সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়ক-২ বছরেও শুরু হয়নি প্রশস্তকরণের কাজ

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের প্রস্ত এখন ১৮মিটার। সরু এই সড়ক দিয়ে যানবাহন চলে ঝুঁকি নিয়ে, প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা। তাই দুই বছর আগে সড়কের দুই পাশে আরও তিন ফুট করে ছয় ফুট বাড়ানোর জন্য প্রায় ৮০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কাজের দরপত্র আহবান, বাতিল, পরে আদালতের স্থগিতাদেশসহ নানা কারণে দুই বছরেও কাজ আর শুরু হয়নি। কবে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে সেটিও নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ দ্রুত শুরু করার দাবিতে সুনামগঞ্জ পরিবহন মালিক ও শ্রমিকেরা একাধিকবার মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদানসহ পরিবহন ধর্মঘট পালন করেছেন। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। এতে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন যাত্রীরা। যাত্রীদের দাবি থাকলেও সরু সড়কের কারণে পরিবহন মালিকেরা ওই সড়কের ভালো বাস নামাতে পারছেন না।
সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের দূরত্ব ৬৮ কিলোমিটার। সুনামগঞ্জ জেলার মানুষের ঢাকাসহ অন্যান্য জেলায় যোগাযোগের প্রধান সড়ক এটি। কিন্তু সড়কটি সরু হওয়ায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। এই আশঙ্কায় যানবাহন চলে ধীরগতিতে। এতে সময় লাগে বেশি। সিলেট যেতে যেখানে এক থেকে দেড় ঘণ্টা লাগার কথা সেখানে লাগছে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা।
সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়ক বর্তমানে ১৮ফুট প্রশস্ত (পাকা)। ২০১৬ সালের মার্চ মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক) সড়কটি প্রশস্তকরণে একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়। সড়কের দুই পাশে আরও তিন ফুট করে চয় ফুট পাকা করার কথা। এরপর সড়ক জনপথ বিভাগের সিলেট কার্যালয় থেকে কাজের দরপত্র আহবান করা হয়। ঠিকাদারেরা দরপত্রে অংশগ্রহণ করার পর সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রধান কার্যালয় থেকে ‘জনস্বার্থে’ ওই দরপত্র বাতিল করে আবার দরপত্র আহবান করা হয়। দ্বিতীয়বার দরপত্র আহবান ও গ্রহণের পরে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে রিট করলে কাজ আটকে যায়। বর্তমানে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের বিষয়টি সুরাহা হওয়ার পর আবার দরপত্র আহবান করে সড়ক বিভাগ। এখন দরপত্র গ্রহণ ও যাচাই-বাছাই শেষে বিষয়টি সড়ক বিভাগের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সুনামগঞ্জ শহর থেকে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার পাগলাবাজার পর্যন্ত প্রায় ২০কিলোমিটার সড়ক গেছে দেখার হাওরের পাশ দিয়ে। বিভিন্নস্থানে সড়কের দুই পাশের মাটি সরে সড়ক আরও সরু হয়ে গেছে। প্রতি বছর সড়কের পাশে যেনতেনভাবে মাটি ফেলা হয়। বৃষ্টি হলেই ওই মাটি আবার সরে যায়। একটি বাস আরেকটিকে সাইড দিতে হয় ঝুঁিক নিয়ে। কোনো কোনো স্থানে একটি বাস দাঁড়িয়ে আরেকটিকে যাওয়ার সুযোগ দিতে হয়। সড়কের পাগলা বাজার, ছাতক উপজেলার জাউয়া বাজার ও গোবিন্দগঞ্জ বাজার এলাকায় দুই পাশে অবৈধ দোকানপাট গড়ে ওঠায় এসব স্থানে যানজট লেগে থাকে। একে তো সরু সড়ক তার ওপর যানজটে পড়ে ভোগান্তি পোহাতে হয় যাত্রীদের। যাত্রীবাহী বাস এসব বাজার এলাকায় আটকে থাকে।
জাউয়াবাজার এলাকার বাসিন্দা রাজ উদ্দিন বলেন,‘সড়কের প্রস্ত কম, একটি বাস বা ট্রাক আরেকটিকে ক্রস করতে গিয়েই দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। জাউয়াবাজার, চেচান, রাউলি, কৈতক এলাকায় সড়ক সরু হওয়ায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে।’ সড়কের সদর উপজেলার নীলপুর বাজার এলাকার বাসিন্দা মহিনুর ইসলাম বলেন,‘দুই বছর ধরি হুনরাম সড়কের পাশ (প্রশস্ত) বাড়ব। এইটাই এখন বড় সমস্যা। এর কারণে অ্যাক্সিডেন্ট হয় বেশি। কিন্তু কাজ তো আর অর না।’
সুনামগঞ্জ শহরে ওয়েজখালী এলাকায় কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে কয়েকজন বাস চালক জানান, এক সময় এই সড়কের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। ভাঙাচোরা সড়কে যানবাহন চলত হেলেদুলে। সড়কে ১২টি সেতু ছিল জরাজীর্ণ। এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর জরাজীর্ণ সেতুগুলোর স্থানে নতুন ১১টি সেতু করেছে। এখন এই সড়কের বড় সমস্যা হচ্ছে প্রস্ত কম। এটা বাড়ানো জরুরি। বাস চালক কাউসার মিয়া বলেন, সড়ক প্রশস্ত হলে দ্রুত গতিতে গাড়ি চালানো যেত। এতে সময় বাঁচত। কিন্তু এখন ঝুঁকি নিয়ে ধীরগতিতে গাড়ি চালাতে হয়।
সুনামগঞ্জ জেলা বাস, মিনিবাস ও মাইক্রোবাস মালিক গ্রুপ সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ পৌর শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, ছাতক ও দিরাই উপজেলা শহর থেকে প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে প্রায় চারশ’ বাস সিলেটে যাওয়া-আসা করে। এর বাইরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও শতাধিক বাস চলাচল করে। এর সঙ্গে রয়েছে ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহন। সংগঠনের জেলা শাখার মহাসচিব মোহাম্মদ জুয়েল মিয়া বলেন,‘সরু সড়কের দুই পাশে হাওর, খাল। যানবাহন চলে মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। মালিকেরা নতুন বাস নামাতে ভয় পান। সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের কাজ দুই বছরেও শুরু না হওয়ায় আমরা হতাশ। আমরা বিভিন্ন সময় মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান ও পরিবহন ধর্মঘটের মতো কর্মসূচি পালন করেছি। কিন্তু কোনো ফল হয়নি।’
সড়ক ও জনপথ বিভাগ সিলেটের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আনোয়ারুল আমিন বলেন,‘নতুন করে দরপত্র আহবানের পর সেগুলো যাচাই-বাছাই করে সড়ক বিভাগের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। তারা সেটি মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। এরপর সেটি অনুমোদন হলে কাজ হবে।’ কবে কাজ শুরু হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।