যত শিক্ষিতই হই না কেন বিদ্যুতের ট্যাকনিক্যাল বিষয়টি সাধারণের জানা থাকার কথা নয়। সিস্টেম লস, ভোল্টেজ আপ-ডাউন, লোডশেডিং, লাইনে ফল্ট, ট্রান্সফরমার র্বাস্ট, ফিউজ চলে যাওয়া, প্রিপেইড মিটার, ঘন্টার পর ঘন্টা টেলিফোনে এনগেইজড্ টোন ধ্বনিত হওয়া অনেক কিছুই সাধারণ মানুষ বোঝেন না। সাব-স্টেশন চালু হওয়ার পর অবস্থার কী বিশেষ পরিবর্তন হয়েছে? অদ্য ০৮.০৬/২০১৮ ইং তারিখ দুপুর দুটো থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ঘোষণা দিয়েই বিদ্যুৎ ছিল না। তারপর অঘোষিতভাবে এই আসে এই যায় অবস্থা। লিখতে লিখতে একাধিকবার বিদ্যুতের আসা যাওয়া চললো। আসা ক্ষণিকের অতিথির মতো, আর যাওয়া দীর্ঘক্ষণের। প্রতিদিনই নিয়মিত লোডশেডিং কিংবা ব্ল্যাক আউট চলছে। পুরানো কায়দায় কিছুটা হলেও ছাতকের নাম উঠে আসছে। খবরে জানা যায় জাতীয় গ্রীড লাইন থেকে ছাতক সাব-স্টেশন হয়ে আমাদের সাব-স্টেশনে বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়। তার উপর সুনামগঞ্জ শহরের ভিতরে বিদ্যুৎ লাইনগুলি সার্বক্ষণিক সরবরাহের উপযুক্ত নয়। অর্থাৎ লোড্ নিতে পারে না। ছাতক শহরের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। তবে এতো ঘটা করে সাব-স্টেশন তৈরী করে কী হলো? টাকার শ্রাদ্ধ? না সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় এমন কিছু আড়ালে আছে? এখন তো মনে হয় বিদ্যুতের লাইন প্রথমে মজবুত করে সাব-স্টেশন করলেই ভালো হতো। প্রসঙ্গত: উল্লেখ করা যায় সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক থানা বা উপজেলা ব্যবসা বাণিজ্যে ও অন্যান্য অনেক বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। আশির দশকে একবার ছাতক উপজেলা সিলেট জেলার সাথে প্রায় সংযুক্ত হয়ে যা্িচ্ছল। সুনামগঞ্জবাসী অনেক আন্দোলন করেছিলেন। নিকারে প্রস্তাব ও পাশ হয়ে গিয়েছিলো। শুধু বাকী ছিলো রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর দস্তখত। ছাতক চলে গেলে সুনামগঞ্জের গুরুত্ব অনেকটাই কমে যেতো। বিভিন্ন ট্যাকনিক্যাল কারণে দেরি হতে হতে ক্ষমতার পট পরিবর্তনে সব কিছুই বদলে যায়। এখন বলতে ইচ্ছে করে সাব-স্টেশনকে উপলক্ষে করে আমাদের যেন আবার ছাতককে হারাতে না হয়। ভালো মন্দ মিশিয়ে ছাতককে নিয়েই পথ চলা। পত্রিকা অফিসে লেখা ঠিকঠাক করার সময় এই মাত্র আবার বিদ্যুতের অর্ন্তধান। ধন্যবাদ বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকেÑলেখার একটা ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দেয়ার জন্য।
লেখক : সিনিয়র আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক