সুনামগঞ্জ সীমান্তের পাহাড় টিলা কাটছে একদল ভূমিদস্যু

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ সীমান্তে উঁচু টিলা ও পাহাড় কেটে আবাদি জমি করার চেষ্টা করছে ভূমিখেকোরা। একারণে হুমকির মধ্যে পড়ছেন সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা। পাহাড়-টিলা কাটতে স্থানীয় প্রশাসনের বাধা নিষেধও এরা মানছে না। ভূমিখেকো এই চক্র সীমান্তের রঙ্গারচর ইউনিয়নের কান্দিগাঁও সংলগ্ন পাহাড়ে থাকা শাহ্ আরেফিন (র.)’এর মোকামের টিলার মাটিও কেটে নিচ্ছে। টিলার মাটি কাটায় ধসে পড়ার আশঙ্খা করা হচ্ছে শাহ্ আরেফিন (র.) আস্থানাও।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার রঙ্গারচর ও জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের বেশ কিছু অংশ রয়েছে ভারতের মেঘালয়ের উঁচু পাহাড় ঘেষা। বাংলাদেশের কিছু অংশেও ছোট ছোট পাহাড় রয়েছে। সদর উপজেলার রঙ্গারচর ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম রয়েছে পাহাড়ের কূলঘেষে, কিছু কিছু অংশে ছোট ছোট পাহাড়ও রয়েছে। এসব অঞ্চলে বহুকাল আগেই হাসাউড়া, দর্পগ্রাম, চিনাউড়া, রংপুর ও কান্দিগাঁওসহ নানা নামের গ্রাম- জনবসতি গড়ে ওঠেছে।
নতুন বসতি স্থাপনকারীদের কেউ কেউ পাহাড় টিলা কেটে বাড়ি, স্থাপনা ও সড়ক নির্মাণ করায় হুমকির মধ্যে পড়ছেন অন্যরা।
সম্প্রতি কান্দিগাঁওয়ের টিলায় থাকা শাহ্ আরেফিন (র.)’এর মোকামের দক্ষিণ দিকের একাংশ কেটে জমি করার উদ্যোগ নেন গ্রামের আব্দুল গণির ছেলে হানিজুল ওরফে হায়দার। মোকাম কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক বাধা দেবার পরও টিলার মাটি কেটে নেওয়ায় এলাকাবাসী বিষয়টি পুলিশকে জানান। পুলিশ পরে গেল ২৭ ডিসেম্বর হানিজুলকে থানায় এনে মুছলেখা আদায় করে ছাড়ে। হানিজুল আর কোনদিন টিলার মাটি কাটবে না বলেও লিখিত দেয়। মুছলেখা দেবার পরও হানিজুল ওখানে আবার মাটি কেটেছেন বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
মঙ্গলকাটার সমাজকর্মী আব্দুল রব জানান, এলাকাবাসীর হাজার হাজার মানুষের আবেগের স্থান শাহ্ আরেফিন (র.)’এর মোকামের মাটি কাটা ঠেকানো যাচ্ছে না। একজনকে বন্ধ করলে আরেকজন টিলা কাটা শুরু করে। হানিজুল কেটেছে শাহ আরেফিন (র.) টিলার দক্ষিণের অংশ। আবার পশ্চিমের কিছু অংশ স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের নির্দেশে কেটে ফেলা হয়েছে।
আব্দুর রব বললেন, এই সীমান্তের বেশ কিছু স্থানে পাহাড় কেটে কেউ কেউ জনবসতি ও জমিজমা করছে। এতে সকলেই হুমকির মধ্যে থাকেন। তিনি জানান, গেল বছর সীমান্তের হাসাউড়া দর্প গ্রামে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছিল।
শাহ্ আরেফিন (র.)’এর মোকাম কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান বললেন, ছয় একর ৪২ শতাংশ জমি রয়েছে শাহ্ আরেফিন (র.) মোকামের টিলার উপরে। এই টিলা মাঝে মাঝে কেউ কেউ কাটার উদ্যোগ নেয়।
ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা আরব আলীও টিলা কেটেই বাড়ি নির্মাণ করেছেন। তিনি দাবি করলেন, রেকর্ডিয় জমিতেই তিনি বাড়ি করেছেন। তাদের অনেকের রেকর্ডিয় জায়গা রয়েছে টিলার ওপর। ওখানেই তারা আনারস ও কাঠাল বাগান করে থাকেন বলে দাবি করলেন তিনি।
ইউনিয়নের বিরামপুরের বাসিন্দা সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক অ্যাডভোকেট নূরে আলম সিদ্দিকী উজ্জল বললেন, স্থানীয় কিছু লোক পাহাড় কাটছে শুনে গত সপ্তাহে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি পাহাড় কাটা বন্ধ করে এসেছেন।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বললেন, শাহ্ আরেফিন (র.) মোকামের টিলার দক্ষিণ-পশ্চিমের সামান্য কিছু অংশ মানুষের চলাচলের সুবিধার জন্য কাটা হয়েছে। অন্য অংশ কাটার পর, দায়িদের পুলিশ থানায় নিয়ে মুছলেখা দিয়ে ছেড়েছে। পরে আবার তারা টিলা কেটেছে। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসমিন নাহার রুমা বলেন, সীমান্তের শাহ্ আরেফিন (র.) মোকামের টিলা কাটার ঘটনায় ইতিপূর্বে কয়েকজনকে থানায় এনে মুছলেখা নিয়ে ছাড়া হয়েছে। পরে আবারও কেউ কেউ টিলা কাটতে চেয়েছিলেন। এলাকাবাসী আটকিয়েছেন। এরপরও কেউ যদি টিলা কাটতে চান কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কবি ও গবেষক ড. মোহাম্মদ সাদিক পাহাড়-টিলা কাটা প্রসঙ্গে বললেন, সুনামগঞ্জ সীমান্তের তাহিরপুরের লাউড় থেকে শুরু করে সুনামগঞ্জের উত্তরাঞ্চলের জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ বনভুমি বিলুপ্তপ্রায়। সামান্য কিছু টিলা এবং লতাগুল্ম অবশিষ্ট আছে। এসবের যথাযথ সংরক্ষণ এবং টিলা ও সমতলে আরও বেশি বনায়ন করা না হলে পাহাড়ী ঢলে সুনামগঞ্জ শহর যেমন বর্ষায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে, ঠিক তেমনি জেলার বোরো ফসল রক্ষা করাও কঠিন হয়ে পড়বে। সামগ্রিক বিচারে হাওড় বিল নদী ভরাট হয়ে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণে মানববসতিও বিপন্ন হবে।