সুনামগঞ্জ পৌরসভার ভিজিএফের চাল ও টাকা বিতরণে অনিয়ম

স্টাফ রিপোর্টার
সুনামগঞ্জ পৌরসভায় গত ফেব্রুয়ারি মাসে তিন হাজার মানুষের মধ্যে বিশেষ ভিজিএফের চাল ও টাকা বিতরণে অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত কাজ এগিয়ে চলছে বলে জানা গেছে।
ভিজিএফের ৯০ মেট্রিক টন চাল ও ১৫ লাখ টাকা বিতরণে অনিয়ম ও আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)।
তদন্ত কমিটির কাছে লিখিত বক্তব্য প্রদান করেছেন পৌরসভার ৯ জন কাউন্সিলর। কাউন্সিলরগণ লিখিত বক্তব্যে জানিয়েছেন, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ভিজিএফ ও নগদ টাকা বিতরণ করা হয়নি। চাল ও নগদ টাকা বিতরণের বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না।
চাল ও নগদ টাকা বিতরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসনের ট্যাগ অফিসার (জেলা প্রতিবন্ধী কল্যাণ কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন) জানিয়েছেন তিনি এ সবের কিছুই জানেন না। চাল ও টাকা বিতরণের সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন না।
তদন্ত কমিটির আহবায়ক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ সফিউল আলম দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরকে বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে কয়েকদফা তদন্ত করেছি। পৌরসভার কাউন্সিলর, সচিব ও একজন ট্যাগ অফিসার লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন। জেলা প্রশাসকের ট্যাগ অফিসার প্রতিবন্ধী কল্যাণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা জানিয়েছেন চাল ও টাকা বিতরণের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। প্রাথমিক তদন্তে ভিজিএফ কার্ড, মাস্টাররোলসহ নানা অনিয়ম পাওয়া গেছে। তদন্ত কাজ চলমান রয়েছে। প্রশাসনিক কাজের ঝামেলা থাকায় তদন্ত কাজ সম্পন্ন হয়নি। আমরা আশা করছি আগামী মাস খানেকের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে পারব।’
প্রসঙ্গত, সুনামগঞ্জ পৌরসভার গত ফেব্রুয়ারি মাসের ভিজিএফ এর চাল ও নগদ টাকা বিতরণ নিয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত সংবাদে কাউন্সিলদের অভিযোগ ছিল, ওই মাসের ৯০ মেট্রিক টন চাল ও ১৫ লাখ টাকা বিতরণ না করে আত্মসাত করা হয়েছে।
সংবাদ প্রকাশের পর তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম গত ১৪ জুন পাঁচ সদস্যের এই কমিটি গঠন করেন।
জেলা প্রশাসকের করে দেওয়া কমিটিতে আহবায়ক হিসেবে আছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)। সদস্য হিসেবে আছেন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি একজন, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা। কমিটিকে সাত কার্য দিবসের মধ্যে সরেজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেননি। তবে তদন্ত কাজ চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন কমিটির প্রধান।
প্রসঙ্গত, সুনামগঞ্জে গত বছর হাওরে ব্যাপক ফসলহানির পর এপ্রিল মাস থেকে সরকার জেলায় ১ লাখ ৬৮হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারকে বিশেষ ভিজিএফ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল ও নগদ ৫০০টাকা করে পুরো এক বছর সরকার এই সহায়তা দেয়া হয়। এই সহায়তা সুনামগঞ্জ পৌরসভায় পেয়েছে তিন হাজার পরিবার। এ জন্য পৌরসভাকে প্রতিমাসে ৯০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ১৫ লাখ টাকা দেওয়া হত।
কিন্তু সুনামগঞ্জ পৌরসভায় গত ফেব্রুয়ারি মাসের ৯০ মে. টন চাল ও নগদ ১৫ লাখ টাকা বিতরণে অনিয়ম ও আত্মসাতের অভিযোগ তুলেন পৌরসভার সাতজন কাউন্সিলর। তাঁরা বিষয়টির প্রশাসনিক তদন্ত চেয়ে জেলা প্রশাসকের নিকট আবেদনও করেন। পৌর শহরের হাসননগর এলাকার আবুল কাশেম নামের এক ব্যক্তি একইভাবে ফেব্রুয়ারি মাসের চাল ও টাকা পাননি বলে অভিযোগ করেন।
অভিযোগকৃত ভিজিএফ’র চাল ও টাকা বিতরণের সময় পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্বে ছিলেন কাউন্সিলর হোসেন আহমদ রাসেল। তিনি গত ৩০ এপ্রিল নতুন নির্বাচিত পৌর মেয়র নাদের বখতের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন।
পৌর কাউন্সিলদের অভিযোগ ছিল, গত ফেব্রুয়ারি মাসের চাল ও টাকা বিতরণ না করে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই চাল ও টাকা আত্মসাতের সঙ্গে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত মেয়র হোসেন আহমদ রাসেল জড়িত।
তবে কাউন্সিলর হোসেন আহমদ রাসেল এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। তখন তিনি দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরকে বলেছিলেন, যেসব কাউন্সিলর অভিযোগ করেছেন তারা উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে এটা করছেন। চাল ও টাকা যথাযথভাবে বিতরণ করা হয়েছে। চাল ও টাকা বিতরণের মাস্টাররোলে এই কাউন্সিলরদের কয়েকজনের স্বাক্ষর আছে। এখন ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে তারা আমার সম্মানহানির জন্য এটা করছেন। চাল ও টাকা বিতরণে কোনো অনিয়ম হয়নি।
উল্লেখ্য-‘ফেব্রুয়ারি মাসের চাল নিয়ে বিভ্রান্তি’ শিরোনামে গত ২২ মে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর গত ১২ জুন ‘পৌরসভার ফেব্রুয়ারি মাসের ভিজিএফ বিতরণ’/কাউন্সিলরদের প্রশাসনিক তদন্তের আবেদন’ এবং গত ২০ জুন ‘ভিজিএফ ও টাকা বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন ’ শিরোনামে কয়েকটি সংবাদ দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত হয়।