সুবিধাবাদীতার বিরুদ্ধে পরিবহন শ্রমিকদের সচেতন হতে হবে

তথাকথিত পরিবহন ধর্মঘটের সময় শ্রমিকরা কী করেছে, সুনামগঞ্জের মত ছোট্ট একটি জনপদের প্রেক্ষিতে সেগুলো বিবেচনায় নিলেও আতংকিত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। মঙ্গলবার স্থানীয় গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত যেসব সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে সেখান থেকে জানা যায়, নিউমেনিয়ায় আক্রান্ত দক্ষিণ সুনামগঞ্জের সদ্যোজাত ২ দিনের এক শিশু সন্তানকে হাসপাতালে আনতে না দেয়ায় শিশুটির মৃত্যু ঘটেছে। ছাতকে পরিবহন শ্রমিকরা চাঁদাবাজি করেছে, যেসব প্রাইভেট কার বা গাড়ি যাতায়াত করছিল সেগুলো পথে আটকে দিয়ে তারা চাঁদা নিয়ে ছেড়েছে। অতীতে কখনও কোন ধরনের হরতাল-অবরোধ-ধর্মঘটের সময় সংবাদপত্রের গাড়ি না আটকালেও এরা সোমবার সংবাদপত্রের গাড়ি আটকে দিয়েছে। কোন ধরনের যানবাহন না পেয়ে সুনামগঞ্জের এক সাংবাদিক অসুস্থ স্ত্রী ও নবজাতকসহ সুনামগঞ্জে আসতে না পেরে সিলেটে অবস্থান করতে বাধ্য হয়েছেন। এরা সিলেট থেকে ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলে সুনামগঞ্জে আসার পথে উদীচীর নেতৃবৃন্দের সাথে পথে পথে দুর্ব্যবহার করেছে। অসুস্থ রোগীদের বহনকারী ছোট যানবাহনগুলোকে আটকে দিয়ে চরম হেনস্তা করেছে। সুনামগঞ্জের মত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় অনুন্নত একটি জেলার সংবাদপত্রে প্রকাশিত একদিনের সংবাদগুলোই যদি এরকম হয়, তাহলে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়নি এমন ঘটনা কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। আর এই তুলনায় সারা দেশের চিত্রটিও সকলে অনুধাবন করতে পারছেন। পরিবহন শ্রমিকদের পক্ষ থেকে যে কথাটি বারবার বলার চেষ্টা করা হচ্ছে তা হল, কর্মবিরতি বা ধর্মঘট পালন করা তাদের ন্যায্য অধিকার। তো উপরে যে ঘটনাগুলো বর্ণিত হল, কিংবা রাজধানীতে তারা যেভাবে মানুষের মুখে পুড়া মবিল লাগিয়ে দিয়েছে, সেগুলো কি তাদের কথিত ন্যায্য অধিকারের অন্তর্ভূক্ত? পরিবহন শ্রমিক নেতৃত্ব এর উত্তর দিবেন না জানি, কিন্তু প্রশ্নগুলো উত্থাপন করতেই হবে তাদের চরম অন্যায্য আচরণগুলো তুলে ধরার জন্যই।
বাংলাদেশের পরিবহন খাত তথা এর মালিক ও শ্রমিক নেতৃত্বকে আমরা মুদ্রার এপিঠ ওপিঠের মতোই দেখছি। বিভিন্ন ইস্যুতে এই দুই পক্ষের হরিহর আত্মা দেখে বুঝার উপায় নেই এই দুইটি শ্রেণি মূলত তেল-পানির মত পরষ্পর না মিশা দুই গোষ্ঠী। তাহলে বিভিন্ন ইস্যুতে তারা এক হচ্ছেন কী করে? বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এই সেক্টরের শ্রমিক নেতৃত্বের (বিশেষ করে এখন যারা খবরদারি করতে সক্ষম) বড় অংশই নিজেদের শ্রেণিগত অবস্থানে শ্রমিক শ্রেণিকে প্রতিনিধিত্ব করেন না। এই নেতৃত্ব বিরাট বিত্তশালী এবং এদের অনেকেই আবার পরিবহনের মালিকও বটে। মালিক বা সমগোত্রীয় কেউ যখন শ্রমিক নেতৃত্বে আবির্ভূত হন তখন তাদের এক না হয়ে উপায় থাকে কি? পরিবহন খাতে নিয়োজিত শ্রমিক শ্রেণির সমস্যার অন্ত নেই। একটু খোঁজ যারা রাখেন তারাই এই বাস্তবতা জানেন। কিন্তু শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ে শ্রমিক সংগঠনগুলো এখন আর তেমন করে গা করে না। বরং নিজেদের অন্যায্য যাবতীয় কর্মকা-কে সংঘশক্তির জোরে আদায় করে নিতে জনভোগান্তি সৃষ্টিকারী কর্মসূচী দিয়ে মানুষের নাভিশ্বাস তুলে দিতে পারঙ্গমতা প্রদর্শন করে। শ্রমিক নেতৃত্বকে এভাবে সুবিধাবাদীতার চোরাবালিতে আটকে দেয়ার বিরুদ্ধে জাগ্রত হওয়া তাই এই সময়ে পরিবহন খাতের প্রকৃত শ্রমিকদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিৎ। সাধারণ শ্রমিকদের মনে রাখতে হবে, যতই ভুজুংভাজুং করা হোক না কেন, কোন শ্রমিক বা শ্রমিকগোষ্ঠী শ্রমিক হিসাবে অসহায় হয়ে পড়লে ওই নেতৃত্ব তাদেরকে রক্ষা করবে না।