সুনামগঞ্জ টেক্সটাইল ইন্সটিটিউট- কর্মমুখী শিক্ষায় উন্মোচিত হলো নতুন দ্বার-আগামীকাল ভিত্তিপ্রস্তর

মাহবুবুল হাছান শাহীন
হাওর বেষ্টিত ৭ জেলার মধ্যে অন্যতম সুনামগঞ্জ জেলা। মেঘালয়ের পাদদেশে বাংলাদেশের উত্তর পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত সুনামগঞ্জ জেলা। সারা জেলায় ১৫৪টি হাওর প্রতিটি উপজেলাকে বেষ্টিত করে রেখেছে। প্রকৃতির অপূর্ব সৃষ্টি এই হাওর ৬ মাস থাকে পানির নিচে। বাকি ৬ মাস বোরো ফসল উৎপাদন হয়। একটি ফসলের উপর নির্ভর করে সারা বছর এখানকার মানুষ তাদের জীবনযাত্রা নির্বাহ করে।
আমরা হাওর অঞ্চলের মানুষ হওয়ার কারণে প্রকৃতিগত ভাবেই অলস প্রকৃতির। ৬ মাসের কৃষিযজ্ঞ বোর ফসল তোলার পর পরবর্তী ৬ মাস আর কোন কর্ম খোঁজা হয় না। অথবা অন্য কোন কর্মের সুযোগ থাকে না। অলস দিন পার করে জেলার ৮০ ভাগ মানুষ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে এরকম জীবনযাত্রায় মানুষের নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার যোগার। দীর্ঘদিন ধরেই এখানকার মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের দাবি গণদাবিতে পরিণত হয়েছে।
বর্তমান সরকার ডিজিটাল ও কর্মমুখী শিক্ষার প্রসারে নিরলসভাবে কাজ করছে। একমাত্র কর্মমুখী শিক্ষাই পারে মানুষের জীবনমান পরিবর্তন করতে। এরই অংশ হিসাবে সুনামগঞ্জের মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান ও পরবর্তী প্রজন্মকে কর্মমুখী রাখতেই আগামীকাল ৭ই অক্টোবর সুনামগঞ্জ টেক্সটাইল ইন্সটিটিউটের শুভ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হচ্ছে। আগামী এক বছরের মধ্যেই অর্থাৎ ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষেই ছাত্রছাত্রী ভর্তি হতে পারবে।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার মৎস্য হ্যাচারীর বিপরীত দিকে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের পূর্ব পাশে পঞ্চাশহাল মৌজায় ৫ একর জমির উপর এর অবকাঠামো নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে। যৌথভাবে ইনস্টিটিউটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম এবং অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান। সুনামগঞ্জ শহরের তরুণ শিল্পপতি গার্মেন্টস শিল্পের অন্যতম উদ্যোক্তা শ্যামল রায় সুনামগঞ্জে একটি টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট স্থাপনের জন্য অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নানকে উদ্বুদ্ধ করেন। ২০১৪ সালে তিনি অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নানের কাছ থেকে একটি (ডিও লেটার) আধা সরকারি পত্র নিয়ে বস্ত্র অধিদপ্তরে জমা দেন ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। পরে এমএ মান্নানের সহযোগিতায় এই প্রকল্প প্রস্তাবনাটি পর্যায়ক্রমে বস্ত্র অধিদপ্তর, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় ও একনেকে অনুমোদন হয়। গত ১৬ সেপ্টেম্বর বস্ত্র অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সুনামগঞ্জ টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটের অবকাঠামো নির্মাণের চূড়ান্ত মাস্টারপ্লান অনুমোদন করেন। ১০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয়েছে। গত বছরের ২৫ এপ্রিল এই প্রকল্পের প্রস্তাবনা একনেকে অনুমোদনের পর ২৩ মে পরিকল্পনা বিভাগ এবং ২০ জুন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকল্প অনুমোদনের প্রশাসনিক আদেশ জারী করা হয়। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা সদর এলাকার পঞ্চাশহাল মৌজায় ১১ কোটি ৭২ লাখ ব্যয়ে ৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ৫ একর জমিতে সুনামগঞ্জ টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট স্থাপনে ১০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২০ সালের জুন মাস পর্যন্ত। আরও দুই একর জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। দুই একর জমি অধিগ্রহণ করা সম্ভব হলে, ফুটবল খেলার মাঠ ও একটি করে বালিকা ও বালক হোস্টেল নির্মাণ করা হবে।
সুনামগঞ্জ টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন ভবন ও প্রশস্ত রাস্তা-ঘাট নির্মাণ করা হবে। থাকবে ফুটবল খেলার মাঠ, সাধারণ মাঠ, সকল ভবনের মাঝে একটি পুকুর, দুইটি প্রবেশপথ।
সুনমগঞ্জ টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটের জন্য নির্মাণ করা হবে- একটি একাডেমিক ভবন, একটি ওয়ার্কশপ কাম লাইব্রেরি ভবন, একটি স্পিনিং শেড (কটন ও জুট), একটি ওয়েভিং ও নিটিং শেড, একটি ড্রায়িং শেড, অধ্যক্ষের বাসভবন একটি, একটি বালিকা হোস্টেল ভবন, একটি বালক হোস্টেল ভবন, একটি অফিসার্স ডরমেটরি ভবন, একটি কর্মচারী ডরমেটরি ভবন, একটি মসজিদ, একটি বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণাগার, একটি শহীদ মিনার, একটি ব্যাডমিন্টন কোর্ট ও যানবাহনের জন্য পার্কিং স্থান।
প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান বললেন, ‘এই ইন্সটিটিউটকে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে রূপান্তর করতে চাই আমি।’ এখান থেকেই ছাত্রছাত্রীরা আগামীতে বিএসসি ডিগ্রি নিতে পারবে। এছাড়াও আরো বেশ কিছু টেকনিক্যাল স্কুল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান সুনামগঞ্জ স্থাপনের জন্য তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। শীঘ্রই সুনামগঞ্জে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমি সুনামগঞ্জ জেলার অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার অনুরোধ করব। ঘরের পাশের এরকম ইন্সটিটিউটে আমাদের সন্তানদের ভর্তি করে তাদের জীবনের লক্ষ ঠিক করে দিতে হবে। সিলেটের মানুষদের কর্মবিমুখতার যে বদনাম তা ঘুচাতে হবে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম গড়ে উঠবে তাদের নিজস্ব চিন্তা চেতনায় এবং পরিশ্রম দ্বারা তারাই তাদের ভাগ্য নির্মাণ করবে।
প্রকাশ্যে এবং নেপথ্যে যাঁরাই এ ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত আমি সুনামগঞ্জ জেলার সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে তাঁদেরকে অভিনন্দন জানাই। ভবিষ্যতে আরো কর্মমুখী প্রতিষ্ঠান সুামগঞ্জে গড়ে উঠবে, সে মানুষগুলোই তাদের নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে এ আশাবাদ ব্যক্ত করছি।
লেখক : আইনজীবী ও আইন সম্পাদক পৌর আওয়ামী লীগ, সুনামগঞ্জ।