সুবিধাজনক পদায়ন দিতে সিন্ডিকেট

বিন্দু তালুকদার
সুনামগঞ্জের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদে চলতি দায়িত্ব প্রদান করার বিষয়ে মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। প্রজ্ঞাপনে ৫০৩ জন শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব প্রাপ্তির অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে।
জানা যায়, মঙ্গলবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এর বিদ্যালয়-২ শাখার উপ সচিব মনোয়ারা ইশরাত এই প্রজ্ঞাপন জারি করেন।
এদিকে জেলার ১১ উপজেলার ৫০৩ জন সহকারি শিক্ষককে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদে চলতি দায়িত্ব প্রদানে পছন্দসই স্কুলে পদায়ন পাওয়া নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে দৌঁড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন জারির সংবাদ পেয়েই শিক্ষক ও তাদের আত্মীয়-স্বজনেরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ধরনা দিতে শুরু করেছেন।
পাশাপাশি শিক্ষকদের পছন্দমত স্কুলে পদায়ন করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষকরা সিন্ডিকেট তৈরি করছেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
তবে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পঞ্চানন বালা জানিয়েছেন, বিভিন্নভাবে অনুরোধ আসতেই পারে। তবে তাঁরা স্বচ্ছতার সাথে সবকিছুই করবেন। জানা যায়, প্রজ্ঞাপনের শর্তে উল্লেখ করা হয়েছে- উক্ত চলতি দায়িত্ব প্রদানকে পদোন্নতি হিসেবে গণ্য করা যাবে না। চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকগণ নিজ বেতন স্কেলে বেতন-ভাতাদি আহরণ করবেন। পিএসসি’র সুপারিশের ভিত্তিতে পদোন্নতির মাধ্যমে শূন্য পদ পূরণযোগ্য এবং সেক্ষেত্রে চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতার ক্ষেত্রে কোন অগ্রগণ্যতা বা অধিকার অর্জন করবেন না। জ্যেষ্ঠতা তালিকা সংক্রান্ত অভিযোগ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নিষ্পত্তি করবেন। চলতি দায়িত্বের আদেশ প্রাপ্তির ৫ দিনের মধ্যে প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারি শিক্ষকগণের পদায়ন আদেশ জারি করতে হবে। প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারি শিক্ষকগণকে একই উপজেলার সবচেয়ে নিকটবর্তী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পদায়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রদান করার স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়েছে ওই প্রজ্ঞাপনে। পদায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখিত কোন শর্তের ব্যতয় ঘটলে এবং এবিষয়ে অভিযোগ প্রমাণিত হলে পদায়নকারী কর্মকর্তা বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
একাধিক শিক্ষক জানান, সুবিধাজনক স্কুলে পদায়ন করানোর ব্যবস্থা দেয়ার কথা বলে কেউ কেউ যোগাযোগ শুরু করেছেন। এদের কেউ কেউ শিক্ষক নেতা।
জানা যায়, সিনিয়র সহকারি শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবির পেক্ষিতে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদে চলতি দায়িত্ব প্রদানের প্রজ্ঞাপন জারি হয় মঙ্গলবার।
কিন্তু প্রজ্ঞাপন জারি হবে এমন সংবাদ আগেই জানতেন জেলার বিভিন্ন এলাকার শিক্ষক নেতারা। তাই প্রজ্ঞাপন জারির বেশ আগেই তারা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যোগাযোগ করতে থাকেন। শিক্ষক নেতারা নিজের আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিত শিক্ষকদের সুবিধাজনক স্কুলে পদায়ন করিয়ে দেয়ার জন্য চেষ্টা তদবির শুরু করছেন।
একাধিক সূত্র জানায়, প্রজ্ঞাপন জারির পরপরই জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে দিয়ে ফোন করে অনুরোধ করানো হচ্ছে পছন্দের স্কুলে পদায়নের জন্য।
বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারি শিক্ষক সমিতি সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সদস্যসচিব প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদে চলতি দায়িত্বপ্রাপ্তদের তালিকাভুক্ত শিক্ষক গোলাম সরোয়ার লিটন বলেন,‘হাওরপ্রধান সুনামগঞ্জ শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক পিছিয়ে। পিছিয়ে পড়া জেলার প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ে নারী প্রধান শিক্ষকদের তাদের নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে পদায়ন করতে হবে। না হলে নারী প্রধান শিক্ষকদের সুবিধার পরিবর্তে দুর্ভোগ বাড়বে। চলতি দায়িত্বে পদায়নে শিক্ষকদের সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই হাওরাঞ্চলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হবে। ’
বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারি শিক্ষক সমিতি সুনামগঞ্জ জেলা শাখার আহবায়ক ও চলতি দায়িত্ব বাস্তবায়ন কমিটির আহবায়ক শিক্ষক হারুন রশিদ বলেন,‘এক শ্রেণির লোক রয়েছে যারা পদায়নের নামে বাণিজ্য করতে চায়। এই শ্রেণির লোকরাই দালাল, এরা সুযোগ সুবিধা পাইয়ে দেয়ার নামে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করতে চায়। তবে কোন শিক্ষক এসব অন্যায় কাজের সাথে জড়িত নয়। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ ভুয়া ও ভিত্তিহীন। আমাদের অনুরোধ থাকবে কেউ যেন, কারো দ্বারা প্রভাবিত না হন এবং কোন কিছু জানার বা বুঝার প্রয়োজন হলে সরাসরি ডিপিও স্যারের সাথে সরাসরি কথা বলেন। তিনি শিক্ষকদের প্রতি খুবই আন্তরিক।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পঞ্চানন বালা বলেন,‘ মঙ্গলবার প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। তবে আমরা এখন পর্যন্ত কোন চিঠি পাইনি। চিঠি পাওয়ার পর যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে কোন ত্রুটি আছে কিনা। এরপর ৫ দিনের মধ্যে শিক্ষকদের পদায়ন করা হবে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব স্বচ্ছতার সাথে পদায়নের কাজ করতে। কারো বিরুদ্ধে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নেয়া চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন,‘পদোন্নতিপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে পদায়ন করা হবে। তবে পদের চেয়ে একাধিক শিক্ষক হলে পার্শ্ববর্তী এলাকার বিদ্যালয়ে দেয়া হবে। এলাকায় স্থানীয়ভাবে খোঁজ-খবর নিয়েই শিক্ষকদের পদায়ন করা হবে।’