সুন্দর ছিনতাই

শাহরিয়ার বিপ্লব
পর্ব ১৫
পুষ্প ক্লাশে যাবে না। সারাক্ষণ কেঁদেই চলছে। কিছু খাচ্ছেও না। আজিজ সাহেব মেয়েকে বুঝাচ্ছেন কিন্তু মেয়ে তো বুঝতে রাজি না। আমিনা বেগম বুঝাতে না পেরে উল্টা বাপ-মেয়ের উপর রাগ ঝাড়ছেন। আজিজ সাহেবও মেয়ের উপর একটু বিরক্ত। সারাদেশের বিষয় কেন যে মেয়েটা নিজের মাথায় নিয়ে আসলো এটাই তিনি মানতে পারছেন না। স্কুলের কোন টিচারকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। ছাত্রছাত্রীদের কাছে এই খবর পাঠিয়েছে অন্য এক টিচার। রাতারাতি সব স্কুলেই পৌঁছে গেছে খবরটা। এদিকে পুষ্পের স্কুল থেকে জানানো হয়েছে সবাই যেন ক্লাশে আসে। প্রিন্সিপালের পক্ষ থেকে এসএমএস দিয়ে প্রত্যেক গার্জিয়ানকে তাদের ছেলেমেয়েকে স্কুলে পাঠাতে বলেছেন।
আজিজ সাহেব সকাল থেকে মেয়েকে নিয়ে ঝামেলায় পড়ছেন। কোনভাবেই মেয়ে স্কুলে যাবে না। সে আবারও আন্দোলনে যাবে। সারাক্ষণ কান্না করছে। তার বন্ধুরাও নাকি তাই চাইছে।
তাদের সবার ভিতরে শোক বইছে। তাদের ভাষায় জীবনের প্রথম দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ ছিল রাজপথের এই আন্দোলন। সবার মধ্যে একটা স্বপ্ন ছিল এইবার তারা দেশের সড়ক পরিবহন খাতে একটা পরিবর্তন আনবে। দেশের জন্য তারা কিছু করছিলো। হঠাৎ করে এডভেঞ্চারের এই ছন্দপতন কেউ মানতে পারছে না। বিশেষ করে পুষ্প কোনভাবেই মিলাতে পারছে না মিছিলের এই থেমে যাওয়া।
তাই সে সারারাত কান্না করছে। আমেনা এতে খুশী হলেও আজিজ সাহেব নিজেও মানতে পারছেন না। যদিও তিনি মেয়েকে বুঝানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু তিনিও চাইছিলেন এই আন্দোলনের একটা যৌক্তিক পরিণতি হোক। কিন্তু কী কারণে হঠাৎ সরকার এতো কঠোর হলো তা তার মাথায় আসছে না।
মেয়েকে বুঝাতে না পেরে তিনি বাসা থেকে বের হয়ে উদ্দ্যেশ্যহীন ভাবে হাঁটতে লাগলেন। বাংলাদেশ মেডিকেলের সামনে পুলিশের একটা ভ্যানগাড়ী তার সামনে কষে ব্র্যাক ধরে। আজিজ সাহেব ভয় না পেলেও থমকে গেলেন। শুনেছে সরকার নাকি যাকে তাকে জেলে ঢুকাচ্ছে। ভ্যানের ড্রাইভিং সিট থেকে নামলেন এসি কুদ্দুস সাহেব। কুদ্দুস সাহেব পুলিশে চাকুরী করলেও মনটা যেন হাওরের জলের মতো। নরম। পুষ্পের বান্ধবী রেনুর বাবা। বাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জ। মাঝে মাঝে মেয়েকে নিতে স্কুলে আসেন। সেই সুত্রে আজিজ সাহেবের সাথে পরিচয়। নামাজী মানুষ। তাকওয়া মসজিদে জুম্মার নামাজে প্রায়ই দেখা হয়।
হঠাৎ ব্র্যাক কষায় খালি রাস্তায় একটা ক্সসসস শব্দ হয়।
কুদ্দুস সাহেব হাত মিলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
– একলা একলা কই হাঁটছেন এই দুপুর বেলা।
– এমনিতেই। কোন কাজ নেই। তাই হাঁটছিলাম।
– উঁহু। আমি আপনাকে ক্রস করে চলে গেছিলাম। আবার গাড়ী ঘুরিয়ে আসলাম। মনে হলো খুব দুশ্চিন্তায় আছেন। কি ব্যাপার বলুন তো?
– না না। দুশ্চিন্তার কিছু না। মেয়েটা স্কুলে যাচ্ছে না। আন্দোলনটা থেমে যাওয়াতে সে শুধু কান্নাকাটি করছে। এই জন্যে ভাবলাম ওদের স্কুলে যাবো। জিজ্ঞেস করবো কেন তারা বাচ্চাদেরকে রাস্তায় নামিয়ে মাঝপথে থামিয়ে দিলো।
কুদ্দুস সাহেব আজিজ সাহেবকে গাড়ীতে তোলে পাশের সীটে বসিয়ে গাড়ি চালাতে লাগলেন। তারপর বললেন,
– আরে ভাই ওদের কি দোষ। আমরা সবাই চাইছিলাম এই আন্দোলনটা চলুক। শাহবাগের মতো যতক্ষণ আইন পরিবর্তন না হয় ততদিন পোলাপানেরা রাস্তায় থাকুক।
– কি বলেন? পুলিশও চাইছিলো?
– পুলিশ ডিপার্টমেন্ট না। পুলিশের সবাই না চাইলেও আমরা কেউ কেউ চাইছিলাম। কেন জানেন? ওই বেটারা এমন ক্ষমতাবান যে, রাস্তায় কোন সার্জেন্ট, টি আইদেরকে ওরা পাত্তাই দেয় না। ডিএমপির ডিসি ট্রাফিক তারা নিয়োগ করে, বদলায়। হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি তাদের কথা না শুনলে হাইওয়ে বন্ধ করে দেয়, বুঝলেন। ফকিন্নির পোলারা দুইদিনেই পাজেরো দৌড়ায়। বিদেশে ফ্ল্যাট কিনে। আমি শালা পঁচিশ বছর চাকরি কইরাও ভাড়া বাসায় থাকি।
– কি বলেন? কাদের কথা বলছেন?
– আরে ওই শ্রমিক নেতাগো কথা বলছি। অরা মন্ত্রী বানায়। ডিসি কমিশনার তো কিছুই না। আমার মনে হয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও চাইছিলেন ওদের একটু সাইজ করতে। তাই তো পুলিশ নিরব ছিল।
– তো এখন কেন আপনারা ছাত্রদের উপর নির্যাতন করছেন?
– এই যে আপনিও পাবলিকের মতো কথা বলছেন। নির্যাতন কই দেখলেন। ছাত্ররা যেভাবে মন্ত্রী, এমপি, সচিব, আইজি, ডিআইজিকে রাস্তায় নামিয়ে বেইজ্জতি করছে। যেভাবে ফ্রি স্টাইলে আন্দোলন করছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন আন্দোলন কোনও দেশে হইছে নাকি? খোদ প্রধানমন্ত্রীও তাদের আন্দোলনে সাপোর্ট দিছেন। আমরাও দিছি। মনে মনে চাইছিলাম এই সুযোগে আইনটা পাশ হোক।
– কোন আইনটা?
– পেনাল কোডের ৩০৪ এর খ ধারাটা। দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে চালকের নেগলিজেন্সি থাকলে ৩০২ এ যাবে। আর শাস্তি হবে কমপক্ষে দশ বছর । সরকারের ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও এই আইনটা পাশ করা যাচ্ছে না এই সড়কের নেতাদের কারণে। বুঝলেন?
কুদ্দুস সাহেব গাড়ী থামিয়ে বললেন,
-আসুন একটু কফি খাই। ছয় নম্বর রোডের এই কফির দোকানটা আমার খুব প্রিয়। ঢাকা শহরে বিশ বছর আগে এই দোকানে আপনার ভাবীর সাথে আইসা প্রথম কফি খাইছিলাম। এই দিকে এলে একবার ঢুকি। আপনার ভাবির স্মৃতি খুঁজি। ভদ্রমহিলাকে জীবন দিতে হইলো এই চাকার নীচে। আমি তখন নরসিংদী সদরের ওসি। পুলিশ হইয়াও বিচার করতে পারলাম না ভাই। এখনো বুকটা কাঁপে। নিজের বউয়ের বিচারটা আদালতে উঠাইতে পারলাম না। শুধুমাত্র ওই ট্রেড ইউনিয়নের নেতাদের চাপে। আর এই আইনের দুর্বলতার কারণে। কোনভাবেই মামলাটা ৩০২ এ আনতে পারলাম না।
কফির দোকানে ঢুকে দুইটি ক্যাপাচিনোর অর্ডার দিয়ে বলতে থাকেন,
-এই যে দেখেন, পোলাপানের আন্দোলনের প্রতি সম্মান দেখিয়ে ড্রাইভারকে নামিয়ে নিজেই গাড়ি চালাচ্ছিল। ওর ড্রাইভিং লাইসেন্স এর মেয়াদ শেষ হইছে সাত বছর আগে। তার খবরই নাই। ওকে পাঠাইছি লাইসেন্স ঠিক কইরা আনতে।
আজিজ সাহেব কফিতে চুমুক দিয়ে আগের প্রশ্নটাই করলেন।
– বললেন, কেন আন্দোলন বন্ধ করলেন?
– আপনি ভাই খুব সরল মানুষ। এটা না বুঝার কি আছে? যদি খালি খালি আন্দোলন হইতো তো কিছুই হইতো না। কিন্তু আন্দোলনে সরকার বিরোধীরা ঢুইকা পড়ছে। তারা নিজেরা কোন কিছু করতে পারে নাই। এখন ছাত্রদের কান্ধে ভর কইরা সরকার ফালাইতে চায়। সরকার কি সেই সুযোগ দিব? দেখেন কি কারবার। যে হারে গুজব রটাইছে? এই ফেইসবুক সরকারের মাথাডা আরো গরম কইরা দিছে। পুলিশ এতো ধৈর্য্য ধরছে। আর, তারা কি রকম লাশের খবর, গুমের খবর, রেইপের খবর ছাড়ছে। বলেন কোনও সরকার কি আর সুযোগ দিবে? এই একই কারণে কোটা বিরোধী আন্দোলন মাইর খাইছে। আরে বাবা সরকার বিরোধী আন্দোলন করবার অইলে কর। অতীতে অইছে না? পুলিশ আর বিডিআর কি তো দূরের কথা, আর্মীর বিরুদ্ধেও তো এই দেশের মানুষ আন্দোলন করছে। আর তোমরা শালারা নিজের পায়ের মুরোদ নাই ছাত্রদের ঠ্যাং দিয়া খাড়াইতে চাও। সারাদেশে ছাত্রদের উস্কানি দিচ্ছে। আওয়ামীলীগ অফিসে হামলা ছিল এই ষড়যন্ত্রের অংশ। আচ্ছা আপনিই বলুন, ছাত্ররা দাবী জানাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। তো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিছিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যাবে। তাই না? কিন্তু কার ইন্ধনে তারা ঝিগাতলায় গেল। জীবনে শুনেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রেসক্লাব, সচিবালয়, সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ছেড়ে ঝিগাতলায় যেতে?
সেদিন পুলিশ যদি আওয়ামী লীগের কর্মীদের না থামাতো তো কি হতো এই মিছিলের পরিণতি?
এই জন্যেই সরকার কঠোর হইছে।
এতো সুন্দর নির্মল জনপ্রিয় একটি আন্দোলন শুধুমাত্র পেছনের ষড়যন্ত্রের কারণেই নষ্ট হয়ে গেলো।
কুদ্দুস সাহেব আজিজ সাহেবকে বলেন,
– যান। বাসায় গিয়ে মেয়েকে বলেন, সুন্দরের মৃত্যু হয় না। সুন্দর চাহিদা আবার ফিরে আসবে। কেউ না কেউ আবার এই দাবীতে রাস্তায় নামবে। আবার উত্তাল হবে। তৃতীয় পক্ষের কালোছায়ার কারণে সুন্দর হয়তো সাময়িকভাবে ঢাকা পড়ে গেছে। কিন্তু আপনার মেয়ে পুষ্প, আমার মেয়ে রেনুর মতো ছেলেমেয়েরা সুন্দরের সর্বনাশ করতে দিবে না।
কালোছায়া সরিয়ে একদিন ফাগুন আনবেই। বসন্তকাল আসবেই। সুন্দর ফুটবেই।
আজিজ সাহেব স্ত্রী হারা এই পুলিশ আফিসারের দিকে চেয়ে থাকেন অপলক দৃষ্টিতে।